যে কৌশলে প্রচার চালিয়েছেন কমলা

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৪, ০২:৩৩ এএম

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে  কমলা হ্যারিস   কিছু কৌশল অবলম্বন করেন, যা তাকে জিতিয়ে দিতে পারে। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পদের লড়াইটা কঠিন। সবসময় তিনি চ্যালেঞ্জের ভেতর ছিলেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এ লড়াই শুরু করেন। তবে বয়সজনিত কারণে মাঝপথে তিনি সরে দাঁড়ান। তখন কমলা আসেন ময়দানে। ফলে ট্রাম্পের তুলনায় তার দৌড় শুরু হয় দেরিতে। এ ছাড়া তিনি একটি অজানা পরিস্থিতি এবং একটি কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়ছেন। তিনি এমন এক নির্বাচনী পরিবেশে এসে দাঁড়ালেন, যেখানে সবাই চায় পরিবর্তন। বাইডেন বা ট্রাম্প উভয়েই বয়স্ক, বৃদ্ধ, তাদের ওপর বেশিরভাগ ভোটার বিরক্ত। সেখানে তুলনামূলক কম বয়সী এবং একজন নারী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হয় কমলাকে। নিউ ইয়র্ক টাইমসে সাংবাদিক অ্যাডাম নাগরনি লিখেছেন, যদি কমলা জয়ী হন, তাহলে তিনি এমন কিছু কৃতিত্ব পাবেন, যা আগে কেউ পাননি। নাগরনির এ প্রতিবেদনে কমলা হ্যারিস জয়ী হওয়ার কিছু কারণ অনুসন্ধান করা হয়েছে। বিভিন্ন জনকে জিজ্ঞেস করে এসব কারণ জানার চেষ্টা হয়েছে। 

ভোট চাওয়া

কমলা হ্যারিস জিততে পারেন দ্বারে দ্বারে ভোট চাওয়ার পদ্ধতির জন্য। প্রথাগত ডেমোক্রেটিক প্রার্থীরা ‘গেট আউট দ্য ভোট’ প্রচেষ্টার মাধ্যমে ভোটারদের দরজায় কড়া নাড়ে। তারা এ কাজে বেতনভুক্ত কর্মী এবং ইউনিয়নের ওপর নির্ভর করে। যারা কমলা হ্যারিসের পক্ষে ভোটারদের কাছে যান। বিপরীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প এ কাজটি মূলত ইলন মাস্কসহ তার সহযোগীদের ওপর ছড়ে দেন। অর্থাৎ তিনি ভোট ‘আউটসোর্স’ করেন। এখানে সমস্যা হলো, ইলন মাস্ক বা এমন ব্যক্তিদের পক্ষে একদল কর্মীকে সংগঠিত করে তাদের ভোটারদের কাছে যেতে বলার মতো সাংগঠনিক দক্ষতা নেই। হ্যারিস প্রচারাভিযানে বলেছেন, তার দল সমর্থকদের খুঁজে বের করতে এবং তাদের ভোট আদায়ের জন্য দেশব্যাপী ৩৫৩ অফিসে ২৫০০ কর্মী সদস্যকে প্রেরণ করা হয়। শুধু এক সপ্তাহে তাদের ক্যাম্পেইনটি ছয় লাখ দরজায় কড়া নেড়েছে। প্রায় তিন মিলিয়ন ফোন কল করা হয়েছে। হ্যারিস যদি জেতেন তাহলে প্রমাণিত হবে রাজনৈতিক তৎপরতা, ভোটারদের কাছে যাওয়া, তাদের প্রতি ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

