ঢাকায় শিগগিরই জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কার্যালয় স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ। তিনি বলেছেন, কার্যালয় হলে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো সরাসরি তদন্ত করতে পারবে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ।
শারমিন মুরশিদ বলেছেন, ‘যে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসে, চলে যায়, তারা যদি নিজেদের অপরাধের তদন্ত করে, সে তদন্ত হয় না। নাগরিক সমাজ থেকে যখন তদন্ত করা হয়, অথবা সত্যটা যখন তুলে ধরা হয়, তখন তাদের ওপর নির্যাতন আসে এবং নানা চাপের মুখে থাকতে হয়। সেই কথাগুলো (নাগরিক সমাজের চাপে পড়ার কথা) ব্যক্ত করা যায় না, রিপোর্টও করা যায় না।’ উপদেষ্টার এ কথার সত্যতা থাকলেও আমরা মনে করি অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক এটা অনেক বড় সিদ্ধান্ত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সাংবাদিকদের বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব মানবাধিকার যেন লঙ্ঘিত না হয়। তারা (মানবাধিকার পরিষদ) সহায়তামূলক অবস্থান থেকে এখানে এসেছে।
তবে, বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে কূটনীতিবিদ, মানবাধিকারকর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। বিশ্বের মাত্র ১৯টি দেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় রয়েছে। এগুলোর কোনো কোনোটিতে যুদ্ধ, আবার কোথাও কোথাও গুরুতর মানবিক সংকট বিদ্যমান। দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে যেসব দেশে এ ধরনের কার্যালয় থাকে, সেখানে অবারিত প্রবেশাধিকার থাকে। ফলে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কোনো সফর করতে হলে আলাদা করে সে দেশের সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হয় না। এ ব্যাপারটি দেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না তা বিবেচনার বিষয়।
একজন সাবেক কূটনীতিক দেশ রূপান্তরকে জানান, জাতিসংঘ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপন করতে পারে না। কারণ এ ধরনের কার্যালয় স্থাপন করতে দিলে সে দেশে মানবাধিকার নিয়ে অনেক বেশি তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ পাবে। মূলত শক্তিশালী দেশগুলো মানবাধিকারকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।
তদুপরি, জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশন গঠিত হলে তারা বৈশ্বিক ও জাতিসংঘের বেঁধে দেওয়া আইন দিয়ে মানবাধিকারের চর্চা করবে, যা ক্ষেত্রবিশেষে স্থানীয় মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। উদাহরণস্বরূপ, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশন কিছু বিষয়ের প্রসার চায়, যা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে গ্রহণযোগ্য নয়। এর মধ্যে সর্বজনীন শিক্ষা (যৌন শিক্ষাসহ) বা নারী-পুরুষের সমান অধিকার এসব বিষয় রয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে নারী ও পুরুষের মধ্যে যেভাবে সম্পত্তি ভাগ হয় তা জাতিসংঘের আইনের সঙ্গে মেলে না। এ রকম আরও কিছু বিষয়ে দেশের সামাজিক মূল্যবোধ, আইন ও জাতিসংঘের আইন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেতে পারে যা অস্বস্তিকর সংকট তৈরি করবে।
এসব কারণে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মত হলো, মানবাধিকার কার্যালয় খোলার বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তা নয়। এর সঙ্গে দেশের ও সমাজের ভবিষ্যৎ কৌশলগত পন্থা নির্ধারণের বিষয় জড়িত। তাদের কেউ কেউ এ বিষয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংলাপের পক্ষে মত দেন। একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘এটা আসলে কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কারণ এখানে কার্যালয় দিতে গেলে, সমাজে ব্যাপক একটি পরিবর্তন আনতে হবে। মানবাধিকার ইস্যুতে অনেক কিছুই যুক্ত হবে। ফলে দেশের জনগণ এটা চায় কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।’
গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। মানবাধিকার কার্যালয় যদি দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে তবে তা প্রতিষ্ঠা করা যেতেই পারে। তবে, এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত না যা ভবিষ্যতে দেশের জন্য কাঁটা হয়ে ওঠে। ফলে তাড়াহুড়া না করাই বাঞ্ছনীয়।
