ঠিকাদারিতে টার্নওভারসহ অন্যান্য জটিল শর্ত

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৪, ০২:৪৪ এএম

চলতি অর্থবছরে আমাদের দেশের মোট বাজেট ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, এর মধ্যে শুধু উন্নয়ন খাতে বাজেট ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ৩৪ শতাংশ। অপচয় রোধ এবং দুর্নীতিমুক্ত করে উন্নয়ন খাত থেকেই বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বাঁচানো সম্ভব। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচন করা হলে এবং অফিসের পারসেন্টেজ, দুর্নীতি বন্ধ হলে উন্নয়ন ব্যয় কমে আসবে। এতে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে এবং বাস্তবায়িত অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে উল্লিখিত উন্নয়ন খাতের প্রায় ২৫% টাকা বাঁচানো সম্ভব।

বর্তমানে প্রতিযোগিতামূলক ঠিকাদার নির্বাচন ও দুর্নীতি বন্ধের জন্য ইজিপি পদ্ধতি চালু হয়েছে, কিন্তু সর্বক্ষত্রে ঠিকাদারদের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও নেওয়া হয় নানা কৌশল। নির্ধারিত কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে ওপরের কর্তাদের সখ্য গড়ে ওঠায় এবং দরপত্রে প্রতিযোগী না থাকা বা কম হওয়ার কারণে টার্নওভারসহ অন্যান্য জঠিল শর্ত আরোপ করে আইনি মারপ্যাঁচে ঘুরেফিরে কাজ পাচ্ছে কিছু নির্ধারিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে, কিছু কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারী নির্মাণকাজের বিল দেওয়ার সময় অহেতুক কাজের ভুলত্র“টি ধরে সৎ ঠিকাদারের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে নেন। মনে হয় নির্মাণকাজের বিল পাসের এই পার্সেন্টেজের টাকা তাদের প্রাপ্য পাওনা।

বেশিরভাগ ঠিকাদারি কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে বার্ষিক কাজের টার্নওভার চাওয়া হয়। টার্নওভার (Turn-over) অর্থ বাৎসরিক গড় চুক্তি মূল্য, ওই বিভাগে (Department) বছরে তিনি কত টাকার কাজ করেছেন। এ কারণে সংগতি থাকা সত্ত্বেও বেশির ভাগ ঠিকাদার কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে না, ফলে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানই কাজ পেয়ে থাকে। তাদের অনেকে আবার নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করতে না পারায় অধিক লাভে অন্য ঠিকাদারের কাছে কাজ বিক্রি করে দেন। কিছু কিছু ঠিকাদার নিজের টার্নওভারযোগ্য লাইসেন্সের মাধ্যমে অন্য ঠিকাদারের টেন্ডার দেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে ২% থেকে ৩% লাভ নিয়ে থাকেন। এভাবে ওই ঠিকাদার নিজে কাজ না করলেও তার টার্নওভার/অভিজ্ঞতা বাড়তেই থাকে। অহেতুক এই টার্নওভার না রেখে অধিক ঠিকাদারের মধ্যে প্রতিযোগিতা হলে, বুক ভ্যালু থেকে যেখানে ২০% থেকে ২৫% নিম্নদরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেখানে অনেক কাজ সমদরে অথবা ৫% নিম্নদরে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। এ কারণে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।

বর্তমানে দেশের প্রায় ৫০% থেকে ৬০% ঠিকাদারের কোনো টার্নওভার নেই, কারণ তাদের কাজ পাওয়ার সুযোগই রাখা হয়নি। এ কারণে দেশের প্রায় ৩০ হাজার ঠিকাদার বেকার হয়ে পড়েছেন। নতুন ঠিকাদার তৈরির ক্ষেত্রে এল.টি.এম পদ্ধতি চালু রাখা হয়েছে, যেখানে কিছু কাজে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভার ছাড়া দরপত্রে অংশগ্রহণ করা যায়, সেখানেও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে অংশগ্রহণ করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। দরপত্রে অংশগ্রহণকারী সব ঠিকাদারকেই সমদরে (৫%) অংশগ্রহণ করতে হয়। এ কারণে কিছু কিছু একক কাজে ৫০০ জন পর্যন্ত ঠিকাদার অংশগ্রহণ করে থাকেন। এর মধ্যে লটারির মাধ্যমে মাত্র একজন কাজ পেয়ে থাকেন। ফলে হাজার হাজার ঠিকাদার বছরের পর বছর চেষ্টা করে লাখ লাখ টাকার দরপত্র খরিদ করেও, কাজ না পেয়ে মূলধন হারাতে হারাতে কাজের উৎসাহ হারান। তাছাড়া অভিজ্ঞতাস¤পন্ন একজন ঠিকাদারের দীর্ঘদিন (২৫/৩০ বছর) কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকলেও সর্বশেষ ৫ বছরের টার্নওভার না থাকলে তিনিও কাজ পাবেন না, অর্থাৎ তার অভিজ্ঞতার কোনো মূল্যই রাখা হয়নি।

পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য অফিস আদালতের অনিয়ম বন্ধ করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচন করতে হবে। এক্ষেত্রে টার্নওভার বন্ধ করে প্রতিযোগী বাড়াতে হবে এবং অফিস-আদালতের দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য গোপন সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত অব্যাহত রাখতে হবে। দুর্নীতি নিরুৎসাহিত করার জন্য দুর্নীতিমুক্ত কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতি দিতে হবে এবং দুর্নীতিবাজদের পদোন্নতি বন্ধসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে টেন্ডারবাজি বন্ধ ও অহেতুক শর্তাবলি শিথিল করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বকান করা এবং প্রয়োজনে কাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য টেন্ডার জামানতের টাকা দ্বিগুণ করা যেতে পারে। দরপত্র আহ্বানের সময় ঠিকাদারের কাজ শেষ করার পরেও আগামী ৫ বছরের জন্য রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নির্মাণাধীন ঠিকাদারের কাছে রাখলেই উক্ত রাস্তাটি ভালো রাখা সম্ভব হবে। এতে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি বছরে যে বাজেট রাখা হয় সেটা অনেকাংশে কমে যাবে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করলে অধিক দরপত্র বিক্রির দরুন সরকারের আয় অনেকাংশে বেড়ে যাবে। দরপত্রে দরের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় অনেক কমে যাবে এবং দ্রুত কাজ বাস্তবায়ন হবে। বাস্তবায়িত প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই সংরক্ষণ ও দুর্নীতি বন্ধের পদক্ষেপ অব্যাহত রাখলে উন্নয়ন খাতের টাকা থেকে প্রতি বছর ৬০ হাজার কোটি টাকা বাঁচানো সম্ভব হবে।                                                                                                                                 
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত