শীতল মেঝেতে চাই কার্পেট

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৪, ০৪:৫৭ এএম

শীত এলেই ঘরে কার্পেটের কদর বাড়ে। আমাদের বাড়ির মেঝেগুলো টাইলস, মোজাইক বা অক্সাইড রঙের হয়। এ ধরনের মেঝে অনেক বেশি ঠান্ডা থাকে। শীতে ঠান্ডা আরও বেড়ে যায়। তাই মেঝের ঠান্ডা কমাতে ভরসা রাখতে হয় কার্পেট, শতরঞ্জি বা র‌্যাগের ওপর। কার্পেট, র‌্যাগ, শতরঞ্জি শুধু ঠান্ডা থেকে রক্ষা করে না, ঘরের সৌন্দর্য বাড়ায়। শীতে ঘরের আয়তন বুঝে বেছে নেওয়া যায় নানা ধরনের কার্পেট, র‌্যাগ, শতরঞ্জি। বাছাই করার সময় যে বিষয়টা মাথায় রাখতে হয় তা হলো কার্পেটের  নকশা, আসবাব, দেয়াল ও পর্দার রঙ। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

কার্পেটের বিন্যাস

ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে সিনথেটিক কার্পেটের চাহিদা বাড়ছে। এ ধরনের ম্যাট বা কার্পেট আছে নানা রঙ ও ধরনের।  আকারেও পাওয়া যায় বৈচিত্র্য। এর পাশাপাশি আর্টিফিসিয়াল সবুজ ঘাসও ঘর বারান্দা সব জায়গায় ব্যবহার হচ্ছে। তবে শীতে কার্পেট বা শতরঞ্জি যাই ব্যবহার করুন না কেন, অনেক বিষয় মাথায় রাখতে হবে।

শুরুতে খেয়াল রাখতে হবে হিম আবহাওয়ায় ফিকে রঙের কার্পেট ব্যবহার না করা। শীতে উজ্জ্বল রঙের কার্পেট ব্যবহার ঘরের আলো বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। বিশেষ করে গাঢ় লাল, কমলা বা বাদামি রঙের কার্পেট ব্যবহার করা হয়। বাচ্চাদের ঘরে গাঢ় গোলাপি, কমলা নীল রঙের কার্পেট বেশ মানাবে। ডাইনিং ঘরে গাঢ় রঙের কার্পেট ব্যবহার করাই ভালো। অনেকেই ড্রয়িং রুমে একরঙা কার্পেট ব্যবহার করছেন। সে ক্ষেত্রে ঘরে যদি স্নিগ্ধ ভাব আনতে চান, তাহলে বেছে নিতে পারেন সবুজ রঙের যেকোনো শেডের কার্পেট। তার সঙ্গে মিলিয়ে ঘরে রাখতে পারেন ইনডোর প্ল্যান্ট। ঘরের আসবাব, পর্দার ধাঁচের সঙ্গে মিলিয়ে বেছে নিতে হবে কার্পেট। মাল্টিকালারের কার্পেট বেশ জনপ্রিয়। ড্রয়িং রুমের ক্ষেত্রে অনেকেই বেছে নেন এই কার্পেট। সে ক্ষেত্রে ঘরের আসবাবের ডিজাইনের সঙ্গে মিল রাখা জরুরি। যদি আসবাবের ডিজাইন কিছুটা ভিক্টোরিয়ান বা রাজকীয় ধাঁচের হয়, তাহলে মাল্টিকালার পারশিয়ান নকশার কার্পেট বেছে নেওয়াই ভালো। আর যদি ঘরের আসবাব আধুনিক ধাঁচের হয়, তাহলে এক রঙের ভারি কার্পেটই বেশি মানাবে। এক রঙের মধ্যে হালকা ফ্লোরাল ও জিওম্যাট্রিক নকশার কার্পেট, শতরঞ্জি বেছে নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সোফার কুশনের সঙ্গে কার্পেট কিংবা কার্পেটের সঙ্গে পর্দা মিলিয়ে ব্যবহার করতে পারেন।

শোয়ার ঘরে বিছানার চাদর ও পর্দার রঙের সঙ্গে মিল রেখে কার্পেট ব্যবহার করতে পারলে ভালো। তবে বিছানার চাদরের সঙ্গে সঙ্গে তো আর প্রতিদিন কার্পেট বদলানো যাবে না। তবে রঙের বিষয়টা মাথায় রাখলেই ভালো হবে।

যারা দেশীয় লুক বেছে নিতে চান তারা শতরঞ্জি বিছিয়ে নিতে পারেন। ঘরের সৌন্দর্য ধরে রাখতে আয়তন অনুযায়ী মানানসই শতরঞ্জি বিছানো জরুরি। কার্পেট বা শতরঞ্জি কেনার আগে ঘরের সাইজ মেপে নিন। পুুরো ঘরে না বিছিয়ে নির্দিষ্ট অংশে বিছানো ভালো। দেখতে বেশ পরিপাটি লাগবে। বসার ঘরে দিতে পারেন চৌকোনা কার্পেট, শোয়ার ঘরে আয়তকার এবং খাবার ঘরে দিতে পারেন ডিম্বাকার অথবা গোলাকার কার্পেট। এ ছাড়া রান্নাঘর কিংবা বাথরুমে ব্যবহার করতে পারেন রাবারের তৈরি রংবাহারি লম্বালম্বি কার্পেট বারান্দার জন্য আর্টিফিসিয়াল ঘাসের কার্পেট। বিছানার পাশে লম্বা আকারের শতরঞ্জি বা ম্যাট ভালো মানাবে।

শিশুর খেলার জায়গা বাড়ি জুড়েই। তাই ছোট আকারের এমন ফ্লোরম্যাট বা শতরঞ্জি রাখুন, যাতে যেখানে সেখানে বিছিয়ে দিতে পারেন। খাবার টেবিলের নিচে ঠান্ডা মেঝেতে যাতে সরাসরি পা না পড়ে, সে জন্য বাড়তি ব্যবস্থা রাখতে পারেন। টেবিলের নিচে কৃত্রিম উপকরণে তৈরি অনুষঙ্গ বিছিয়ে দিতে পারেন, যেটির নিচের দিকে পাতলা রবারের মতো উপাদান থাকার ফলে পিছলে সরে যায় না। এগুলো দেখতে পাপশের মতো, দামেও কিছুটা সাশ্রয়ী। ঘরে খালি পায়ে থাকার অভ্যাস যাদের, তাদের জন্য এ ধরনের অনুষঙ্গ বেশ ভালো। চাইলে পড়ার টেবিলের নিচেও বিছাতে পারেন। আবার ঘরে স্যান্ডেল পরার অভ্যাস থাকলেও এমন হতে পারে যে, ঘুম থেকে উঠেই হয়তো স্যান্ডেল জোড়া খুঁজে পাচ্ছেন না। তাই বিছানার পাশে সুন্দর রঙ ও নকশার লম্বাটে ম্যাট বা র‌্যাগ বিছিয়ে দিতে পারেন। যাতে খাট থেকে নেমে মেঝেতে পা ফেললেই পায়ে ঠান্ডা না লাগে।

কার্পেটের নানা যত্ন

শীতে ঘরে ধুলাবালি একটু বেশিই হয়। অ্যালার্জিজনিত সমস্যা থাকলে কার্পেট, শতরঞ্জি, র‌্যাগ এসব ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। মেঝেতে বিছানো কার্পেট এক সপ্তাহ পরপর পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। সপ্তাহে একদিন ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে কার্পেট পরিষ্কার করুন। ঘরের সব ফার্নিচার সরিয়ে মাসে একবার কার্পেটের দুই দিক থেকে ভ্যাকুয়াম ক্লিন করুন। কার্পেটের কর্নার থেকে শুরু করে মাঝের অংশ পরিষ্কার করুন। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার না থাকলে ব্রাশ বা ঝাড়ু ব্যবহার করা যেতে পারে। কার্পেট নোংরা হলে ধোয়া যাবে না। কার্পেটের রঙ জ¦লে বা ফিকে হয়ে গেলে নতুন করে রঙ করার ব্যবস্থা করতে হবে। পুরনো কার্পেটকে ঝকঝকে করে ফেলতে পারেন। যারা বাইরের কাজে ভরসা কম পান, তাদের জন্য বাজারে এখন বিভিন্ন ধরনের লিকুইড ওয়াশেবল ডিটারজেন্ট পাওয়া যায়। সেগুলো দিয়ে ঘরে বসে নিজেই মনমতো পরিষ্কার করে নিতে পারেন। কার্পেটে স্লিপ করার আশঙ্কা দূর করতে তলায় প্যাড বা লাইনিং দিয়ে নিন। কার্পেটের একাংশ ভিজে গেলে, পুরো কার্পেট শুকানো ঝামেলার ব্যাপার। কাজ কমাতে ব্যবহার করুন হেয়ার ড্রায়ার। বেশি দিন কার্পেটের ওপর আসবাব থাকলে কার্পেটে দাগ পড়ে ক্ষয় হয়। তাই কার্পেটের ওপর মোটা কাগজ ভাঁজ করে দিন। কার্পেটের গন্ধ দূর করতে কার্পেটের ওপর ফ্রেব্রিকস পারফিউম ব্যবহার করতে পারেন, কিংবা নিজেই সুগন্ধি তৈরি করতে পারেন। যেমন ১০ থেকে ২০ ল্যাভেন্ডার তেলের সঙ্গে ১৬ আউন্স বেকিং সোডা মিশিয়ে নিন। যেন সোডা তেল শোষণ করে নেয়। কার্পেটে ব্যবহার করে তারপর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে কার্পেট পরিষ্কার করে নিন।

একরঙা কার্পেট সহজেই ময়লা হয়ে যায়। কিন্তু নকশাদার বা ডাবল লেয়ারের কার্পেট সহজে ময়লা হয় না। বাচ্চার ঘরে রঙিন নকশাদার সুতি বা জুটের কার্পেট আদর্শ। কারণ সহজেই পরিষ্কার করা যায়। পিওর উল, সিল্কের কাশ্মীরি বা পার্শিয়ান কার্পেট বেছে নিন বসার ঘরের জন্য। কার্পেটের কোনো কোনো জায়গায় চাপ বেশি পড়ে। যেমন আসবাবের পায়া, সোফাসেট বা সেন্টার টেবিলের সামনে ইত্যাদি। দীর্ঘদিন ধরে চাপ পড়লে কার্পেটের এসব জায়গা পাতলা হয়ে রঙ চটে নষ্ট হতে পারে। তাই আলাদা রাগ বা কার্পেট পেতে দিন কার্পেটের ওপর। এতে কার্পেট অনেক দিন ভালো থাকবে। কার্পেটের ধুলা পরিষ্কার করতে বছরে অন্তত দুই থেকে তিনবার কার্পেট পিটিয়ে ঝাড়া দরকার। বড় বারান্দা, ছাদ বা প্রশস্ত লনে কার্পেটটি উল্টো করে পেতে মোটা লাঠি বা কার্পেট ব্রাশের লম্বা হাতল দিয়ে পেটান। ঝাড়া হয়ে গেলে কার্পেটের চারটি কোণ ধরে তুলে আনুন বা উল্টো দিকে রোল করে নিন। তা হলে ধুলোটা বাইরেই পড়ে থাকবে। গোটা কার্পেটে প্রচুর পরিমাণে মোটা দানার লবণ ছড়িয়ে দিন। তারপর শক্ত দাঁড়ার স্টিফ ব্রাশ দিয়ে জোরে জোরে ঘষে পরিষ্কার করুন।

কার্পেটের জমাট বুনন যেদিকে, সেই দিকেই ডাস্টার বা ব্রাশ চালাবেন। উলের কার্পেট থেকে নতুন অবস্থায় বেশ কিছু রোঁয়া বেরুতে থাকে। এই কার্পেট খুব জোরে ঘষে পরিষ্কার করা উচিত নয়। ব্রাশের বদলে ভ্যাকুয়াম বা হালকা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করুন। সপ্তাহে অন্তত একদিন পরিষ্কার করুন। কার্পেটে খাবার পড়ে গেলে খাবার তুলে নিয়ে সেখানে ভিনিগার বা লেবুর রস ছড়িয়ে দিন। হালকা গরম পানি দিয়ে ঘষে নিন। একটা পরিষ্কার কাপড় অ্যামোনিয়ার ভিজিয়ে জায়গাটি মুছে নিন। শুকিয়ে গেলে ডিটারজেন্ট ছড়ান। খাবারের দাগ, গন্ধ পুরোপুরি দূর হবে। কার্পেটের দাগ ছোপ তোলার জন্য কোনো ক্লিন সলিউশন বা রিমুভার ব্যবহার করার আগে কার্পেটের কোনো একটি কোনায় ক্লিনারটি ঢেলে পরীক্ষা করে দেখে নিন। রঙ চটে বা কার্পেটের অন্য কোনো ক্ষতি হচ্ছে কিনা।

দরদাম

ঢাকার বড় কার্পেট বাজার এলিফ্যান্ট রোড। শীত এলেই বাসাবাড়ি এবং মসজিদের জন্যও কার্পেটের চাহিদা বাড়ে। এসব দোকানে সিনথেটিক, ভেলভেট এবং সুতির বুনটের কার্পেটসহ বিভিন্ন ধরনের কার্পেট পাওয়া যায়। কোনো কোনোটা বিক্রি হয় পিস হিসেবে, আবার কোনোটা প্রয়োজনীয় মাপ মতো কেটে ফিট হিসেবে বিক্রি হয়। এলিফ্যান্ট রোডের কার্পেটের দোকানে সর্বনিম্ন ১ হাজার ৮০০ থেকে শুরু করে ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে সাইজ এবং কোয়ালিটিভেদে বিভিন্ন রকম কার্পেট পাওয়া যায়। এসবের সাইজ ২ ফুট বাই ৩ ফুট থেকে শুরু করে ৯ ফুট বাই ১২ ফুটও হয়ে থাকে। ৯ ফুট বাই ১২ ফুট কার্পেটের দাম ৮ হাজার থেকে শুরু করে কোয়ালিটিভেদে ৪২ হাজার টাকাও দাম হয়ে থাকে। নকশা, ডিজাইন, সাইজের ওপর নির্ভর করে কার্পেটের দরদাম। কার্পেটের স্কয়ার ফুট ৫০-২৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এসব কার্পেট সাধারণত তুরস্ক, ইরান, চীন, বেলজিয়াম ও দুবাই থেকে আমদানি করা হয়। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড, পল্টন, গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম মার্কেট, উত্তরা ও গুলশানে রয়েছে নানা ধরনের কার্পেটের দোকান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত