ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক সংবিধানের ‘পঞ্চদশ’ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করলে বিষয়টি সামনে আসে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। ফলে এই ব্যবস্থার ‘যৌক্তিক’ সংস্কার জরুরি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেভাবে আসে : ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে বন্দুকের নলের মুখে হটিয়ে এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। নির্দলীয় সরকার ছাড়া সব দল এরশাদের অধীনে সাধারণ নির্বাচনে না যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি দল সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। বিরোধী দলগুলো ১৯৮৮ সালের নির্বাচন বর্জন করে এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। আন্দোলন চাঙ্গা হয় ১৯৯০ সালের অক্টোবরে। তখন বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং বাম দলগুলোর পক্ষ থেকে ঘোষিত ‘তিন জোটের রূপরেখায়’ নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানানো হয়েছিল। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকার বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন ১৬ সদস্য বিশিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন। এটাই প্রথম নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
মাগুরা উপনির্বাচনে বিতর্ক শুরু : ১৯৯৪ সালে মাগুরা-২ আসনের আওয়ামী লীগের দলীয় সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামানের মৃত্যুর পর ‘উপনির্বাচন’কে আ.লীগ ও বিএনপি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়। ভোটের দিন উত্তেজনা বাড়তে থাকে। সন্ধ্যায় ভোটগ্রহণের ৩ ঘণ্টা পর বিভিন্ন কেন্দ্রের ফল আসতে থাকলে আ.লীগ প্রার্থীর পরাজয়ের আভাস পাওয়া যায়। শেখ হাসিনা আ.লীগ প্রার্থীর বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনী ফল প্রত্যাখান করেন। আ.লীগ যুক্তি দেখায় যে, সরকার যদি নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল আনে, তাহলে তারা সংসদে যোগদান করবে। সংকট নিরসনে কমনওয়েলথ মহাসচিব এমেকা আনিয়াত্তকু বাংলাদেশ সফর করে সরকারি ও বিরোধী দলের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনার ভিত্তিতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেন। তার ৩ দফা পরিকল্পনা খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা মেনে নেন। ৩ দফার ভিত্তিতে ১৯৯৪ সালে ১০ অক্টোবর কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ান মার্টিন স্টিফেন ছয় সপ্তাহ ধরে দুই দলের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক আলোচনা করেন। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতর থেকে একটি ফর্মুলা প্রস্তাব করেন। আ.লীগ এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে স্যার নিনিয়ানের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করে। কমনওয়েলথ মহাসচিব এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। ব্যর্থ হয়ে ১৪ নভেম্বর স্যার নিনিয়ান স্টিফেন দেশে ফিরে যান। এক পর্যায়ে ১৯৯৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর আ.লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির ১৪৭ জন সংসদ সদস্য একযোগে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। শুরু হয় হরতাল কর্মসূচি। এতে ৬৪ জন নিহত এবং কয়েক শতাধিক আহত হয়। অবশেষে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। ১৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৪৭ সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রিপরিষদ শপথ গ্রহণ করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা এবং বিএনপি সরকারের পদত্যাগের দাবিতে ২৩ মার্চ ঢাকার সাবেক মেয়র ও আ.লীগ নেতা হানিফের নেতৃত্বে ‘জনতার মঞ্চ’ প্রতিষ্ঠা হয়। অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্বে ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ থেকে খালেদা জিয়া বলেন ‘১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ছাড়া গত্যন্তর ছিল না।’ অবশেষে ২৫ মার্চ রাতভর আলোচনা শেষে ভোররাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস হয় এবং ত্রয়োদশ সংশোধনী গৃহীত হয়। প্রধানমন্ত্রী ২৯ মার্চ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে সংসদ ভেঙে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে আহ্বান জানান। ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর অধীনে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে হাবিবুর রহমান প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বৈধতার রিট : ১৯৯৬ সালে আইনজীবী সৈয়দ মসিউর রহমান ১৩তম সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট করলে বিচারপতি মোজাম্মেল হক ও এম এ মতিনের বেঞ্চ রিটটি খারিজ করে দেয়। আপিল বিভাগের ৬ জন বিচারপতির মধ্যে ৩ জন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মত দেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিপক্ষে মতামত দিয়ে বিচারকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিচারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবৈধ বলে রায় দেন। নানা কারণে এ রায়টি বিতর্কিত। বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে প্রধান বিচারপতি করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির সংখ্যা ৭ থেকে বাড়িয়ে ১১ জন করা হয়। ২ জন যোগ্য ও দক্ষ বিচারপতিকে ডিঙিয়ে তাকে আওয়ামী লীগ সরকার স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রধান বিচারপতি করেছিল। তার এ অবৈধ পদোন্নতি মেনে নিতে না পেরে একজন সিনিয়র বিচারপতি পদত্যাগ করেছিলেন। এটা পরিষ্কার যে, সরকার তার সুবিধামতো রায় পেতে আজ্ঞাবহ এ বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি করেছিল। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এ বি এম খায়রুল হক একজন দলবাজ বিচারপতি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। ২০০৫ সালে মুন সিনেমা হলের মালিকানা সংক্রান্ত একটি মামলার রায়ে এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে। ২০০৮ সালের ৩০ জুলাই স্থানীয় নির্বাচন সংক্রান্ত একটি মামলায় পুরো সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে আ.লীগকে সুবিধা দিতে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ে অংশগ্রহণ বৈধ বলে রায় দিয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার বাড়ি সংক্রান্ত মামলার বিচারে এ বি এম খায়রুল হক নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন। নিম্ন আদালতের বিচারে হস্তক্ষেপসহ নানা কারণে তিনি ছিলেন বিতর্কিত। সংবিধান পরিবর্তন করতে হলে আগে সংসদে সংশোধনী আনতে হবে। কিন্তু ত্রয়োদশ সংশোধনী ও রায় প্রকাশের আগেই সংবিধান পুনর্মুদ্রিত করে সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আদালতে অবৈধ ও বেআইনি বলে রায় প্রদান করার ৩ মাস আগেই সরকার সংবিধান থেকে এ ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। সংবিধান পুনঃমুদ্রণের জন্য পাঠানো হয় ১০ ফেব্রুয়ারি,২০১১। আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অবৈধ ও বেআইনি বলে রায় দেয় ১০ মে, ২০১১। রায় প্রদানের ৩ মাস আগেই সংবিধান থেকে সংশোধনী ছাড়াই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়টি বাতিল করায় আদালতের সঙ্গে সরকারের গোপন আঁতাতের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। আবার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার আগেই সরকার সংবিধানে সংশোধনী আনে। আদেশের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১২। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগে আওয়ামী লীগ সরকার জোরপূর্বক ৩০ জুন ,২০১১ সালে সংসদে সংক্ষিপ্ত রায়ের ওপর ভিত্তি করে একদলীয় কায়দায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে। ২০০৯ সালে আ’লীগ ক্ষমতায় বসার পর সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করা হবে বলে যা বলেছিল, আদালতের রায়ে তার প্রতিফলন ঘটে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল হওয়ার পরেও আগামী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার জন্য প্রধান বিচারপতির অভিমত, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও দেশবাসীর দাবিকে অগ্রাহ্য করা হয়। ক্ষমতার জোরে বাজেট অধিবেশনে মাত্র ৪টি মিনিটের আলোচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার জনগণের অভিপ্রায় : সংবিধানের ৭ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।’ এই উপ-অনুচ্ছেদের ২টি অংশ। প্রথম অংশ : ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন।’ প্রথম অংশের ব্যাখ্যা হচ্ছে, জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন, দাবি, চাহিদা, আশাপূরণের জন্য জনগণের পক্ষে সংসদ সদস্যরা এই সংবিধান রচনা করবেন। এই সংবিধান হচ্ছে দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা বিধানের সর্বোচ্চ আইন। বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। কিন্তু প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়িয়ে নিজেদের পছন্দনীয় ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা করার জন্য সংবিধানে চতুর্দশ সংশোধনী এনেছিল বিএনপি। আরও এক ধাপ এগিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দেয় আ.লীগ। দ্বিতীয় অংশের বক্তব্যটি হচ্ছে ‘অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হইবে।’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির কোন অংশটি সংবিধানের সঙ্গে কীভাবে সাংঘর্ষিক এবং কতটুকু সাংঘর্ষিক তা যথাযথভাবে বিভিন্ন আইনের ধারা এবং সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের আলোকে বাতিলের পক্ষে যুক্তি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকসহ চার বিচারপতি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টারা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি নয়। তাই সংবিধানের সঙ্গে অবশ্যই সাংঘর্ষিক। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এমনভাবে সংশোধন করতে হবে, যাতে সংবিধানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক না হয়। যেমন জাতীয় সংসদ সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করে যেভাবে স্পিকার, রাষ্ট্রপতি এবং মহিলা সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে, সেভাবে একটি মানানসই প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের নির্বাচিত করলে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না। সে ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের নিয়োগ, অপসারণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য স্পিকারের নেতৃত্বে একটি সর্বদলীয় পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠন করা যেতে পারে। জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত হলেও স্পিকারের মতো তাদের পদ বহাল থাকবে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ‘কোটা সংস্কার’ মামলার রায় নিয়ে যে আন্দোলন হয়েছে, সেই আন্দোলনে বহু তাজা প্রাণ ঝরেছে। তাই আদালতের উচিত, অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া। পুরনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সরাসরি বাতিল কিংবা পুনর্বহাল নয়, সময়ের আলোকে যথাযথ এবং যৌক্তিক সংস্কার চাই।
লেখক: অ্যাক্টিভিস্ট এবং নির্বাচন বিশ্লেষক