গর্ভপাত

গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার বাতিল করার পর থেকে দুই বছরে ডেমোক্র্যাটরা জাতীয় এবং কংগ্রেসের নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। এ প্রবণতা ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ঘিরে ২০২৩ সালের জুলাইয়ের প্রথম জরিপে ২১ শতাংশ উত্তরদাতা গর্ভপাতকে মূল গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করে। আর ২০২৪ সালের অক্টোবরের সর্বশেষ জরিপে ৩৮ শতাংশ ভোটার গর্ভপাতকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নারী এবং তরুণ ভোটারদের মধ্যে হ্যারিসের প্রচার গর্ভপাতের বিষয়টিকে জোরালো করেছে। গর্ভপাত হ্যারিস সমর্থক ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ডেমোক্র্যাটরা গর্ভধারণের ‘নবম মাসে’ গর্ভপাতের অনুমতি দিতে চায় বলে দাবি করেন ট্রাম্প। অন্যদিকে ট্রাম্প দুই বছর আগে সুপ্রিম কোর্টের তিনজন বিচারপতিকে নিয়োগ করে গর্ভপাতের জাতীয় অধিকার বাতিল করেন বলে অভিযোগ হ্যারিসের। বিবিসি বলেছে, রিপাবলিকান পার্টি আমেরিকান রক্ষণশীলতার পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে থাকে। সে জন্য দলটি ‘গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি’ (জিওপি) নামেও বেশ পরিচিত। তারা সীমিত সরকারি নিয়ন্ত্রণ, কম কর হার, সরকারের আকার ছোট রাখা, মুক্তবাজার পুঁজিবাদ, বন্দুক বা আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অধিকার এবং অভিবাসন ও গর্ভপাতের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার পক্ষের দল। আর কমলা হ্যারিস এ বিষয়ে বলেন, নারীদের প্রজনন অধিকার সম্পর্কে সরকারের কথা বলা উচিত না। এটা তাদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। আমার সবচেয়ে আপত্তি হচ্ছে, যারা এই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে, তারা তাদের ক্ষমতা এবং অবস্থান জাহির করতে চাইছে। তারা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করছে।

ট্রাম্প নিজেই কারণ

নাগরনি বলেছেন, হ্যারিস জিতে যেতে পারেন ট্রাম্পের কারণে। কারণ ট্রাম্প এমন সব ভয়ংকর বিবৃতি দিয়েছেন, যা ভোটারদের ভীত করে তুলেছে। তার ভাষায়, যদি হ্যারিস জয়ী হন, তবে সম্ভবত এটিও একটি কারণ হবে যে, ট্রাম্প ভোটারদের ভাট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষত প্রচারণার শেষ দিনগুলোতে প্রায়ই ট্রাম্প ভয়ংকর বক্তৃতা দিয়েছেন, যা তার থেকে ভোটারদের বিচ্ছিন্ন করেছ এবং বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে হ্যারিস নেভাল অবজারভেটরিতে ভাইস প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন থেকে একটি বক্তৃতা দেন, যেখানে তিনি ট্রাম্পকে ‘অস্থির’ বলে অভিহিত করেন। ট্রাম্প তার শেষ বক্তৃতায় বলেন, আজ রাতে আপনাদের ও সব আমেরিকানের প্রতি আমার খুব সহজ বার্তা, আমাদের এমনভাবে বেঁচে থাকতে হবে না। তিনি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির কমলা হ্যারিসকে আক্রমণ করতেও ছাড়েননি ট্রাম্প। তিনি হ্যারিসকে একজন উগ্র বামপন্থি পাগল বলে মন্তব্য করেন। হ্যারিস গত চার বছর হোয়াইট হাউজে কাটিয়েছেন এবং ট্রাম্প তাকে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের উত্তরাধিকার হিসেবে দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু ‘ট্রাম্প নিজেই হ্যারিসের চেয়ে ১৮ বছরের বড়। যে কারণে তাকেই ভোটাররা বেছে নিতে পারে। বয়সের কারণেই কমলা হ্যারিস একটি নতুন পরিবর্তন। এবার যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ভোটাররা পরিবর্তন চাইছে। ট্রাম্প আগেই একবার প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। ফলে কমলা হ্যারিস নিজেই একটা পরিবর্তন।

লিঙ্গ ব্যবধান

২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটন জিততে পারেননি। তবে হ্যারিস তার প্রচারে নিজের নারী পরিচয়কে প্রাধান্য দেননি। তিনি বলেননি যে, তিনি হবেন প্রথম নারী, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী এবং প্রথম এশীয়-আমেরিকান নারী। এসব প্রচারের কোনো প্রয়োজন ছিল না। যা হ্যারিসকে বিজয়ী করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। কারণ ইতিমধ্যেই তিনি নারীদের ভোটে এগিয়ে আছেন। অক্টোবরের শেষের দিকে নেওয়া নিউ ইয়র্ক টাইমস-সিয়েনা কলেজ জরিপে দেখা গেছে, হ্যারিস ৫৪ শতাংশ নারীর ভোট পাবেন, অন্যদিকে ট্রাম্প পাবেন ৪২ শতাংশ। আর ট্রাম্প পুরুষদের ভোট পাবেন ৫৫ শতাংশ এবং হ্যারিস ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ নারীদের ভোটে হ্যারিসের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিভিন্ন ইস্যু

বিবিসি জানিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচনী প্রচারে দেশটির অভ্যন্তরীণ ইস্যুর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, অথনৈতিক মন্দা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বৈশি^ক গুরুত্বপূর্ণ সংকট বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিস ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে প্রথম যে বিতর্কটি অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, গর্ভপাত আইন, প্রজেক্ট-২০২৫, পররাষ্ট্র নীতি ছাড়াও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধ, আফগানিস্তানে তালেবান ইস্যুসহ নানান বিষয়ে কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনে জিততে ‘অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতি’ গড়ে তোলার বিষয়ে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেন হ্যারিস। এ ছাড়া ক্ষমতায় গেলে যুক্তরাষ্ট্রে আবাসনের খরচ কমানোর ব্যাপারেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। নির্বাচনের প্রচারণার ইস্যু হিসেবে ‘প্রজেক্ট-২০২৫’ ও বেশ আলোচিত হতে দেখা যাচ্ছে। ‘প্রজেক্ট-২০২৫’ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে ডানপন্থিদের তৈরি একটি পরিকল্পনা, যেখানে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়ানোসহ বিভিন্ন উগ্র-ডানপন্থি নীতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। ওই প্রজেক্টকে ‘বিপজ্জনক পরিকল্পনা’ হিসেবে অভিহিত করে হ্যারিস দাবি করেন, মি. ট্রাম্প ওই প্রজেক্টে জড়িত রয়েছেন।

ব্যক্তিগত জীবন

বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হওয়ার আকাক্সক্ষা নিয়ে চলতি বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লড়াইয়ে শামিল হন কমলা হ্যারিস। তার প্রচার উদারপস্থি ভোটারদের পুনরুজ্জীবিত করেছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হ্যারিসের প্রচার তহবিলে জমা পড়েছে ৬৭.১ কোটি ডলার অনুদান, যা তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংগ্রহের প্রায় তিনগুণ। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর এই দৌড়ে হ্যারিসের রয়েছে ঘটনাবহুল ও বর্ণিল একটি সফর। কমলা হ্যারিস ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে অভিবাসী যুগলের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং বাবা জ্যামাইকান আমেরিকান। কমলার যখন পাঁচ বছর বয়স, তখন তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। তারপর মূলত মা শ্যামলা গোপালন হ্যারিসের কাছেই বড় হন তিনি। হ্যারিস জানিয়েছেন, তাকে এবং তার ছোট বোন মায়াকে ওকল্যান্ডের কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় করে তুলেছিলেন তার মা। যিনি একজন ক্যানসার গবেষক এবং নাগরিক অধিকারকর্মী ছিলেন। তার আত্মজীবনী ‘দ্য ট্রুথস উই হোল্ড’-এ কমলা লিখেছেন, আমার মা খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি দুজন কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েকে লালন-পালন করছেন। তিনি জানতেন যে তার নতুন দেশ মায়া এবং আমাকে কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ে হিসেবে দেখবে এবং আমরা যাতে আত্মবিশ্বাসী, গর্বিত কৃষ্ণাঙ্গ নারী হয়ে উঠি তা নিশ্চিত করতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। শ্যামলা গোপালন হ্যারিস ভারতীয় ছিলেন। তার আদি বাড়ি ভারতের তামিলনাড়–তে। ১৯৫৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন। কমলা হ্যারিসের স্বামী আইনজীবী ডাগ এমহফ। তাদের দেখা হয় ব্লাইন্ড ডেটে আলাপে। ২০১৪ সালে এই যুগল বিয়ে করেন। ডাগ এমহফের সন্তান কোল এবং এলা মিজ হ্যারিসকে মোমালা বলে ডাকে। তার পারিবারিক জীবন সম্পর্কে কমলা হ্যারিস এলি ম্যাগাজিনকে বলেছিলেন, রবিবারের নৈশভোজ আমাদের কাছে পারিবারিক সময়। কোল টেবিল সেট করে এবং সংগীত বাছাই করে। এলা ডেজার্ট (মিষ্টান্ন) তৈরি করে, ডাগ আমার স্যুস-শেফ হিসেবে কাজ করে এবং আমি রান্না করি। ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্যে শীর্ষ আইনজীবীর দায়িত্ব পালন করেন হ্যারিস। তিনি প্রথম নারী এবং প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ব, যিনি এ পদে ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত