পাচারকথন

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৪, ০২:৪৩ এএম

বাংলাদেশে কোন ‘পদার্থ’ পাচার না হচ্ছে? দেখা যাবে, মাটি-মানুষ থেকে শুরু করে সবকিছু ‘নাই’ হয়ে যাচ্ছে। মানব, অর্থ, স্বর্ণ, মূল্যবান ধাতু, মাদক, অস্ত্র, পশুপাখি, বিভিন্ন কেমিক্যাল এবং সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়ামের মতো আয়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ছাইও পাচার হচ্ছে। কিন্তু কোনো পাচারের জন্য কি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে? স্বর্ণ বা মাদক পাচারের ক্ষেত্রে কেউ ধরা পড়লেও অদৃশ্য কারণে তার পরবর্তী সন্ধান অজানা থাকে। আর বাকি পাচারগুলোর জন্য কারা অপরাধী?

সবচেয়ে লোভনীয় পাচার হচ্ছে, অর্থ পাচার। এটি অনেক ধরনের হতে পারে। ব্যাংকিং, বিনিয়োগ, চালান এবং সম্পত্তিসহ সব ধরনের লেনদেনে এটি হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা পাচার হয়েছে, হবে- সেটি সবাই জানেন। তাহলে তা বন্ধ হচ্ছে না কেন? স্বাধীনতার পরের অর্থবছর থেকে এই পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১২ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানির আড়ালে বিভিন্ন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০০০ কোটি টাকা পাচারের তথ্য পেয়েছিলেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এ রকম অনেক তথ্যই তারা পান। সরকার আন্তরিক হলে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা যে সম্ভব, তার উদাহরণ রয়েছে। একযুগ আগে সিঙ্গাপুর থেকে ২০ কোটি ৮৮ লাখ ৭০ হাজার টাকার সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা ফেরত আনা হয়েছিল। এটি যতটা না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে ছিল বেশি রাজনৈতিক। কিন্তু তারপর? আসলে সাপুড়ের মাথার ওপর বিষধর সাপ থাকলে, ওই সাপের বিষ জনসমক্ষে বের করবে কে? যে কারণে অতীতে অর্থ পাচার হয়েছে, বর্তমান এবং ভবিষ্যতেও কমবেশি হবে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে রবিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে- বাংলাদেশ থেকে মোট কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা সম্ভব নয়। আনুষ্ঠানিক মাধ্যম ব্যবহার করে ১৭ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ পাচারের কথা জানা যায়। বিভিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে ধারণা করা যায়, বাংলাদেশ থেকে বছরে গড়ে ১২-১৫ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর অর্থ পাচারের যে তথ্য দেন, তার সঙ্গে বেসরকারি অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টে সেই তথ্যের কোনো মিল থাকে না। আমরা চাই, সুনির্দিষ্টভাবে অর্থ পাচারের অঙ্ক জানানো হবে। যাতে সেটি পরিবর্তিত না হয়। কেউ যেন না বলেন, বিষয়টি ছিল কথার কথা।  দেশের ব্যাংক খাতকে যে খাদের কিনারায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তার পেছনে মূল দায় হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই। শনিবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে ‘পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উপায়’ বিষয়ে সেমিনার হয়েছে। অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইআরএফ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ যৌথভাবে এ সেমিনার আয়োজন করে। আগেও অনেকবার বিভিন্নভাবে অর্থ পাচারের কথা জানা গেছে। কিন্তু তারপর আর সাড়াশব্দ নেই। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সেমিনারে জানিয়েছেন পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সম্ভব, যদিও তা অনেক কঠিন ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যেসব দেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে, ওইসব দেশের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে পাচার করা অর্থ ফেরত আনা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেশগুলোর সহযোগিতার মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়েস্ট সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেন, পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া এবং আর্থিক অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করায় গুরুত্ব দিতে হবে। এসব উদ্যোগ নিলে পাচার হওয়া টাকার পুরোটা না হলেও কিছু অংশ উদ্ধার করা সম্ভব।

আসলে রাজনৈতিকভাবে আন্তরিক সদিচ্ছা থাকলে, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা সম্ভব। এ বিষয়ে  স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে উদ্যোগী হওয়ার নজির কখনো কখনো বিচার বিভাগ স্থাপন করেছে। প্রভাবশালী কিছু দুর্বৃত্ত বিদেশে হাজার হাজার কোটি ডলার পাচার করে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু সেই সংবাদের সূত্র ধরে হাইকোর্ট বিভাগ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন, ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এনবিআর এবং পুলিশের আইজিকেও এই নির্দেশের পক্ষভুক্ত করা হয়েছিল। তারপর? এবার সুযোগ এসেছে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে দেশের জন্য কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করার। পাচার হওয়া অর্থ আন্তরিক উদ্যোগ নিয়ে কি ফেরত আনা হবে? 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত