মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী পাঁচ দশক ধরে সাংবাদিকতা করছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ এক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। মতপ্রকাশ, বাকস্বাধীনতা, পেশাদার ও স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রশ্ন নানাভাবে আলোচনায় আসছে। সার্বিক বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : সাংবাদিকতায় আপনার দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে বাংলাদেশের এখনকার সাংবাদিকতার পরিস্থিতি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ যদি সংক্ষেপে বলতেন?
মতিউর রহমান চৌধুরী : সেল্ফ সেন্সরশিপ প্রবল, ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক খবর দেওয়া যাচ্ছে না। এমন নয় যে সরকার চাপ সৃষ্টি করছে কিংবা কেউ টেলিফোন করে বলছে যে এই নিউজ দেওয়া যাবে না। বিষয়টা এমন না, কেউ ফোনও দিচ্ছে না। তারপরও এক ধরনের চাপ নিজেদের মধ্যেই, কতটুকু দেওয়া যাবে, কতটুকু দেওয়া যাবে না। আমরা নিজেরাই সেল্ফ সেন্সর করে রিপোর্টটা সাজাচ্ছি। সাংবাদিকতা এখন খুব চাপের মুখে। তবে এই দেশে ইতিপূর্বে আর কখনো এ-রকম স্বাধীনতা পাওয়া যায়নি। এই অবাধ স্বাধীনতার একটা বিপদও আছে। সেই বিপদ সামনে রেখেই বলছি সেল্ফ সেন্সরশিপটা এখন বেশি কার্যকর।
দেশ রূপান্তর : একদিকে বলছেন ‘অভূতপূর্ব স্বাধীনতা’, আবার সেল্ফ সেন্সরশিপ...। এই বৈপরীত্য কেন?
মতিউর রহমান চৌধুরী : এটা গত ১৫ বছরের কারণেই তৈরি হয়েছে। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমরা লড়াই করিনি, প্রতিবাদ করিনি। খুব কম সংখ্যক লোক প্রতিবাদ করেছেন। আমরা গড্ডলিকা প্রবাহের মধ্যে গা ভাসিয়ে দিয়েছি। আমরা অনেক সময় দেখেও না দেখার ভান করেছি। ভেবেছি এভাবেই যখন চলছে তা অসুবিধেটা কী! আমরা সাংবাদিকতার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। আগে পরিচয় ছিল প্রথমে সাংবাদিক পরে দল। কিন্তু গত ১৫ বছরে আমরা বলেছি আগে সাংবাদিক নয়, আগে দল তারপরে সাংবাদিক। এটা আমাদের সামগ্রিক অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রাপ্তি আর প্রত্যাশার মধ্যে আমরা ডুবে গিয়েছিলাম। এটা তো আর একদিনে কাটিয়ে উঠতে পারবেন না। এখন চাপ না থাকলেও আমরা একটা মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মধ্যে আছি যে, কোনটা যাবে কোনটা যাবে না সেটা নির্ধারণ করতে পারছি না।
দেশ রূপান্তর : গত ১৫ বছর আপনার পত্রিকায় সাহসিকতার সঙ্গে নানান প্রতিবেদন করেছেন। মোটামুটি আপনি আমাদের আদর্শ হয়ে উঠছিলেন। এই সরকারের সময় বলছেন...
মতিউর রহমান চৌধুরী : ওই সময়ে সহজ ছিল এ রকম কিন্তু না। আমার জন্য খুবই কঠিন ছিল। আমার বহু রিপোর্ট কিল করতে হয়েছে, ওয়েবসাইট থেকে তুলে নিতে হয়েছে, আমাকে ৮ মাস বাইরে থাকতে হয়েছে। ৫ তারিখে যে গণঅভ্যুত্থান হলো এর ৩ দিন আগে ২ তারিখে আমাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। হ্যাঁ, আমরা সবাই যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকতাম তাহলে আরও বেশি স্বাধীনতা হাসিল করতে পারতাম। কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি নিজেদের অনৈক্যের কারণে। আর এখন যেটা সেখানেও ভুল বুঝাবুঝির কিছু নেই। এখন আমার মধ্যে এক ধরনের সেল্ফ সেন্সরশিপ কাজ করে দেব কি-না, দিলেও কোথায় দেব? কেউ কিন্তু আমাকে না দিতে বলছে না, পেছনে বন্দুক নিয়েও কেউ নেই। বিশেষ করে যারা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করেন তাদের বিপদ আরও বেড়েছে। সরকার কিছু বলছে না। কিন্তু কেন যেন আমার ভয় যে আমি এটা দিলে হজম করতে পারব কি না। আসলে কে ক্ষেপবে কে ক্ষেপবে না সেটাই বোঝা মুশকিল।
দেশ রূপান্তর : রিসেন্ট কিছু ঘটনার কথা আপনি জানেন। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হচ্ছে, অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল হচ্ছে। এই ধরনের ঘটনার অভিজ্ঞতা কম, ঘোষণা দিয়ে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল হচ্ছে। সার্বিকভাবে আপনার মন্তব্য কী?
মতিউর রহমান চৌধুরী : অ্যাক্রিডিটেশন বাতিলের ব্যাপারে আমার বক্তব্য স্পষ্ট। আমি মনে করি এটা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী। আপনার বিরুদ্ধে এবং আমার বিরুদ্ধে যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে তাহলে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। হ্যাঁ, সরকার ইচ্ছে করলে অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল করতে পারে, কিন্তু ঢালাও বা পাইকারিভাবে অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল করাটা প্রয়োজন ছিল বলে আমি মনে করি না। সম্পাদক পরিষদ যথার্থই বিবৃতি দিয়েছে। কিন্তু সাংবাদিক ইউনিয়ন তো বিভক্ত, এক দলের তো আবার নেতাই নেই। এসব মিলিয়ে আমাদের মধ্যে যে অনৈক্য এটাই কাজ করেছে। গত ১৫ বছরেও কিন্তু তাই ছিল। আমার নিজের অভিজ্ঞতা হচ্ছে আমার দুবার অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল হয়েছে ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে...।
দেশ রূপান্তর : কিন্তু এখন যেমন অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের প্রেস রিলিজ হচ্ছে, তেমন কি হয়েছে?
মতিউর রহমান চৌধুরী : না, এ-রকম তো হয় না। এটা তো এক ধরনের মিডিয়া ট্রায়াল হয়ে যাচ্ছে। এর আরও বেশি প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল। এভাবে আগে কখনই হয়নি। নিজের অভিজ্ঞতা বলি, ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে আমি যখন সংবাদের রিপোর্টার ছিলাম। তখন একটা রিপোর্ট লিখেছিলাম হেডলাইন ছিল, ‘মন্ত্রীরা কোরআন শরিফ নিয়ে শপথ নিয়েছেন ঘুষ খাবেন না তথ্য পাচার করবেন না’ এটা প্রায় ৮ কলামব্যাপী স্টোরি ছাপা হয়েছিল। ওই রিপোর্ট ছাপা হওয়ার ফলে আমার অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল হয়েছে। কিন্তু মাত্র ১ সপ্তাহের মধ্যে আমার অ্যাক্রিডিটেশন আবার বহাল হয়েছিল। এরশাদের সময় কলাম লিখেছিলাম সাপ্তাহিক খবরের কাগজে। শিরোনাম ছিল ‘দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসের নৃত্য’। সেটা নিয়ে অনেক ঘটনা ঘটে। আমার গাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নিয়ে। পত্রিকা বন্ধ হয়েছে, আমার নামে হুলিয়া জারি হয়। এরপরে আমার অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল করা হয়। সেটাও প্রায় এক মাস পরে বহাল হয়েছিল। কিন্তু এখন যে পদ্ধতিতে বাতিল হচ্ছে সেটা নজিরবিহীন। তখন তো কেউ জানতই না, আমার সহকর্মীরাই জানত না যে আমার কার্ড বাতিল হয়েছে। আমিই শুধু জানতাম। আমাকে পিআইডি থেকে বলেছিল যে আপনার অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল হয়েছে। এখন যেটা হচ্ছে সেটা নতুন। আমি তো স্বাধীনতার পর থেকে সাংবাদিকতায় আছি আমি শুনিনি কখনো। হওয়াটাও ঠিক না। আমি এটা তথ্য উপদেষ্টার সামনে বলেছি। আমি মনে করি তারা এটা রিভিউ করবেন। কারণ স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে গিয়ে একটা অস্বচ্ছ কাজ করলে তো মানুষের মধ্যে সন্দেহ সংশয় তৈরি হবে।
দেশ রূপান্তর : বলা হচ্ছে যে তারা ফ্যাসিস্টদের দোসর ছিল। অভিযোগ আকারে এটা কীভাবে টিকবে সে প্রশ্নও উঠছে।
মতিউর রহমান চৌধুরী : ফ্যাসিস্টের দোসর বললেই তো হবে না। এটার প্রমাণ লাগবে তো। সবাই বিভক্ত হয়ে এক জায়গায় বসে আছে। সবাই মনে করছে ওদের অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল হয়েছে খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু সম্পাদক পরিষদ এটা মনে করে না। সম্পাদক পরিষদে কি ভিন্নমত আছে না? আছে তো। কিন্তু সবাই একটা বিষয়ে একমত যে এটা পেশাদারিত্বের ওপর আঘাত। আমি যদি অভিযুক্ত হই তাহলে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। এক ধরনের মিডিয়া ট্রায়াল চলছে।
দেশ রূপান্তর : বিভিন্ন সময় এবং সরকার পরিবর্তনের পর তো আমরা মন্ত্রী, এমপি, পেশাজীবী, প্রতিষ্ঠানের এমডি, ব্যাংকের দুর্নীতির খবর পাই। কিন্তু সাংবাদিকদের দুর্নীতির বা অবৈধ সম্পদ অর্জনের খবর পাই না। এক্ষেত্রে কি কোনো পেশাগত স্বার্থ বা ঐক্য আছে?
মতিউর রহমান চৌধুরী : পাইনি এটা ঠিক। কারণ আমাদের নিজেদের মধ্যে এই চর্চাটা নেই। এটা থাকলে ভালো হতো। আমি যেটা মনে করি কেউ যদি করাপশনের সঙ্গে যুক্ত হয় সেটা সাংবাদিক কেন সবার ক্ষেত্রেই, আইন সবার জন্যই সমান। আর আপনি পেশাগত যেটা বললেন, বিভাজন তো সবার মধ্যেই ছিল, সাংবাদিকদের মধ্যে ছিল ভয়াবহ। আমরা সাংবাদিকরা সেটা প্রমাণ করেছি। আমাদের জন্য লজ্জাজনক ঘটনা ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকদের ভূমিকা। সেটা করতে গিয়ে অনেকেই নিজেদের সুবিধার জন্য আত্মসমর্পণ করেছে। এখন তো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমে স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনাই হচ্ছে না। আলোচনা হচ্ছে অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল নিয়ে। তারপর ঢালাওভাবে খুনের মামলা দেওয়া হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। এটাও বোধ করি ঠিক হয়নি। আমি বলছি না সবাই ভালো বা সবাই খারাপ। আমি মনে করি আইন যেহেতু আছে দেশে, আইনের শাসন যেহেতু প্রতিষ্ঠা করতে চাই সেহেতু এভাবে করা ঠিক হয়নি। শেখ হাসিনা সরকার যেহেতু আইনের শাসনের বিশ্বাসই করত না, সেই জায়গায় আমরা যেহেতু সুযোগ পেয়েছি তা আমরা আইনের অপব্যবহার করব কেন? আমার মনে হয় এই সরকার বিষয়টির দিকে নজর দেবে এবং সাংবাদিকদের মধ্যে যে এত আতঙ্ক তৈরি হয়েছে সেটা নিয়ে কাজ করবে।
দেশ রূপান্তর : আপনি তো পলিটিক্যাল গভর্নমেন্ট দেখেছেন, নন-পলিটিক্যাল গভর্নমেন্ট দেখেছেন, নন-পলিটিক্যালের মধ্যে সামরিক শাসন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা এই ধরনের ফরমেশন দেখেছেন। আসলে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কোন ফর্মের সরকারের সময়ে আপনি স্বস্তিবোধ করেছেন?
মতিউর রহমান চৌধুরী : গণতান্ত্রিক সরকার। গণতন্ত্র ছাড়া তো হবে না। আমি ১৯৭৪ সালে চাকরি হারিয়েছি রিপোর্ট লিখার কারণে। পলিটিক্যাল গভর্নমেন্ট ছাড়া তো কেউ আপনাকে চাকরির নিরাপত্তা দেয়নি। এরশাদের জামানায় ছিল না, ওয়ান ইলেভেনে ছিল না। শেখ হাসিনার সময়ে তো অন্য ধরনের সরকার ছিল, একদলীয় সরকার ছিল, পুরোটাই ছিল স্বৈরশাসন। তখন যেটুকু স্বাধীনতা ছিল অনেকে সেটুকুও কাজে লাগাতে পারেনি। আমি পারলে আরেকজন পারল না কেন? পারত! আমার বিরুদ্ধে তো সাংবাদিকরাই বেশি কমপ্লেইন করেছেন। এই দুঃখের কাহিনি কাকে বলব? আমি তো ৩ বার জেলে গেলাম। আমি তো এরশাদের আমলে গেছি, খালেদা জিয়ার আমলে গেছি। জিয়াউর রহমানের দুটি ঘটনা ঘটেছে। একটা রিপোর্টের জন্য একদিনের জন্য জেল হয়েছিল। তারপরে একটা মামলা এখনো ঝুলে আছে। সেই মামলায় বিচারক পদত্যাগ করেছেন আমার রিপোর্টের কারণে। এরশাদ সাহেবের ৬ মাসের জেল আমার একমাসের জেল হয়ে আছে। এই যে পরিস্থিতি, এই পরিস্থিতি তো মোকাবিলা করে আসছি আমরা। দেশের যে অবস্থা, এখন সাংবাদিকতা একটা বিশাল চাপের মধ্যে আছে। এমনিতেই তো আমরা অর্থনৈতিক সংকটে আছি। এই সংকটের মধ্যে পুঁজির কোনো বিকাশ ঘটছে না। এই অবস্থায় কাগজ টিকবে কি টিকবে না, টেলিভিশন টিকবে কি টিকবে না বলা মুশকিল। এটা তো সুস্থ সাংবাদিকতার অন্তরায় এটা পরিষ্কারভাবে বলা যায়।
দেশ রূপান্তর : দলীয় সাংবাদিকতার বাইরেও এমবেডেড জার্নালিজম বলে একটা বিষয় এখন প্রতিষ্ঠিত বলা যায়। এটাকে কীভাবে দেখেন?
মতিউর রহমান চৌধুরী : এটা তো সাংবাদিকতা হয় না। কারণ বন্দুকের সামনে, ট্যাংকের সামনে বসে আপনি রিপোর্ট পাঠাচ্ছেন, কীভাবে পাঠাচ্ছেন সেটা তো বুঝতেই পারেন। আমি তখন ভয়েজ অব আমেরিকায় কাজ করতাম, আমি ২৮ বছর কাজ করেছি। দুটো যুদ্ধই কাভার করেছি ভয়েজ অব আমেরিকার জন্য। এমবেডেড জার্নালিজম জার্নালিজমের সংজ্ঞার মধ্যেই পড়ে না।
দেশ রূপান্তর : আপনি জানেন ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সমর্থক বা কোলাবরেটর হিসেবে আমাদের কতিপয় মিডিয়াকে দায়ী করা হয়। আবার এখনো এ রকম একটা অভিযোগ উঠছে। বিষয়টা আপনি সাংবাদিক হিসেবে কীভাবে দেখছেন?
মতিউর রহমান চৌধুরী : বিষয়টি আসলে খুবই স্পর্শকাতর। আর আমি এই ব্যাপারে মন্তব্যও করতে চাই না। আমরা চাই না এই ধরনের অভিযোগ আসুক। আবার অভিযোগ অনেক ক্ষেত্রে ঢালাওভাবেও আসে। আর যদি কারও বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ থাকে সেটা তারা নিজেরাই ঠিক করবে। কারণ আমরা সৎ সাংবাদিকতা চাই, আমরা যা দেখব তা লিখব; আমরা সবসময় বলি যে, আমাদের হাত খোলা থাকবে, বন্ধ থাকবে না, কেউ আটকাবে না, আমরা সব লিখে দেব। এই নীতিতে যদি বিশ্বাস করি তাহলে মনে হয় কোনো শাসকের সঙ্গে যাওয়ার কথা নয়। স্বাভাবিকভাবে এ-রকমটা আশা করা যায় না, বা কাম্য নয়।
দেশ রূপান্তর : আমাদের সোসাইটি তো ভয়াবহ রকম বিভক্ত, যে বিভাজন পেশাজীবীদের মধ্যেও আছে। আপনি সাংবাদিকদের মধ্যে অনৈক্য ও সাংগঠনিক বিভক্তির কথা বললেন। সমাজ যেখানে বিভক্ত সেখানে সাংবাদিকরা সেটা এড়াবেন কীভাবে?
মতিউর রহমান চৌধুরী : আমি তো বললাম আপনাকে যে সম্পাদক পরিষদ যদি ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে তাহলে সাংবাদিক ইউনিয়ন কেন পারে না? তাদের কী সমস্যা বলেন? তারা দেখে অন্তত শিখবে তো। আমার মনে হয় সম্পাদক পরিষদ থেকে শিক্ষা নিয়ে সাংবাদিক বন্ধুরা সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতারা দ্রুত অনুধাবন করতে পারবেন। একে অপরকে অভিযুক্ত না করে, আসামির কাঠগড়ায় না দাঁড় করিয়ে পেশাগত স্বার্থে তারা ঐক্যবদ্ধ হবেন এবং তারা ঐক্যবদ্ধ হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমরা যে স্পিরিট থেকে কথা বলছি যদি সব ইউনিয়ন সেভাবে কথা বলতে পারে তাহলে কোনো শাসক কি এটা পারত? বিভক্তি এড়িয়ে কাজ করা সম্ভব নয় ঠিক না, সম্ভব। কিন্তু এটা কষ্টদায়ক এবং বিপজ্জনকও বটে। কারণ আপনি তো প্রটেকশন পাবেন না, আপনার তো প্রটেকশন দরকার আছে। সম্পাদক পরিষদ বিবৃতি দিতে পারে, কেন পারে? কারণ তারা প্রেশারটা সামনে দেখেছে। আর সাংবাদিক ইউনিয়ন এখন পর্যন্ত নানা কারণে দ্বিধাবিভক্ত এবং আমি জানি না পেশাগত জায়গাটা তারা দেখাতে পারে কি না।
দেশ রূপান্তর : সাংবাদিকদের ওপর প্রত্যাশার চাপটা কি বেশি না?
মতিউর রহমান চৌধুরী : ডেফিনেটলি! মানুষের চাওয়া-পাওয়া তো হচ্ছে সাংবাদিকদের ওপরে। মিডিয়ার স্বাধীনতা থাকলে আমরা যে শাসন থেকে এলাম সেটার জন্মই হতো না। মিডিয়া ঠিক থাকলেই হতো। কিন্তু মিডিয়া পুরো আত্মসমর্পণ করেছিল। তারা এ কারণে যা ইচ্ছে তাই করেছে। এজন্য সাংবাদিকদের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ ছিল সেটা অনেকটা কমে গেছে; মানুষের বিশ্বাস, আস্থা কমে গেছে।
দেশ রূপান্তর : আমাদের সোসাইটিতে অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট ফিলিংসটা বেশি কি না? যেমন, সরকারের কোনো ইনিশিয়েটিভের প্রশংসা করে রিপোর্ট করেন সেটা পাবলিক ভালো করে নেয় না কিন্তু যখন সরকারের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বা নেগেটিভ জায়গাগুলো নিয়ে করলে পাবলিক খুশি হয়।
মতিউর রহমান চৌধুরী : এই ট্রেন্ড বিশ্বব্যাপী। এটাই স্বাভাবিক। কারণ ঘষামাজা করেও রিপোর্ট লেখা যায়। আপনি ইন-জেনারেল বলেছেন, আমিও বলছি। ইন-জেনারেল হচ্ছে, মানুষ আসলেই অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্টের আলাপ খোঁজে। মানুষ প্রশংসা তো জেনেই ফেলছে। কিন্তু মানুষ ঘটনার পেছনের ঘটনা জানতে চায়। এখন রিপোর্ট লিখলে সে উদ্দেশ্য খোঁজে কী উদ্দেশ্যে আপনি রিপোর্ট করলেন।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের একরকম সাংবাদিকতা দেখছি। এটা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
মতিউর রহমান চৌধুরী : আমার কাছে খুব দুর্ভাগ্যজনক মনে হয়। কারণ ভারতের সাংবাদিকতার প্রতি আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ ছিল। আমি এক সময় ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছি অনেক দিন। সেখানে টাইমস অফ ইন্ডিয়া বাংলাদেশ নিয়ে এমন নিউজ লিখবে যেটা আমার বিশ্বাসের মধ্যেই নেই। কারণ হচ্ছে টাইমস অব ইন্ডিয়া খুব প্রেস্টিজিয়াস পেপার ছিল। কিন্তু এটা তারা কীভাবে করল। আমি জানি না এটা ম্যানেজড জার্নালিজম কি না। এটা ম্যানেজড জার্নালিজম কি না সেটা নিয়েই ভাববার বিষয়।
দেশ রূপান্তর : সার্বিকভাবে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নিয়ে যদি জানতে চাই, কী বলবেন?
মতিউর রহমান চৌধুরী : সাংবাদিকরা খুব চাপে আছে। এটার জন্য শুধু শাসকরা দায়ী সেটা আমি বলব না, এজন্য আমরা নিজেরাও দায়ী। আমরা অনেক কিছু হজম করছি অথবা কোনো সুবিধার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছি। যদি এককথায় বলতে যান তাহলে বাংলাদেশে গোটা সাংবাদিকতা মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে অস্তিত্ব সংকট অন্যদিকে মানুষের বিশ্বাস, আস্থার জায়গা কমে গেছে। মানুষ আসলে সত্যিকার সাংবাদিকতা চায়। মানুষ চায় আমরা আবার ট্র্যাকে ফিরে আসি। না হলে বিপদ হচ্ছে অনেক সময় সত্য ঘটনা লিখলেও বিশ্বাস করতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে, সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করতে হবে দল-মতভেদে। আগে সাংবাদিকতার মূল আদর্শকে সমুন্নত রাখতে হবে। তাহলেই এই পরিস্থিতি থেকে আমরা মুক্তি পাব।
অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়
