বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) আদেশ অমান্য করে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) ওপর সিস্টেম লস চাপিয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যানকে ব্যাখ্যা দিতে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে চিঠি দিয়েছে বিইআরসি।
কমিশনের সচিব ব্যারিস্টার মো. খলিলুর রহমান খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ২০২২ সালের ৪ জুন কমিশন জিটিসিএলের গ্যাস সঞ্চালন চার্জশূন্য ঘোষণা করে। পরে বিইআরসি আইনের সংশোধিত ধারায় সরকার গত বছর জুলাই থেকে জিটিসিএলের সঞ্চালন চার্জ পুনর্নির্ধারণ করে। ওই সময় সিস্টেম লস পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি সরকার। কিন্তু পেট্রোবাংলা গত বছর জানুয়ারিতে একটি সভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জিটিসিএলের ওপর সিস্টেম লস আরোপ করেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী ইউনিয়ন ও জিটিসিএল অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো ওই চিঠিটি গত ৪ নভেম্বর গ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠানটির ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ।
গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত এবং আমদানি করা গ্যাস সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে ছয়টি বিতরণ কোম্পানির কাছে সরবরাহ করে জিটিসিএল। এরপর বিতরণ লাইনের মাধ্যমে তা গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় বিতরণ কোম্পানিগুলো।
গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় দেশে গড়ে প্রতি বছর অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকার গ্যাস অপচয় হচ্ছে। এটিকে সিস্টেম লস বা কারিগরি ক্ষতি বলা হলেও বাস্তবে এর বেশিরভাগই বিতরণ কোম্পানিগুলোর অবৈধ সংযোগের কারণে চুরি হওয়া গ্যাস বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অবৈধ সংযোগের পেছনে গ্যাস বিতরণ কোম্পানির ঠিকাদার, কর্মকর্তা, কর্মচারীরা জড়িত থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
জিটিসিএল থেকে গ্যাস নেওয়ার পর বিতরণ লাইনে ঘাটতি পাওয়া গেলে তার দায় সব বিতরণ কোম্পানির মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার নিয়ম চলে আসছিল প্রায় ২৯ বছর ধরে। এ নিয়ে বিতরণ কোম্পানিগুলোর আপত্তি ছিল। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহের প্রতিটি পয়েন্টে মিটার বসানোর প্রস্তাব ওঠে। সে অনুযায়ী ২০২২ সালের আগস্ট পরীক্ষামূলকভাবে মিটারিং কার্যক্রম শুরু হয়। গত বছর জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মিটার রিডিং পর্যবেক্ষণ করে জিটিসিএলের সঞ্চালন লাইনে প্রায় ৩ শতাংশ সিস্টেম লস হয় বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
জিটিসিএলের কর্মকর্তারা জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিটিসিএলের ১ হাজার ২১২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে পেট্রোবাংলার চাপিয়ে দেওয়া সিস্টেম লসের কারণে।
জিটিসিএল কথিত এই লস নিতে অপারগতা প্রকাশ করে তা প্রত্যাহার করতে দফায় দফায় চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলাকে। কিন্তু তাতে পেট্রোবাংলা রাজি না হওয়ায় জিটিসিএলের আর্থিক ক্ষতি বেড়ে গেছে।
অভিযোগ উঠেছে, তিন দশকের নিয়ম ভেঙে ওই সিদ্ধান্ত দেওয়ায় পেট্রোবাংলা, জিটিসিএল ও গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ঠা-া লড়াই। গ্যাস বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থায় এ ধরনের দ্বন্দ্বের পরিণতি বড় ধরনের ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা অনেকের।
তবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানির মধ্যে মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্যাস পরিমাপ করে সরবরাহ করতে বিইআরসির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে এখানে। পেট্রোবাংলা কিংবা কারও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়নি।
আইন অনুযায়ী, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম, সঞ্চালন চার্জ নির্ধাণের একক এখতিয়ার বিইআরসির। গণশুনানির মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণের সময় বিতরণ ও সঞ্চালনে সিস্টেম লস বিবেচনায় নিয়ে দরপ্রস্তাব করে কমিশনের কারিগরি কমিটি। তবে নির্বাহী আদেশে সরকার ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছর ২৬ আগস্ট পর্যন্ত গ্যাস-বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট ধারার সংশোধনী বাতিল করে বিইআরসিকে একক এখতিয়ার দেওয়া হয়।
জিটিসিএলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের মুখে গত ১৯ আগস্ট পেট্রোবাংলা চাপিয়ে দেওয়া সিস্টেম লস প্রত্যাহার করে। তবে ২২ অক্টোবর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেন, সিস্টেম লস প্রত্যাহার করা হয়নি।
গত ৯ অক্টোবর জিটিসিএলের বোর্ডসভায় পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে আবারও জিটিসিএলকে সিস্টেম লসের দায় বিবেচনায় নিয়ে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করতে বলা হয়। এ নিয়ে পেট্রোবাংলা ও জিটিসিএলের মধ্যে যুক্তিতর্ক দেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
একপর্যায়ে জিটিসিএলের চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ্য করে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, মিটারিং পদ্ধতির মাধ্যমে জিটিসিএলের ওপর যে সিস্টেম লস দেওয়া হয়েছে, তা যদি এখন বিতরণ কোম্পানিগুলোর ওপর দেওয়া হয় তাহলে তাদের বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের হিসাব তৈরিতে জটিলতা তৈরি হবে। তখন ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি আন্দোলন শুরু করলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
জিটিসিএল সূত্রমতে, বর্তমানে ৬৬টি মিটারের মাধ্যমে গ্যাস সঞ্চালন করা হয়। যার মধ্যে জিটিসিএলের নিজস্ব মিটার রয়েছে ২১টি।
জিটিসিএলের অভিযোগ, তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ৪৫টি মিটার বিতরণ কোম্পানিগুলোর। এসব মিটারের রিডিং নেওয়া ও রক্ষণাবেক্ষণও তারাই করে থাকে। ফলে তারা সঠিকভাবে রিডিং নিচ্ছে কি না বা মিটারে কারসাজি করছে কি না, তা ধরার উপায় নেই জিটিসিএলের।
