অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন নাকি নতুন ইতিহাস

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৪, ০২:৪১ এএম

ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবাজ নাকি যুদ্ধবিরোধী সেই প্রশ্ন আজও এক অমীমাংসিত রহস্য। তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন যুদ্ধ থামানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডগলাস ও মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফ্রান্সিস দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়ে বের করেছেন, ২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনকে ধরাশায়ী করতে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। মিশিগান, পেনসিলভানিয়া ও উইসকনসিনের মতো দোদুল্যমান রাজ্যগুলোর যেসব কাউন্টিতে যুদ্ধাহত মার্কিন সৈন্যসংখ্যা বেশি ছিল ট্রাম্প সেখানে সহজেই জয়লাভ করেন।

ভোটারদের প্রত্যাশা তিনি পূরণ করেছিলেন। তার চার বছরের শাসনামলে আমেরিকা নতুন করে কোনো দেশে আক্রমণ করেনি। আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্যসংখ্যাও কমিয়ে আনেন। তালেবানের সঙ্গে আলোচনা ও শান্তিচুক্তি প্রক্রিয়া শুরু করেন। তাই বলে ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্র বহির্বিশ্বে আগ্রাসনের তীব্রতা মোটেও কমায়নি। ওবামার দুই মেয়াদ মিলিয়ে ড্রোন হামলার সংখ্যা ছিল ১৮৭৮টি। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম দুই বছরেই ড্রোন হামলার সংখ্যা ২২০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট যে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল ট্রাম্পের সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন ছাড়া তা সম্ভব হতো না। ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় তার সবচেয়ে বেপরোয়া সিদ্ধান্ত ছিল দামেস্ক বিমানবন্দরে মিসাইল ছুড়ে ইরানি জেনারেল কাশেম সোলায়মানিকে হত্যার নির্দেশ প্রদান। ইরান সরকার যথেষ্ট সংযত ছিল বলে সে-যাত্রা বড়সড় সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। এছাড়াও উত্তর কোরিয়াকে শায়েস্তা করতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়ে টুইট করে বিশ্বজুড়ে তিনি আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন।

২০২০-এর নির্বাচনী প্রচারণায় জো বাইডেন বারবার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, যুদ্ধপ্রিয় ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতি যুক্তরাষ্ট্রকে অনিরাপদ করে তুলেছে। পাশ্চাত্যের মূলধারার গণমাধ্যমও একই সুরে প্রচার চালিয়েছিল। ২০১৭ সালে নিউ ইয়র্কার-এর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ উন্মাদনা থামাবে কে? খামখেয়ালি ও খ্যাপাটে ট্রাম্পকে সরিয়ে হোয়াইট হাউজে জো বাইডেনের প্রবেশ তাই মার্কিনিদের আশ্বস্ত করেছিল। কিন্তু পাশার দান উল্টে দিয়েছে পৌনে তিন বছর ধরে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিন/লেবানন বনাম ইসরায়েল যুদ্ধ। বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেন ও ইসরায়েলকে চাহিবামাত্র অর্থ ও মারণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। ইউক্রেনের পক্ষে মার্কিনিদের কিছুটা জনসমর্থন থাকলেও গাজা গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলের প্রতি সাধারণ মার্কিনিদের সমর্থন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। বাইডেন তবুও ইসরায়েলকে সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছেন।

ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের যুদ্ধব্যয়ের ৭০ শতাংশ বহন করছেন মার্কিনি করদাতারা। গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ২২.৭৬ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে। গড় করে দেখা যাচ্ছে, প্রত্যেক ইসরায়েলি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে মাথাপিছু ২৪০০ ডলার পেয়েছে। পক্ষান্তরে হারিকেন মিল্টনে ঘরবাড়ি হারানো মার্কিনিরা সরকারের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৭৭০ ডলার পেয়েছে। আর ইউক্রেনের জন্য বাইডেন প্রশাসন ৬১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সহায়তা বরাদ্দ করেছে। এদিকে ঘূর্ণিঝড় কবলিত এলাকাগুলোর জন্য মার্কিন সরকারের ত্রাণ তহবিলে পর্যাপ্ত ডলার নেই। অন্য দেশের যুদ্ধব্যয়ের বোঝা টানতে টানতে ক্লান্ত-বিরক্ত অনেক মার্কিনি তাই বিকল্প খুঁজছেন। অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো, তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আরেকবার সুযোগ দিতে চাচ্ছেন। ঝানু ব্যবসায়ী ট্রাম্পও সুযোগটা লুফে নিয়েছেন। এক জনসমাবেশে তিনি বলেছেন, যাদের বাড়ি সাগরে ভেসে গেছে তাদের দেওয়া হচ্ছে ৭৫০ ডলার। আর যেসব দেশের নামও আমেরিকার বেশিরভাগ মানুষ শোনেনি তাদের উদ্ধার করতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাঠানো হচ্ছে।

যুদ্ধবিরোধী ভোটারদের টানতে ট্রাম্প মওকা পেলেই জোর গলায় বলছেন, নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ খুব দ্রুত থামিয়ে দেবেন। তার পুরনো একটি সাক্ষাৎকারের ভিডিও নেটিজেনরা শেয়ার করছেন। সেখানে ট্রাম্পকে বলতে শোনা গেছে, ‘আমরা যুদ্ধে জড়াই, বোমা মেরে ছাতু বানিয়ে ফেলি। তারপর সেখান থেকে চলে আসি। পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আমরা বোমা ফেলেছি। কী পেয়েছি? কিছুই না।’ ট্রাম্পের যুদ্ধবিরোধী ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে রিপাবলিকান নেতারা এবং রক্ষণশীল মিডিয়া সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করেছে। জানুয়ারি মাসে রিপাবলিকান ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জে ডি ভ্যান্স ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এ লিখেছেন, ‘একের পর এক প্রেসিডেন্ট আমেরিকাকে অবিবেচনাপ্রসূত যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং যুদ্ধগুলো জিততে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প তার দল, এমনকি নিজের প্রশাসনের সদস্যদের পক্ষ থেকে প্রবল চাপ সত্ত্বেও নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু করেননি।’

ট্রাম্পের প্রতিপক্ষ কমলা হ্যারিস ইউক্রেন বা গাজা যুদ্ধের ব্যাপারে বাইডেন প্রশাসনের নীতিই অনুসরণ করবেন এমন ধারণা প্রবল। ফলে রিপাবলিকানদের প্রতি মুসলিম ভোটারদের সমর্থন বাড়ছে। যেমন, ট্রাম্পকে সমর্থন করার কারণ জানতে চাইলে সিএনএন-এর সাংবাদিককে মিশিগানের মুসলিম সংগঠক সামরা লুকমান বলেন, হ্যারিস জিতলে গাজায় গণহত্যা যে চলমান থাকবে, সে সম্ভাবনা শতভাগ। আর ট্রাম্পের আমলে সেটা যদি ৯৯ শতাংশও হয়, আমি ওই ১ শতাংশ সম্ভাবনাটি বেছে নেব। ২০২১ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা শিরোনাম করেছিল ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প: দ্য এন্ড।’ একই পত্রিকা গত শনিবার রিপোর্ট করতে বাধ্য হয়েছে, নির্বাচনের ফলাফল সুতোর ওপর ঝুলছে। ট্রাম্প যদি সত্যিই জিতে যান, এটা হবে আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন। ক্ষমতাসীন কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে গিয়ে চার বছর পর আবার জয়ী হয়েছেন, এমনটা একবারই ঘটেছে। তাও ১৩৬ বছর আগে।

১৮৮৮ সালে হোয়াইট হাউজ ছেড়ে যাওয়ার সময় গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড একজন কর্মীকে বলেন, সবকিছু যেভাবে আছে সেভাবেই গুছিয়ে রাখবে। চার বছর পর আমি ফিরে আসছি। বাইডেনের শপথ গ্রহণের দিন মেরিল্যান্ড বিমানঘাঁটির টারম্যাকে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পও বলেছিলেন, আমরা ফিরে আসব। নির্বাচনে জিতে ট্রাম্প কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাবেন? নাকি হিস্পানিক ও নারী ভোটারদের ওপর ভর করে কমলা হ্যারিস যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়বেন? উত্তর মিলবে আগামীকাল।

লেখক : অনুবাদক ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত