টিকে থাকার লড়াইয়ে চিংড়ি রপ্তানিকারকরা

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৪, ০২:০৫ এএম

বাংলাদেশের সাদা সোনার তকমা নিয়ে সম্ভাবনা দেখিয়েছিল হিমায়িত চিংড়ি। কিন্তু শুরুর দিকে যে সনাতনী পদ্ধতিতে উৎপাদন হতো, এখনো সেভাবেই হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানিকারকরা কম দামে কাঁচামাল পেয়ে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু উল্টো রথে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। একদিকে বিশ্বব্যাপী আঞ্চলিক অস্থিরতা, অন্যদিকে দেশের ব্যাংক খাতে সুদের হার বাড়ায় প্রায় মরতে বসেছেন চিংড়ি উৎপাদনকারীরা।

বাংলাদেশের হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানিতে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছিল ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে ৫৭ কোটি ডলারের চিংড়ি রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হওয়ায় আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের চিংড়ি রপ্তানি হয়েছে। প্রবৃদ্ধি তো নেই-ই বরং এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে এ খাতের রপ্তানিকারকরা।

অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ে বাণিজ্য উপদেষ্টার সঙ্গে গতকাল সোমবার বৈঠক করেছেন বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। তারা দাবি জানিয়েছেন, এক দশকের বেশি সময় কাঁচামালের অভাবে রপ্তানি প্রতি বছরই কমছে। তাছাড়া ব্যাংকের সুদের হার বেশি হওয়ায় অনেকেই টিকে থাকার লড়াইয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। সরকারের কাছে চিংড়ি উৎপাদনকারীদের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক জোন চেয়েছেন তারা।

বৈঠকে তাদের দাবি কী ছিল জানতে চাইলে সংগঠনটির সিনিয়র সহসভাপতি আশরাফ হোসেন মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা রপ্তানি করছি, কিন্তু ব্যাংকের সুদহার বেড়ে গেছে। আমাদের কিছু কিছু দুর্বল প্রজেক্ট আছে, যাতে এগুলো পাটের মতো এক্সিট পলিসি পায়। বিশেষ করে ব্যাংকের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় আমাদের কিছু সাবসিডি আটকে গেছে, আমরা আমাদের কাঁচামাল কিনতে পারছি না।

বাংলাদেশের হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারকরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাগদার চাহিদার পাশাপাশি দামও কমেছে। অন্যদিকে চিংড়ির উচ্চফলনশীল জাত ভেনামির চাষও পুরোপুরি শুরু হয়নি। বর্তমান বিভিন্ন দেশ থেকে রপ্তানি হওয়া চিংড়ির সিংহভাগই ভেনামি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই হিমায়িত চিংড়ির রপ্তানি কমেছে।

ভারতের হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি ৫০০ কোটি ডলারের বেশি। তার মধ্যে অধিকাংশটাই ভেনামি। যদিও গত অর্থবছর তাদের ভেনামি চিংড়ির রপ্তানি ৮ শতাংশ কমে ৪৮১ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ ৫৫ কোটি ডলারের চিংড়ি রপ্তানি হয়েছিল ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। তারপর টানা সাত বছর পণ্যটির রপ্তানি কমেছে। করোনার পর ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪১ কোটি ডলারের চিংড়ি রপ্তানি হয়।

রপ্তানিতে পিছিয়ে যাওয়ার কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, কাঁচামালের দাম বেশি হওয়ায় আমরা রপ্তানি বাড়াতে পারছি না। এজন্য প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে বিশ^বাজারে টিকে থাকতে পারছি না।

প্রতিযোগী দেশগুলো আমাদের চেয়ে কোথায় এগিয়েÑএমন প্রশ্নের জবাবে আশরাফ আহমেদ মাসুদ বলেন, ভারত কিংবা ভিয়েতনামে কাঁচামালের দাম খুবই কম। ভেনামি চিংড়ি প্রকল্পে তাদের খরচ কম, উৎপাদন বেশি। আমাদের এখানে উৎপাদন কম, লোকজন বেশি, তারা নিজেরাই খেয়ে ফেলছে। যার ফলে অনেক সম্ভাবনা থাকলেও আমরা টিকে থাকতে পারছি না।

অর্থনৈতিক মন্দায় সস্তা ভেনামির দিকে ঝুঁকছে বিশ^ভোক্তারা। বিশ^বাজারের চাহিদা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সেই জায়গাটা ধরে নিয়েছে ভেনামি চিংড়ি। কম দামে বিশ^বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। আমাদের বাগদা এবং গলদা চিংড়ি আগে ব্যাপকভাবে মানুষের ঘরে ঘরে রান্না হতো, বিভিন্ন রেসিপিতে মানুষ ব্যবহার করত। কিন্তু অধিক দামের কারণে এখন এটা ক্রমান্বয়ে কমতে কমতে হোটেল-রেস্টুরেন্টের মধ্যে কিংবা পর্যটক এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।

গতকাল সোমবার বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিনের সঙ্গে দেখা করতে গেলে প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে চিংড়ির উৎপাদন বাড়ানো আহ্বান জানান তিনি।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বিদেশে আমাদের চিংড়ির চাহিদা রয়েছে। সনাতন পদ্ধতির কারণে দেশে উৎপাদন কম হচ্ছে। প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে চিংড়ির উৎপাদন বাড়াতে হবে। উৎপাদন না বাড়ালে রপ্তানি বাড়বে না।

গতকাল সোমবার বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ আহ্বান জানান।

এ সময় বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, সরকার বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) ও বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনস অথরিটিকে (বেজা) ঢেলে সাজিয়েছে। দেশে বিনিয়োগ পরিবেশ এখন চমৎকার। এ সময় তিনি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসায়ী নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী বেলায়েত হোসেন বলেন, এক দশকের বেশি সময় ধরে কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন ক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছে না প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানাগুলো। তাতে রপ্তানির পরিমাণ দিনদিন কমছে। করোনা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের চিংড়ি ও মাছের চাহিদা এবং মূল্য দুটিই কমেছে। আবার দেশের বাজারে দাম বেড়েছে, ফলে রপ্তানি কমছে।

এ সময় নেতারা পাটের মতো চিংড়িকেও কৃষিপণ্য ঘোষণা, খুলনা ও চট্টগ্রামে চিংড়িশিল্পের জন্য আলাদা ইকোনমিক জোন স্থাপন, চিংড়ি রপ্তানিতে ব্যাংকের আলাদা সুদ হার নির্ধারণ ও নগদ সহায়তার বকেয়া পরিশোধের দাবি জানান।

অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান, বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী বেলায়েত হোসেন, বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি আশরাফ হোসেন মাসুদ, সদস্য শ্যামল দাস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত