ডেনিম পোশাকের রূপান্তর

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:১১ এএম

ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় আন্তর্জাতিক ডেনিম এক্সপো হয়ে গেল ৪ ও ৫ নভেম্বর। বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ এই প্রদর্শনীর আয়োজন করে। প্রদর্শনীতে বাংলাদেশে উৎপাদিত ডেনিম পণ্য প্রদর্শিত হয়েছে। দুদিনের প্রদর্শনী ঘুরে এসে লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

ডেনিম প্রদর্শনী

প্রতি বছরের মতো এ বছরও ডেনিম এক্সপো অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। এবারের আয়োজিত এই প্রদর্শনীর প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘দ্য ব্লু নিউ ওয়ার্ল্ড’। এই থিমের মাধ্যমে আমরা ফ্যাশনশিল্পে একটি নতুন সূচনা উদযাপন করছি। আমাদের পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি এবং দায়িত্বশীল সোর্সিংয়ের দিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে, এমনটাই ভাবছেন আয়োজকরা। প্রদর্শনীতে স্বাগতিক বাংলাদেশসহ ভারত, পাকিস্তান, চীন, তুরস্ক, স্পেন ও ইতালির ৪৫টির বেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে ডেনিম কাপড় উৎপাদনকারী, ডেনিম ও নন-ডেনিম পোশাক প্রস্তুতকারক, ওয়াশিং লন্ড্রি, সরঞ্জাম, রাসায়নিক ও যন্ত্রপাতি উৎপাদক ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। ডেনিম এক্সপোটিতে ট্রেন্ড জোন রয়েছে। সেখানে দর্শনার্থীরা ডেনিমের নতুন উদ্ভাবন ও ট্রেন্ড সম্পর্কে জানতে পারছেন। প্রদর্শনীতে বাংলাদেশে উৎপাদিত কাপড়, নকশা ও প্রযুক্তিতে তৈরি ডেনিম পণ্য প্রদর্শিত হচ্ছে। মেলা প্রাঙ্গণে রয়েছে প্যাসিফিক জিনসের ডেনিম লাউঞ্জ, যেখানে প্রদর্শন করা হচ্ছে অত্যাধুনিক ও অনন্য নকশার সেরা ডেনিম পণ্য।

দুদিনের এই প্রদর্শনীর প্রথম দিনে ‘পোশাকশিল্পে নেতৃত্ব দিতে বাংলাদেশকে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে কম মূল্যের পোশাক উৎপাদন কেন্দ্র থেকে উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও ডিজিটাল কৌশলের মাধ্যমে এ শিল্পের উদ্ভাবনকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। ডেনিম এক্সপোর দ্বিতীয় দিনে ‘পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ : জিএসপি প্লাস ও এলডিসি উত্তরণ’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান, শিনশিন গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সোহেল সাদাত. ইভিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহ রাঈদ চৌধুরী এবং এইচঅ্যান্ডএমের বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইথিওপিয়ার প্রধান জিয়াউর রহমান। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ।

বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপোর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘দেশের পোশাক খাতের রূপান্তরের সময় এসেছে। কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে বিশে^র সামনে উচ্চমানের টেকসই পোশাক তৈরির নেতৃস্থানীয় দেশে রূপান্তরিত করতে পারি।’

২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ ইউরোপের দেশগুলোতে ডেনিম রপ্তানিতে শীর্ষে। এ অঞ্চলে প্রতি তিনজনের একজন বাংলাদেশে উৎপাদিত ডেনিমের প্যান্ট ব্যবহার করেন। দিন দিন চাহিদা বাড়ায় বিশ্ববাজারে সাড়ে ৬৪ বিলিয়ন ডলারের ডেনিমের আধিপত্য। যেখানে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা বাড়াতে ইতিমধ্যে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। বর্তমানে দেশীয় রপ্তানিকারকরা পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বেশি ডেনিম পণ্য সরবরাহ করছেন। ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ^ব্যাপী ডেনিমের বাজার ৭৬ দশমিক এক বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে বলে ধারণা করছে বিশেষজ্ঞরা। এটি বছরে চার দশমিক আট শতাংশ হারে বাড়বে। আর তাই বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে প্রতি বছর ডেনিম মেলার আয়োজন হচ্ছে।

পোশাকের বৈচিত্র্য

দেশে প্রথম ডেনিম কাপড়ের উৎপাদন শুরু করে আরগন ডেনিম। আর কাজটি শুরু করেছিল দেড় দশক আগে। বাণিজ্যিকভাবে তাদের কারখানার এখন মাসে ১৮ লাখ গজ ডেনিম কাপড় উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ কাপড়ের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশই টেকসই উপকরণে তৈরি হচ্ছে। আর ২০ শতাংশ হচ্ছে পুরনো বা ব্যবহৃত ডেনিম প্যান্টের উপকরণ দিয়ে।

আরগন ডেনিমের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকার ব্র্যান্ডগুলো টেকসই উপকরণে তৈরি জিনসের পোশাক কেনায় বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও মোট রপ্তানির মাত্র ৫ শতাংশ কাপড় ছিল টেকসই উপকরণের। এখন অনেকটাই কমে গেছে। বিশ্ব জুড়ে ক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে। ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোও টেকসই পণ্য কেনায় জোর দিচ্ছে। সে অনুযায়ী দেশীয় উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগ করছেন।

দেশের আরেকটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হলো টিম। টিম গ্রুপ জিনসের প্যান্ট তৈরি করে। জিনসের ওয়াশিংয়ে পানির ব্যবহার কমানোর ওপর জোর দিয়েছে তারা। এ জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করছে প্রতিষ্ঠানটি। টিম ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির ডিজাইনার জয় প্রকাশ দত্ত জানান, একটা জিনস প্যান্ট ওয়াশে ৯০ লিটারের মতো পানি লাগে। তবে লেজারের মাধ্যমে ডিজাইন ও মাইক্রো বাবল টিট্রমেন্টের মাধ্যমে পানি, বিদ্যুৎ ও সময় বাঁচানো যায়।এবং আমরা সেটাই করছি। এ ছাড়া ওজোন ওয়াশের মাধ্যমে পানি ছাড়া গ্যাস ও রাসায়নিক দিয়েই কাজ করা হয়। এসব প্রক্রিয়ায় খরচ একটু বেশি হলেও এভাবে উৎপাদিত পণ্যে ক্রেতারা আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

মেলায় আগত শিনশিন অ্যাপারেলস জিনসের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পোশাক প্রদর্শন করছে। প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় প্রতি মাসে ২০ লাখ পিস জিনসের পণ্য তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। তাদের রপ্তানি করা জিনসের গড় মূল্য সাড়ে ৪ ডলার। শিনশিন অ্যাপারেলসের উপদেষ্টা সাজ্জাদুর রহমান জানান, ডেনিম পোশাকের বৈচিত্র্য দিন দিন বাড়ছে। আর আমাদের প্রতিষ্ঠান রপ্তানিতে বৈচিত্র্য বাড়াতে ব্লেজার উৎপাদন করেছে।

পাকিস্তানি ফেব্রিক কোম্পানি নাবিনার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস) মুহাম্মদ মানসুর বিলাল বলেছেন, আমরা মনে করি রাজনৈতিক অবস্থা যাই হোক কিন্তু আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। পোশাকশিল্পের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। এটি ঠিক হলে বাজার আরও এগিয়ে যাবে এবং আমরা তা নিয়ে আশাবাদী।

নয়েজ জিনসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মনীষ এস চৌহান জানান, বাংলাদেশের গাজীপুর ও আশুলিয়ায় তাদের দুটি কারখানা রয়েছে। সেখানে প্রায় ৭০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। তারা বছরে প্রায় ৮ কোটি ডলার মূল্যের ডেনিম পণ্য উৎপাদন করেন। বাংলাদেশের পণ্যের গুণগতমান খুব ভালো। দামও বেশ প্রতিযোগিতামূলক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত