আত্মিক উৎকর্ষ সাধনে দান-সদকা

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৪, ০৬:২৬ এএম

দানশীলতা মুসলিম উম্মাহর ভেতর সাম্য এবং একতার ভিত রচনা করে। দান-সদকার মাধ্যমে ইমানে পরিপূর্ণতা আসে। সম্পদ পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয়। দানশীলতা মানুষকে কৃপণতা থেকে বের করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চরিত্রের অধিকারী বানিয়ে দেয়। দান-সদকা আত্মিক উৎকর্ষ সাধনে নিয়ামক শক্তি। এর মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি লাভ হয়। সর্বোপরি দানশীলতা মানুষকে পাপমুক্ত করে জান্নাতের পথে পরিচালিত করে।

দান-সদকা গোপনে ও প্রকাশ্যে দুভাবেই করা যায়। তবে গোপনে করা উত্তম। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান-সদকা করো, তবে তা কতই না উত্তম। আর যদি দান-সদকা গোপনে করো এবং অভাবগ্রস্তদের দিয়ে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম। তিনি তোমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আর তোমরা যে আমল করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।’ (সুরা বাকারা ২৭১)

পবিত্র কোরআনে দান-সদকার উপকারিতা ও ফজিলত নিয়ে আল্লাহতায়ালা চমৎকার একটি উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের ধন-সম্পদ খরচ করে, তাদের উদাহরণ একটি শস্যদানার মতো; যা থেকে সাতটি শিষ উৎপন্ন হয়। যার প্রতিটি শিষে ১০০টি করে শস্যদানা থাকে। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে করেন তাকে অতিরিক্ত দান করেন। আল্লাহ মহাদানশীল ও মহাজ্ঞানী।’ (সুরা বাকারা ২৬১) পবিত্র কোরআনে আল্লাহ আরও বলেন, ‘আর যেসব উত্তম বস্তুসামগ্রী তোমরা ব্যয় করবে, তার লাভ ও সওয়াব তোমাদের কাছেই পৌঁছাবে। বস্তুত তোমাদের ব্যয় আল্লাহর ওয়াস্তেই হওয়া উচিত। আর যেসব উত্তম বস্তুসামগ্রী তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে ব্যয় করবে, তোমরা তার পরিপূর্ণ বিনিময়প্রাপ্ত হবে; তোমাদের কোনো হকই বিনষ্ট করা হবে না।’ (সুরা বাকারা ২৭২)

শুধু তাই নয়, দান-সদকাকে আল্লাহ ঋণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং প্রবৃদ্ধির ওয়াদা করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তাহলে তিনি তোমাদের জন্য তা বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ অতিশয় গুণগ্রাহী ও ধৈর্যশীল।’ (সুরা তাগাবুন ১৭) মহান আল্লাহ অন্যত্র ইরশাদ করেছেন, ‘এমন কে আছে যে আল্লাহকে ঋণ দেবে, উত্তম ঋণ (আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করবে)? অতঃপর আল্লাহ তাকে তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন। আল্লাহই জীবিকা সংকুচিত ও সম্প্রসারিত করেন। আর তোমরা তারই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।’ (সুরা বাকারা ২৪৫)

উকবা ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় দান-সদকা দানকারীকে কবরের উত্তাপ থেকে রক্ষা করবে। আর মুমিন ব্যক্তি কেয়ামত দিবসে আল্লাহর আরশের ছায়ায় অবস্থান করবে।’ (তাবারানি) মহানবী (সা.) বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে দান-সদকার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘খেজুরের একটি অংশ দান করে হলেও তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করো।’ (সহিহ বোখারি) দান-সদকার উপকার শুধু যে আখিরাতে পাওয়া যাবে তা কিন্তু নয়। দুনিয়াতেও এর প্রতিদান মিলবে। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দান-সদকা তো আল্লাহর ক্রোধের আগুন নিভিয়ে দেয় এবং অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে।’ (তিরমিজি)

যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করেন, তিনি সুদিনে বা বিপর্যয়ে সব সময় আল্লাহর দৃষ্টি ও আশ্রয়ের আওতায় থাকে। ফেরেশতারা তার জন্য দোয়া করেন; তার সম্পদ বৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করেন। আর যে ব্যক্তি কৃপণ ও সম্পদ ব্যয়ে দ্বিধা করে, তারা তাদের চূড়ান্ত লোকসান ও ধ্বংসকেই ডেকে নিয়ে আসে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা আকাশ থেকে দুনিয়ায় অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, ‘হে আল্লাহ! যিনি ভালো কাজে দান করেছেন, তাকে আপনি এর উত্তম প্রতিদান দিন। আর অন্যজন বলেন, হে আল্লাহ! আপনি কৃপণদের ধ্বংস করে দিন।’ (সহিহ বোখারি)

আমের ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তুমি যা কিছু দান করবে, অবশ্যই তার যথাযথ প্রতিদান তোমাকে দেওয়া হবে। এমনকি তুমি যে এক লোকমা খাবার তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দাও, তারও বিনিময় তুমি পাবে।’ (মুসনাদে আহমদ)

পরোপকার মানুষকে মর্যাদার আসনে সমাসীন করে। পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব মনীষী স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন, তাদের প্রত্যেকেই ছিলেন পরহিতৈষী। আমাদের মহানবী রাসুল (সা.) ছিলেন পরোপকারের মূর্ত প্রতীক। তিনি নিজে সব সময় মানুষের উপকার করতেন। অন্যকেও উপদেশ দিতেন মানুষের উপকার করতে। মানুষের উপকার করে তিনি আনন্দিত হতেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.)-এর কাছে কোনো কিছু চাওয়া হলে তিনি কখনো “না” বলতেন না।’ (সহিহ মুসলিম)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল। রমজান মাসে তিনি আরও অধিক দানশীল হতেন, যখন জিবরাইল (আ.) তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। আর রমজানরে প্রতি রাতেই জিবরাইল (আ.) তার সঙ্গে দেখা করতেন এবং তারা একে অন্যকে কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুল (সা.) রহমতের বায়ু অপেক্ষাও অধিক দানশীল ছিলেন।’ (সহিহ বোখারি)

সমাজের গরিব, দুস্থ, অভাবী ও অসহায় মানুষকে উপকার করার প্রতি ইসলাম অধিক গুরুত্ব আরোপ করে। সুযোগ হলে সাধ্যমতো তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা করা, খাবার খাওয়ানো ও খোঁজখবর নেওয়া উচিত। পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় মহান আল্লাহ গরিব, অসহায়, দিনমজুর ও মিসকিনদের খাবার দান করার কথা বলেছেন। সমাজের সবাইকে নিয়েই মানুষের জীবন। সবার সঙ্গে মিলেমিশে জীবন ধারণ এবং সুখ-দুঃখে একে অন্যের পাশে এসে দাঁড়ানোর মধ্যেই জীবনের যথার্থ সার্থকতা নিহিত। তাই আসুন আমরা সবাই নিজেদের পরোপকারে নিয়োজিত করি। মানবতার সেবায় নিয়োজিত হয়ে ইহকাল ও পরকালের সমূহ কল্যাণ লাভ করি। আল্লাহপাক আমাদের এ বিষয়ে আমল করার তাওফিক দান করুন।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত