চট্টগ্রামে পোল্যান্ডের নাগরিকের লাশ উদ্ধার, খুন নয় অতিরিক্ত মদপানেই মৃত্যু

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২৪, ০৬:৫৩ পিএম

কেউ খুন করেনি। অতিরিক্ত মদপানেই মৃত্যু হয়েছিল ৫৮ বছর বয়সী সেই পোল্যান্ড নাগরিক জেডিজিস্ল মাইকেল জেরিবারের। চলতি বছরের ৪ মার্চ বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের ‘দি পেনিনসুলা চিটাগাং’ হোটেলের ৯১৫ নম্বর কক্ষ থেকে বিদেশি এই নাগরিকের মরদেহ উদ্ধার করেছিল নগরের চকবাজার থানা পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের পর প্রায় আট মাসের মাথায় গত ৩১ অক্টোবর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে এ কথা জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চকবাজার থানার উপরিদর্শক শফি উল্লাহ। 

পোল্যান্ডের এই নাগরিক দেশটির ফ্যাশন রিটেইলার প্রতিষ্ঠান ‘বিগ স্টার’ এর কোয়ালিটি কন্ট্রোলার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি প্রায় সময় ব্যবসায়িক কাজে চট্টগ্রামে আসা-যাওয়া করতেন। চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সিইপিজেড এলাকায় অবস্থিত ক্যান পার্ক বাংলাদেশ লিমিটেড নামের একটি কারখানা পরিদর্শনে এসেছিলেন তিনি। 

চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুয়ায়ী, জেডিজিস্ল মাইকেল জেরিবা গত ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সিইপিজেড এলাকায় অবস্থিত ‘ক্যান পার্ক বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামের একটি কারখানা পরিদর্শনে আসেন। সেদিন চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে রিসিভ করেন প্রতিষ্ঠানটির মার্চেন্ডাইজিং ম্যানেজার আশরাফুল হক ডালিম। পরে জেরিবার জন্য নগরের জিইসি মোড় এলাকায় ‘দি পেনিনসুলা চিটাগাং’ হোটেলের নবম তলার ৯১৫ নম্বর কক্ষ বুকিং দেন আশরাফুল হক ডালিম।

পরে ৪ মার্চ সকাল ৯টায় দফায় দফায় জেরিবার মোবাইলে কল করলে রিসিভ না করায় বিষয়টি হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানান আশরাফুল। এ সময় হোটেল কর্তৃপক্ষের একজন ৯১৫ নম্বর কক্ষের সামনে গিয়ে দরজায় ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব’ লেখা কার্ড দেখতে পান। সকাল পৌনে ১১টা থেকে দরজায় নক করে সাড়া শব্দ না পেয়ে বেলা ১১টার দিকে পুলিশকে খবর দেয় হোটেল কর্তৃপক্ষ। সকাল সাড়ে ১১টায় পুলিশ ৯১৫ নম্বর কক্ষে ঢুকে দরজার পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় জেরিবার মৃতদেহ দেখতে পায়। পরে ওই কক্ষ থেকে বিভিন্ন আলামত জব্দ করে পুলিশ।

এ ঘটনায় গত ৫ মার্চ চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা (নম্বর-৪) দায়ের করেন। মামলার বাদী পার্থ প্রতীম ঘোষ (৪০)। তিনি খুলনা জেলার পাইকগাছা থানাধীন কপিলমুনি এলাকার তপন কুমার ঘোষের ছেলে। তিনি পোল্যান্ডের ফ্যাশন রিটেইলার প্রতিষ্ঠান বিগ স্টার লিমিটেডে কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। জেরিবারের মৃতদেহ শনাক্ত করেন তারই ব্যবসায়িক পার্টনার ফেনী জেলার ফুলগাজী থানার দক্ষিণ ধর্মপুর গ্রামের মো. আবদুল হকের ছেলে আশরাফুল হক ডালিম (৩৯)। 

সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য জেরিবার মরদেহ উদ্ধার করে পাঠনো হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মর্গে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ২ মার্চ বিকেল ৫ টা ১২ মিনিটে ৯১৫ নম্বর কক্ষের ভেতর থেকে দরজা খুলে হোটেলের সার্ভিস বয়কে জেরিবা খাবারের খালি ট্রে ফেরত দিতে দেখা যায়। অজ্ঞাত ব্যক্তিরা ২ মার্চ বিকাল ৫টা ১২ মিনিট থেকে ৪ মার্চ রাত পৌঁনে ১১টার মধ্যে জেরিবার কক্ষে ঢুকে তাকে হত্যা করে পালিয়ে যায়। 

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ডা. রবিউল হোসাইন এবং ডা. খালেদ হোসাইন বিদেশি এই নাগরিকের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। গত ১৯ মার্চ ভিসেরা পরীক্ষার প্রতিবেদনে অতিরিক্ত অ্যালকোহল পানে জেরিবার মৃত্যু হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন চমেকের ফরেনসিক বিভাগের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকেরা। এর আগে তার মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে ঢাকায় সিআইডি’র ফরেনসিক ল্যাবে সংগৃহিত আলামত ও ডিএনএ নমুনা পাঠানো হয়। গত ৫ সেপ্টেম্বর ডিএনএ এক্সামিনার মো. আশরাফুল আলম মতামত দিয়ে জানান পরীক্ষায় জেরিবার সঙ্গে সব আলামত মিলে গেছে। 

এ দিকে ঘটনার পূর্বাপর ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভির ফুটেজ ও স্থির চিত্র বিশ্লেষণ করে তদন্ত কর্মকর্তা শফি উল্লাহ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করে বলেন, অতিরিক্ত মদ পান করে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ৯১৫ নম্বর কক্ষের শৌচাগারে বার্থটাবে যান জেরিবা। শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলায় তিনি বার্থটাবের ওপরের অংশের সাথে মাথার পেছনে আঘাত পান। এরপর সেখান থেকে হেঁটে বিছানায় যাওয়ার সময় ৯১৫ নম্বর কক্ষের মেঝে, দেয়াল ও বিছানার চাদর ও বালিশে রক্তের দাগ লাগে। ফলে হত্যাকাণ্ড ধরে নিয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হলেও সুরতহাল প্রতিবেদন, ডিএনএ রিপোর্ট ও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে তদন্তকালে যাহা তথ্যগত ভুল মর্মে প্রতীয়মান হয়েছে।

সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন চকবাজার থানার উপপরিদর্শক মো. মনঞ্জুরুল আলম ভুঁইয়া। প্রতিবেদনে বলা হয়, জেরিবার মাথার পেছনের অংশে দুটি ধারালো কাটা দাগ। দুই হাত লম্বালম্বি ও অর্ধমুষ্টি অবস্থায় আছে। দুই হাতে থেতলানো আঘাত। দুই পা লম্বালম্বি ও স্বাভাবিক আছে। শরীরের বিভিন্ন অংশে মরনোত্তর কালশিরা দাগ আছে। আলামত হিসেবে খাটের ওপর থেকে রক্তের দাগ যুক্ত সাদা রঙের বালিশ, বিছানার চাদর, গাঢ় রক্তের দাগ যুক্ত সাদা তোয়ালে এবং একটি আইফোন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত