‘বুয়েটছাত্র ফারদিন হত্যায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতৃত্ব’

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:২৬ এএম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিবিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশকে কৌশলে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং এই হত্যাকাণ্ডে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার সাবেক নেতারা জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন ফারদিনের বাবা নূর উদ্দিন রানা। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদ, বুয়েট ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধের দাবিতে সরব হওয়া এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা ফারদিনের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়। বাবা নূর উদ্দিন রানার দাবি, ছাত্রলীগকে প্রশ্নবিদ্ধ করায় দীর্ঘ পরিকল্পনা করে হত্যা করা হয় ফারদিনকে।

২০২২ সালের ৪ নভেম্বর বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ফারদিন নূর পরশ ডেমরার কোনাপাড়ার বাসা থেকে ক্যাম্পাসের উদ্দেশে বেরিয়ে নিখোঁজ হন। এর তিন দিন পর নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে তার মরদেহ পাওয়া যায়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার হারুন আর রশীদ বলেছিলেন, পড়ার চাপে ফারদিন আত্মহত্যা করেছেন। এ ঘটনায় হওয়া মামলায় ডিবির তদন্ত প্রতিবেদনে না-রাজি দেন ফারদিনে বাবা। পরে মামলাটির তদন্তভার যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। গেল প্রায় দেড় বছরে আলোচিত এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ পিছিয়েছে ১৮ বার। আগামী ১২ নভেম্বর ফের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ রয়েছে।

এই হত্যা মামলার বাদী ফারদিনের বাবা নূর উদ্দিন রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবরার ফাহাদ ও ফারদিন নূর পরশ দুজনই হত্যার শিকার। ভারত বিরোধিতার কারণে আবরার হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হলেও ফারদিন হত্যা নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে। এই হত্যার মাস্টারমাইন্ড বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বুয়েটের সাবেক নেতারা। এর কারণও সুস্পষ্ট, আবরারকে নিয়ে আলোচনার মুখপাত্র ছিল ফারদিন। ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট ঘিরে বুয়েট ক্যাম্পাসে বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের ব্যানারে জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের “লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার” ক্যাম্পেইনের কারণে, যার মাস্টারমাইন্ড ছিল ফারদিন নূর।’ এ ছাড়া বিভিন্ন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি বন্ধ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবরারের মৃত্যু নিয়ে আলোচনা করায় টার্গেট করে ফারদিনকে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে মারধর করে হত্যা করা হয় বলে দাবি করেন নূর উদ্দিন রানা।

ফারদিনের মৃত্যুর ঘটনায় হওয়া মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত সুপার মো. শারাফাত উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। আমি তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার আগে এই মামলা পুলিশ, ডিবি ও সিআইডির কর্মকর্তারা তদন্ত করেছেন। তিন মাস আগে আমাকে তদন্তভার দেওয়া হয়েছে। আগামী ১২ নভেম্বর তদন্ত প্রতিবেদনের তারিখ নির্ধারিত আছে। তদন্তে অনেক কিছু উঠে এসেছে, সেই বিষয়গুলো এখন বলা যাচ্ছে না। পরবর্তী নির্ধারিত তারিখে আদালতে এই মামলার তদন্তের বিষয়ে আলোচনা করা হবে।’

দফায় দফায় তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ পেছানোয় ক্ষুব্ধ ও হতাশ ফারদিনের বাবা নূর উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ড সংঘটনের দুই মাসের মধ্যে ফারদিন আত্মহত্যা করেছে মর্মে ডিবি প্রতিবেদন দাখিল করলেও দেড় বছরেও অধিকতর তদন্তের দায়িত্বে থাকা সিআইডি প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি আদালতে। পতিত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে পুলিশ লীগ হয়ে ওঠা তদন্ত সংস্থার এমন প্রহসনের নাটকীয়তা বিগত ১৫ বছর দেশবাসী বহু দেখেছে, জেনেছে। সাংবাদিক সাগর-রুনি দম্পতি, নারায়ণগঞ্জে ত্বকী, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে তনু হত্যাসহ আরও সহস্র হত্যাকাণ্ডের মতো একইভাবে প্রহসনের তদন্ত চলছে ফারদিন হত্যা মামলার। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমার ছেলের মৃত্যুর সঠিক বিচার আশা করছি।’

ফারদিনের বাবা নূর উদ্দিন পেশায় সাংবাদিক, একজন সাংবাদিক হিসেবে এই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ কী মনে হয়? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ফারদিন হত্যার মোটিভ ও রহস্যময়তা বুঝতে উপলব্ধি করতে হবে আবরার হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েট ছাত্রলীগের দুর্দশাগ্রস্ত বাস্তবতাকে! এই হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে অনেকগুলো পয়েন্ট রয়েছে। জাতির জনকের শোকসভা পণ্ড নিয়ে বিতর্ক, বুয়েটের সাবেক নেতাদের অপমান, ছাত্ররাজনীতি চালুর জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোর না করাসহ বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে ফারদিনকে পর্যবেক্ষণ করুন। এ ছাড়া ফারদিন টার্গেট হওয়ার মূল কারণ হলো, ছেলেটি বহুমাত্রিক প্রতিভায় ক্যাম্পাসে নিজেকে মেলে ধরতে সক্ষম হয়েছিল। বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে বুয়েটের প্রতিনিধি হওয়ার মতো অবস্থানে পৌঁছেছিল।’

হত্যার পরিকল্পনা বা কাদের সন্দেহ হয় জানতে চাইলে নূর উদ্দিন বলেন, ‘ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে মরিয়া বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সিনিয়র নেতা এবং ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্সের (আইইবি) সভাপতি প্রকৌশলী এমএ সবুর এবং প্রকৌশলী মনজুরুল হক মঞ্জুর নেতৃত্বে ফারদিনকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।’

প্রকৌশলী এমএ সবুর ও মঞ্জু কীভাবে সম্পৃক্ত? এ প্রশ্নের উত্তরে ফারদিনের বাবা বলেন, ‘সবুর ও মঞ্জুরা সুবিধাভোগী। বুয়েটে ছাত্ররাজনীতির সুবিধা নিয়ে আইইবিতে আওয়ামী চক্র প্রকৌশল খাতের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ এবং লোভনীয় পদগুলো বাগিয়ে নিয়েছে। প্রকৌশলী এমএ সবুর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী মনোনয়নে সংসদ সদস্য (কুমিল্লা-২) নির্বাচিত হয়েছেন। আর প্রকৌশলী মঞ্জু এমপি মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।’

দীর্ঘ পরিকল্পনায় হত্যার অভিযোগ : বাবা নূর উদ্দিন মনে করেন, ‘আমিই আবরার’, ‘লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার ক্যাম্পেইন’ এবং তৎকালীন শাসকের সামনে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে ‘কীভাবে এ দেশে বেঁচে থাকা যায়?/How to Survive in this Country--101?))-এর মতো বিভিন্ন কর্মসূচি পালনই ফারদিনকে শাসকদলের খুনিদের টার্গেটে পরিণত করেছিল। নূর উদ্দিন বলেন, ‘যে শাসকগোষ্ঠী দেশটাকে সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, কানাডার মতো বেহেশত বানিয়ে ফেলার দাবি করত, তাদের পক্ষে কী “কীভাবে এ দেশে বেঁচে থাকা যায়?” এমন প্রশ্নকারীকে সইতে পারার কথা! জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতা, দেশের সেরা প্রকৌশল বিবিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর চলমান পৈশাচিকতা দর্শনে ছেলেটির মনে জেগেছিল জ্বলজ্বলে শাত প্রশ্ন, তাই তো বলেছিলেন, “কীভাবে এ দেশে বেঁচে থাকা যায়”?’

নূর উদ্দিনের দাবি, পরিকল্পিত হত্যাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার কৌশল হিসেবে মূল ঘটনা সংঘটনের দূরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসের বাইরে হত্যার পরিকল্পনা করে খুনিরা (৪ নভেম্বরে, লম্বা ছুটির পূর্বদিন নির্ধারণ)। আর জনবিভ্রান্তি সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ফারদিনের নারী বন্ধুকে ব্যবহার করে। ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে অপহরণের সুযোগ করে নিতে বান্ধবী বুশরার সম্পৃক্ততায় ফারদিনকে ক্যাম্পাসের বাইরে রেখে সময়ক্ষেপণের ফাঁদে ফেলে। রাত ১০টায় রামপুরা থেকে অপহরণের পর দৃশ্যমান আঘাতহীন হত্যার পরিকল্পনায় বাবুবাজার ব্রিজ, কেরানীগঞ্জ ব্রিজ, শামসুল ব্রিজ বা যেকোনো ব্রিজ থেকে জখমহীন প্রচণ্ড আঘাতের জন্য সাঁতার না জানা ফারদিনকে ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।

কেমন আছেন বুশরা : ফারদিন হত্যা মামলার আসামি আমাতুল্লাহ বুশরা গ্রেপ্তারের পর ৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। ডিবির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পর তাকে স্থায়ী জামিন দেয় আদালত। তবে অধিকতর তদন্তের স্বার্থে সিআইডি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। জামিনে মুক্তির পর থেকে বুশরা পড়ালেখায় মনোনিবেশ করেছেন। বুশরার বিষয়ে জানতে চাইলে তার বাবা মঞ্জুরুল ইসলাম সবুজ বলেন, ‘আমার মেয়ে নিয়মিত পড়াশোনায় ফিরেছে। ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছে, ক্লাস-পরীক্ষা দিচ্ছে। তবে সে সব সময় চুপচাপ থাকে। তাকে আগের মতো প্রাণবন্ত দেখা যায় না। তার মনের ভেতরে কী চলে, সেগুলো কখনো আমাদের বলে না। আমরাও জোর করি না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত