ক্লান্ত বাঘ ক্লান্ত ক্রিকেট

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৪, ০৫:৪৪ এএম

বাঙালির অলসতা, অকর্মণ্যতায় তিক্তবিরক্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুঈন।’ মরুভূমির বুকে ঘোড়ার খুরে ধুলো উড়িয়ে বেদুঈনদের দুঃসাহসী অভিযাত্রা কবির মনে দাগ কেটেছিল। স্বজাতির প্রতি উষ্মা থেকেই তিনি লিখেছিলেন, ‘মাথায় ছোট বহরে বড় বাঙালি সন্তান।’ কবিগুরুর সেই লেখার ১৩৪ বছর পরও মরুর বুকে আল্লাহ গজনফর নামের ১৮ বছর বয়সী এক ‘আফগান বেদুঈনের’ গুগলিতে বিভ্রান্ত হয়ে ‘ছোট মাথার’ পরিচয় দিলেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। যাদের কথা বলা হচ্ছে, সেই মুশফিকুর রহিম আর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার দেড় যুগের। মিডল এবং লোয়ার মিডল অর্ডারে তাদের ভূমিকা দলের হাল ধরার এবং ফিনিশিং দেওয়ার। তবে ফিনিশিং টানার পরিবর্তে তারা যথাক্রমে এক এবং দুই রান করে দলকেই ‘ফিনিশ’ করে দিয়েছেন।

পরবর্তী প্রজন্মের কথাও বলা দরকার। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত থেকে শুরু করে সৌম্য সরকার সবাই থিতু হওয়ার পর নিজের দায়িত্ব শেষ বলেই ধরে নিয়েছেন। ফলাফল প্রথম ওয়ানডেতে ১১ রানের মধ্যে শেষ সাত উইকেট হারিয়ে বিব্রতকর হার। নাহ, এক পরাজয়ে দেশের ক্রিকেট শেষ হয়ে যায়নি। সেই হার আফগানিস্তানের মতো অনেকটাই নবীন দলের বিপক্ষে হলেও সত্যি। সংকটের জায়গটা তুলে ধরেছেন আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের আমন্ত্রণে প্রথম ওয়ানডে দেখতে শারজায় যাওয়া সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল, ‘জয়-পরাজয় তো থাকতেই পারে, কিন্তু অধিনায়কত্ব আর ব্যাটিং পরিকল্পনা দেখে সত্যিই বিস্মিত হয়েছি। সবকিছুই যেন ক্লান্ত দেখাচ্ছিল শরীরী ভাষা, বলের প্রতি মনোযোগ, প্রি-বল রুটিন, পুরোটা মিলিয়ে পরিকল্পনা খুবই দুর্বল মনে হয়েছে।’

ক্রিকেটারদের বলা হয়ে থাকে সমালোচকদের ‘সহজ শিকার’। দেশের মাটিতেই তাদের যা কিছু হজম করতে হয়, সেগুলোকে ‘সমালোচনা’ বললে কম বলা হবে। খুব সহজেই তাদের ‘ভুয়া’ বলে দেওয়া যায়। পারফর্ম করতে না পারায় ওমুককে বাদ দিয়ে দেওয়া যায়। অভিমানে ক্রিকেটারদের সরে দাঁড়ানোর নজিরও আছে। ঘরোয়া ক্রিকেটে বলের ছাল তুলে ফেলা কোনো নবীন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এসে যেন অথৈ সমুদ্রে পড়ে যান। কয়েক ম্যাচ দেখে বাদ দেওয়া হয় তাকেও। ফিরিয়ে আনা হয় এর আগে বাদ পড়া কাউকে। বছরের পর বছর এই চক্রেই ঘুরছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। পাইপলাইনে যোগ্য ক্রিকেটারের এতটাই অভাব যে, জাতীয় দলে এনে ক্রিকেটের বেসিক শেখাতে হয়! অনেক বছর উত্থান-পতনের পর গড়ে ওঠেন লিটন দাস, সৌম্য সরকার, নাজমুল হোসেন শান্তরা। নামমাত্র ঘরোয়া লিগ এই ব্যস্ত ক্রিকেটের যুগে অচল। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ভাষায়, ‘দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটটা হয় পিকনিকের মতো।’

পিকনিকের মাধ্যমে আর যাই হোক, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঠিক প্রস্তুতি হয় না। তাই মিরপুর-কানপুর কিংবা শারজায় অসহায়ের মতো আত্মসমর্পণ করেন বঙ্গশার্দুলরা। মাঝেমধ্যে পাকিস্তান সিরিজের মতো দমকা হাওয়া এসে শীতল পরশ দিয়ে যায়। ব্যাস, দেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য ওটুকুই প্রশান্তি। এভাবেই চাপা পড়ে যায় বোর্ডের শত ব্যর্থতা। ধরা পড়ে না দেশের ক্রিকেট কাঠামোর গোড়ার গলদ। এ কারণেই কে কার চেয়ে কম খারাপ খেলেছে অনেক সময় সেই বিবেচনায় জাতীয় দল বাছাই করতে হয়! একটি ম্যাচের পারফরমেন্সকেই যথেষ্ট ধরা হয় বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পেতে! বছরের পর বছর এভাবে চলতে থাকায় বিরক্ত হয়ে যান খেলাটির সবচেয়ে বড় অংশীদার দর্শকরা। যদিও বিসিবি দর্শকদের কতটা মূল্যায়ন করে সেটাও বড় প্রশ্ন বটে। বিজ্ঞদের শঙ্কা, এই দর্শকরা মুখ ফিরিয়ে নিলে এক সময় মাঠ মাতানো ফুটবলের মতো হারিয়ে যেতে পারে ক্রিকেটও!

বিগত বোর্ডের অধীনে দেশের ক্রিকেটে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হয়েছে। পাইপলাইন বলেই কিছু ছিল না। নতুন সভাপতি এসে প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগের ক্রিকেট লিগ চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন যা প্রশংসনীয়। তবে এর ফল হাতেনাতে মিলবে না। ক্রিকেটকে আরও জনসম্পৃক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন আইসিসির ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম বুলবুল। স্কুল-কলেজে ক্রিকেট ছড়িয়ে দিতে বলেছেন। ক্রিকেটকে ঢাকার বাইরে নিতে বলেছেন। কঠিন কোনো কাজ নয়। ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বিসিবির জন্য আর্থিক চাপেরও নয়। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার দায়িত্ব কাউকে তো নিতে হবে। এখন পর্যন্ত তেমন দৃশ্যমান কিছুই নেই। তাই ২৪ বছরের অভিজাত পথচলায় এক একটি সিরিজ যেন আসে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন হয়ে। দীর্ঘ সেই পথের বাঁকে পড়ে হঠাৎ পাওয়া ১৪ আনার মতো আসে সাফল্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত