দখল লড়াইয়ে আতঙ্কের জনপদ মোহাম্মদপুর

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৪, ০৬:৪৯ এএম

দিনেদুপুরে প্রকাশ্যে ছিনতাই, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ডাকাতি, গোলাগুলি, খুন, দখলবাজিসহ নানা অপরাধে এখন আলোচনায় রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা। পরিস্থিতির উত্তরণে থানা ঘেরাও করে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে এলাকাবাসী, স্থাপন করা হয়েছে সেনা ক্যাম্প। তবে এতকিছুর পরও প্রকাশ্যে চলছে মাদকের কারবার। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কে রয়েছেন এলাকাবাসী। অনেকে এলাকাও ছাড়ছেন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাজধানীর অন্যতম অপরাধপ্রবণ এলাকা হয়ে ওঠে মোহাম্মদপুর। মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও বাজারসহ নানা খাতের দখল নিতে মরিয়া এই এলাকার বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ। আর এজন্য নিজেদের শক্তিমত্তা জানান দিতে প্রায়ই জড়াচ্ছে সংঘর্ষে। প্রদর্শন ও ব্যবহার করছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। এ ছাড়া ফাঁকা সড়কে কখনো সকালে, কখনো সন্ধ্যা বা রাতে এমনকি ভরদুপুরেও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে এই এলাকায়। দোকানে বসে থাকা মানুষদের কুপিয়ে একদল সন্ত্রাসীর অবলীলায় চলে যাওয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মোহাম্মদপুর এলাকায় সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোহাম্মদপুরকে একটি বাণিজ্যিক এলাকা বলা চলে। সেটা মাদককেন্দ্রিক ও অন্যান্য আরও অনেক খাত নিয়ে। একটা দল দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকায় এই এলাকায় তাদের আধিপত্য রয়েছে। আবার অন্য একটি দল নতুন করে আধিপত্য বিস্তার করতে চাচ্ছে, যা ঘিরে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। এতে এলাকার মানুষসহ ব্যবসায়ীরাও আতঙ্কে রয়েছেন। পুলিশ বলছে, মোহাম্মদপুরে জনসংখ্যার আধিক্য থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে তাদের কষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া এখানে বেশ কয়েকটি অপরাধী গ্রুপ সক্রিয়। আবার জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক কারবার সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

মোহাম্মদপুরের সংঘাতময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নতুন করে এই এলাকায় সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। তবুও গতকাল রবিবারও মোড়ে মোড়ে দেখা গেছে মাদক কারবারিদের আনাগোনা। গত শনিবার রাতে জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় দুই গ্রুপের সংঘর্ষে শিশুসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। রাতে এমন ঘটনা ঘটলেও সকাল হতেই আবার শুরু হয় মাদক কেনাবেচা। রাতে যেখানে গোলাগুলি হয়েছে, যৌথ বাহিনীর অভিযানে ৪৫ জনকে আটক করা হয়েছে সেখানেই দিনের বেলা ফের আগের চিত্র দেখা গেছে। এই এলাকার সড়কে হেঁটে চললে চারদিক থেকে একই বাক্য ভেসে আসে। আর তা হলো ‘কী লাগবে বড় ভাই’। বড় ভাইদের আপ্যায়নে (মাদক সরবরাহ) যেন একটুও কমতি নেই মোহাম্মদপুরে।

গতকাল সরেজমিনে মোহাম্মদপুরের কলেজ গেট থেকে গজনবী সড়ক ধরে জেনেভা ক্যাম্পের দিকে যেতে সবকিছু স্বাভাবিক দেখা গেলেও একটু সামনে যেতেই বাধে বিপত্তি। গজনবী সড়ক থেকে হাতের ডানদিকে জেনেভা ক্যাম্পের সড়কে প্রবেশ করতেই দেখা যায় বিহারি যুবকদের আনাগোনা। নির্দিষ্ট কিছু স্থানে দাঁড়িয়ে আছে তারা। যুবক বয়সী ছেলেদের দেখা পেলেই উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠছে ‘কী লাগবে বড় ভাই’। তাদের এই ডাকে কিছু যুবককে সাড়া দিতেও দেখা গেছে। এ ছাড়া রিকশাচালক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে ভিড় করছেন।

সেখানে এক সবজি বিক্রেতার কাছে ‘কী লাগবে বড় ভাই’ এমন ভাবে ডাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এরা সবাই গাঁজা বিক্রি করছে।’ শুধুই কি গাঁজা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, এদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সব ধরনের নেশা (মাদক) তারা ম্যানেজ করে দিতে পারে।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিহারি ক্যাম্পের অনেকেই গাঁজা-ইয়াবা বিক্রেতা। তাদের পেশাই মাদক বিক্রি। এখানে তাদের কেউ কিছু বলে না। তারাই যেন এখানকার সরকার। কেউ তাদের কিছু বললে তাকে মেরে ফেলবে। থানা পুলিশ কেউ তাদের কিছুই করতে পারে না। এমন অভিযোগ একজনের নয়, এলাকাবাসীর সবার। তবে জেনেভা ক্যাম্পের ভেতরের বিষয় নিয়ে মোহাম্মদপুরের সবাই যেন মুখ খুলতে নারাজ। নাম প্রকাশের তো প্রশ্নই আসে না।

থানায় লোকবল সংকটে এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে উল্লেখ করে মোহাম্মদপুর থানার ওসি ইফতেখার হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি। তবে, আমাদের লোকবল কম থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হচ্ছে।’

স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে সাংসদ জাহাঙ্গীর কবির নানক জেনেভা ক্যাম্পের মাদক কারবারিদের মধ্যে রাইফেল, ককটেলসহ নানা ধরনের অস্ত্র দেন। শেখ হাসিনার পতনের পর নানকের দেওয়া সেসব অবৈধ অস্ত্রের সঙ্গে গত ৫ আগস্ট মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা থেকে লুট করা অস্ত্র দিয়ে গত দুই মাস মাদক কারবারিরা সংঘর্ষে জড়ায়। গত দুই মাসে মোহাম্মদপুরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নয়জন খুন হয়েছে এবং অর্ধশতাধিক গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছে। ভয়াবহ এই সংঘাতের পেছনে ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারি সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল, গালকাটা মনু, চুয়া সেলিম, আকরাম, শাহ আলম, পিচ্চি রাজা ও কলিম জাম্বুর জড়িত বলে জানা গেছে।

সাম্প্রতিক আলোচিত কয়েকটি ঘটনা : গত শনিবার জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারিদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে গোলাগুলিতে শিশুসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। এর আগে শুক্রবার রাতে বসিলায় একটি মিনি সুপারশপে অস্ত্রধারীদের ঢুকে ডাকাতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একই রাতে ঢাকা উদ্যান এলাকায় ‘গণছিনতাইকারী’ দুই দলের মধ্যে সশস্ত্র মহড়ার ভিডিও ছড়িয়েছে। গত ২০ অক্টোবর মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড এলাকার সড়কে ‘নেসলে’ কোম্পানির একটি গাড়ি থামিয়ে ছুরি-চাপাতির মুখে ১১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ও চেক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ১৮ অক্টোবর বাজার কমিটির দ্বন্দ্ব নিয়ে শিয়া মসজিদ কাঁচাবাজারের সভাপতি আবুল হোসেন ও তার ভাই মাহবুব হোসেনকে গুলির ঘটনা ঘটে। ১৭ অক্টোবর বসিলায় চোর সন্দেহে অটোরিকশা চালক শাহরিয়ার আশিককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১৬ অক্টোবর জেনেভা ক্যাম্পে গুলিতে নিহত হন শানেমাজ নামে এক ব্যক্তি। ১০ অক্টোবর চুরির সময় আটকের জেরে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে ঢাকা উদ্যানের নৈশপ্রহরী রবিউল ইসলামকে হত্যা করা হয়। গত ২০ সেপ্টেম্বর সাদেক খান আড়তের কাছে নিহত হয় নাসির ও মুন্না নামে দুজন। ৪ সেপ্টেম্বর জেনেভা ক্যাম্পে মাদকের দ্বন্দ্বে গুলিতে নিহত হয় রিকশাচালক সনু। তার আগে ৬ আগস্ট জেনেভা ক্যাম্পে মাদকের দ্বন্দ্বে গুলিতে নিহত হয় শাহেন শাহ নামে আরেকজন।

একের পর এক এমন অপরাধের ঘটনায় ক্ষুব্ধ মোহাম্মদপুরের একদল মানুষ গত শনিবার বিকেলে থানায় গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে ৭২ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেয়। এর মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে থানায় অবস্থানের ঘোষণাও দেওয়া হয়। এ দাবিকে যৌক্তিক বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ জিয়াউল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মোহাম্মদপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমরা স্থানীয়দের সহায়তা চেয়েছি। ইতিমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় বাড়তি ফোর্স মোতায়েনসহ টহল কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে।’

হঠাৎ কেন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য : পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মোহাম্মদপুরে আছে আটকেপড়া পাকিস্তানিদের আবাসন জেনেভা ক্যাম্প। শেখ হাসিনার পতনের পর থানা ও গণভবন থেকে লুটের অস্ত্র জেনেভা ক্যাম্পের অপরাধীদের হাতে যাওয়ার তথ্য রয়েছে। এসব অস্ত্র হাতে পেয়ে সেখানকার মাদক কারবারিদের গ্রুপগুলো নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়েছে। জেনেভা ক্যাম্প ছাড়াও ওই থানা এলাকার অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো হলো বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন বসিলা, রায়েরবাজার, ঢাকা উদ্যান ও চন্দ্রিমা উদ্যান। এসব এলাকায় যানবাহন থেকে চাঁদাবাজি, ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি এবং মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ নিতে নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়াচ্ছে অপরাধীদের চক্রগুলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, জেনেভা ক্যাম্পসহ মোহাম্মদপুর এলাকা আগে থেকেই অপরাধপ্রবণ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই কারাগার থেকে বের হয়ে আগের অবস্থানে ফিরে যেতে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। আবার পুলিশ সক্রিয় থাকলেও অতীতের ঘটনায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এই অপরাধ কার্যক্রম থেকে বের হতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেমন ভূমিকা প্রয়োজন ঠিক তেমনি স্থানীয়দেরও ভূমিকা রেখে কাজ করতে হবে।

মোহাম্মদপুরের সংঘর্ষের বিষয়ে বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সদস্য ও দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত জিয়াউর রহমান জিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপরাধীরা সবসময়ই অপরাধী। আমাদের দলে কোনো অপরাধীর জায়গা নেই। মোহাম্মদপুরের ঘটনায় যেসব বিএনপি নেতা জড়িত রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওই এলাকার বিএনপি নেতাদের বলা হয়েছে, যে কোনো বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সবাই সোচ্চার ও মানুষের বিপদে এগিয়ে আসতে হবে। নতুন করে আধিপত্য বিস্তার করে দলে কেউ স্থান করতে পারবে না।’

সেনা ক্যাম্প স্থাপন : অপরাধ রোধে মোহাম্মদপুরের প্রতিটি হাউজিংয়ে সেনাবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হচ্ছে বলে জানান ২৩ ইস্ট বেঙ্গলের উপ-অধিনায়ক মেজর নাজিম আহমেদ। গত শনিবার রাত ১২টায় বসিলা সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান। তিনি বলেন, মোহাম্মদপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন হাউজিং এলাকায় অস্থায়ী ক্যাম্প করা হবে। হাউজিং এলাকার মধ্যে একটি করে অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করা হবে। যেখান থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করবেন। এ ছাড়া এলাকাবাসীকে আতঙ্কিত না হয়ে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানানো হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত