মোহাম্মদপুর দ্য নার্কোস

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৪, ০২:০১ এএম

সাম্প্রতিক সময়ে জননিরাপত্তার প্রশ্নটি বড় আকারে দেখা দিয়েছে। দিনদুপুরে প্রকাশ্যে ছিনতাই, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ডাকাতি, গোলাগুলি, খুন, দখলবাজিসহ নানা অপরাধে এখন আলোচনায় রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা।

সাম্প্রতিক আলোচিত কয়েকটি ঘটনা : গত শনিবার জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারিদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে গোলাগুলিতে শিশুসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। এর আগে শুক্রবার রাতে বসিলায় একটি মিনি সুপারশপে অস্ত্রধারীদের ঢুকে ডাকাতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একই রাতে ঢাকা উদ্যান এলাকায় ‘গণছিনতাইকারী’ দুই দলের মধ্যে সশস্ত্র মহড়ার ভিডিও ছড়িয়েছে। গত ২০ অক্টোবর মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড এলাকার সড়কে ‘নেসলে’ কোম্পানির একটি গাড়ি থামিয়ে ছুরি-চাপাতির মুখে ১১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ও চেক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ১৮ অক্টোবর বাজার কমিটির দ্বন্দ্ব নিয়ে শিয়া মসজিদ কাঁচাবাজারের সভাপতি আবুল হোসেন ও তার ভাই মাহবুব হোসেনকে গুলির ঘটনা ঘটে। ১৭ অক্টোবর বসিলায় চোর সন্দেহে অটোরিকশা চালক শাহরিয়ার আশিককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১৬ অক্টোবর জেনেভা ক্যাম্পে গুলিতে নিহত হন শানেমাজ নামে এক ব্যক্তি। ১০ অক্টোবর চুরির সময় আটকের জেরে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে ঢাকা উদ্যানের নৈশপ্রহরী রবিউল ইসলামকে হত্যা করা হয়। গত ২০ সেপ্টেম্বর সাদেক খান আড়তের কাছে নিহত হয় নাসির ও মুন্না নামে দুজন। ৪ সেপ্টেম্বর জেনেভা ক্যাম্পে মাদকের দ্বন্দ্বে গুলিতে নিহত হয় রিকশাচালক সনু। তার আগে ৬ আগস্ট জেনেভা ক্যাম্পে মাদকের দ্বন্দ্বে গুলিতে নিহত হয় শাহেন শাহ নামে আরেকজন। (দেশ রূপান্তর)।

নিশ্চয়ই উল্লির্খিত ঘটনার বাইরেও অনেক ঘটনা রয়ে গেছে। যেহেতু সব ঘটনা গণমাধ্যমে জায়গা পায় না এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সব ঘটনা ভাইরাল হয় না। সে যাই হোক মোহাম্মদপুরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ম্যাক্সিকান কার্টেল সিরিজ ‘নার্কোস’-এর  কথা মনে করিয়ে দেয়।

মূলত, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাজধানীর অন্যতম অপরাধপ্রবণ এলাকা হয়ে ওঠে মোহাম্মদপুর। মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও বাজারসহ নানা বাণিজ্যিক কেন্দ্র দখল নিতে মরিয়া বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ। নিজেদের শক্তিমত্তা জানান দিতে প্রায়ই জড়াচ্ছে সংঘর্ষে। ব্যবহার করছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। এ ছাড়া পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মোহাম্মদপুর এলাকায় সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো।

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে বলা হয়, ‘মোহাম্মদপুরকে একটি বাণিজ্যিক এলাকা বলা চলে। সেটা মাদককেন্দ্রিক ও অন্যান্য আরও অনেক খাত নিয়ে।’ মূলত, মোহাম্মদপুর এলাকা আগে থেকেই অপরাধপ্রবণ। এছাড়া, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই কারাগার থেকে বের হয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। এই অপরাধ কার্যক্রম থেকে বের হতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শতভাগ সক্রিয় করা দরকার দ্রুত।

তবে থানায় লোকবল সংকটে এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পুলিশ বলছে, মোহাম্মদপুরে জনসংখ্যার আধিক্য থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে তাদের কষ্ট হচ্ছে। এখানে বেশ কয়েকটি অপরাধী গ্রুপ সক্রিয়। আবার জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক কারবার সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মোহাম্মদপুরে আছে আটকেপড়া পাকিস্তানিদের আবাসন জেনেভা ক্যাম্প। শেখ হাসিনার পতনের পর থানা ও গণভবন থেকে লুটের অস্ত্র জেনেভা ক্যাম্পের অপরাধীদের হাতে যাওয়ার তথ্য রয়েছে। এসব অস্ত্র হাতে পেয়ে সেখানকার মাদক কারবারিদের গ্রুপগুলো নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়েছে। জেনেভা ক্যাম্প ছাড়াও ওই থানা এলাকার অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো হলো বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন বসিলা, রায়েরবাজার, ঢাকা উদ্যান ও চন্দ্রিমা উদ্যান। এসব এলাকায় যানবাহন থেকে চাঁদাবাজি, ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি এবং মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ নিতে নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়াচ্ছে অপরাধীদের চক্রগুলো।

পুলিশের হিসাবেই রাজধানী ঢাকায় ছয় হাজারের বেশি ব্যক্তি ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। যাদের মধ্যে ১ হাজার ৭৩৭ জন ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। রাজধানী শহরের ১৪ বছরের ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় কিছু ঘটনায় বিচার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি নেই। অধিকাংশ ছিনতাইকারী বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। ২০১৭ সালের পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিসংখ্যান থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ৯ মাসের হিসাব অনুযায়ী রাজধানীতে ৮৮ ভাগ ছিনতাকারীর বিচার হয়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ছিনতাইয়ের ঘটনাকে ‘হারানোর ঘটনা’ উল্লেখ করে জিডি এর অন্যতম কারণ। এতে অপরাধীদের খুব সামান্যই আইনি ব্যবস্থার মধ্যেও আসে। অজ্ঞাত আসামি উল্লেখ করে মামলা করায় সাক্ষীও পাওয়া সম্ভব হয় না। এ ছাড়া মামলার তদন্তে প্রযুক্তির ব্যবহারে ঘাটতি রয়েছে। এমন অবস্থা থেকে বের হতে ছিনতাইয়ের অপরাধগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের কথা বলছেন তারা। পাশাপাশি ছিনতাইয়ের অপরাধকে ‘ছিনতাই’ নামে মামলা হওয়া উচিত।

পুলিশ সক্রিয় হলে অপরাধ দমন করা অসম্ভবের কিছু না। পুলিশ কর্মকর্তাদের সক্রিয় হতে হবে সেইসঙ্গে একটা নির্দিষ্ট দল গঠন করতে হবে যারা বিভিন্নভাবে ছিনতাই দমনে কাজ করবে। যথাযথ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ছিনতাইকারী সদস্যদের দ্রুত আটক করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সেই সঙ্গে জনসাধারণের সতর্ক হওয়ার বিকল্প নেই। 

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত