সরকার বদলের প্রেক্ষাপটে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের দেওয়া বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা আরও ৬০ দিন (দুই মাস) বাড়িয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত শুক্রবার সময় বাড়ানোর আদেশ জারির পর গতকাল শনিবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী বিশেষ এ ক্ষমতার আওতায় গ্রেপ্তার ও বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার মতো সুযোগ থাকছে সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন থেকে তদূর্ধ্ব কমিশন পাওয়া কর্মকর্তাদের।
এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীকে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরে তাতে সশস্ত্র বাহিনীকে (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া হয়।
এবার কোস্ট গার্ড ও বিজিবিতে প্রেষণে নিয়োজিত সমপর্যায়ের কর্মকর্তারাও এ ক্ষমতা পাবেন বলে সবশেষ প্রজ্ঞাপনে যুক্ত করা হয়েছে।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে ঢাকাসহ সারা দেশে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে গত ১৯ জুলাই রাতে সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন ও কারফিউ জারি করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। পরে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর ৮ আগস্ট অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠিত হয়। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এখনো সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন আছে।
ফৌজদারি কার্যবিধির যে ১৭ নম্বর ধারায় সেনা কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেখানে এই নির্বাহী হাকিমরা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, অর্থাৎ জেলা প্রশাসকের অধীনে থাকার কথা বলা আছে।
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৬৪, ৬৫, ৮৩, ৮৪, ৮৬, ৯৫(২), ১০০, ১০৫, ১০৭, ১০৯, ১১০, ১২৬, ১২৭, ১২৮, ১৩০, ১৩৩ এবং ১৪২ ধারার অধীনে তাদের কার্যক্রম চলার কথা বলা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে।
এসব ধারায় গ্রেপ্তার ও গ্রেপ্তারের আদেশ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা, তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অসদাচরণ ও ছোটখাটো অপরাধের জন্য মুচলেকা আদায়, মুচলেকা থেকে অব্যাহতি, বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার ক্ষমতা পাবেন বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা।
একই সঙ্গে স্থাবর সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বাধা অপসারণ এবং জনগণের ক্ষতির আশঙ্কা করলে সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারবেন তারা।
প্রথমবার এই ক্ষমতা দেওয়ার পরদিন ১৮ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন সচিব মোখলেস উর রহমান বলেছিলেন, দেশে একটি জনবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তখন থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশ জুড়ে যৌথ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। নিয়মিত টহল কার্যক্রমের পাশাপাশি সড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালাতে দেখা গেছে যৌথ বাহিনীর সদস্যদের।
বর্তমানে দেশের ৬২ জেলায় সেনাসদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারকে সহায়তা করছে বলে গত বুধবার সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন মিলিটারি অপারেশনস ডাইরেক্টরেটের স্টাফ কর্নেল ইন্তেখাব হায়দার।
এ পর্যন্ত আড়াই হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার এবং ছয় হাজারের বেশি অস্ত্র, দুই লাখ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধারের তথ্য দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ইন্তেখাব হায়দার গত দুই মাসে সাতশোর বেশি বিভিন্ন ধরনের ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি’ নিয়ন্ত্রণ করেছে সেনাবাহিনী বলে তথ্য দেন।
এর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত ঘটনা ছিল ১৪১টি, সরকারি সংস্থা/ অফিস-সংক্রান্ত ঘটনা ছিল ৮৬টি, রাজনৈতিক দলের ঘটনা ছিল ৯৮টি।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে পাওয়া ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা যেন ‘সুষ্ঠুভাবে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে’ প্রয়োগ করা হয়, সে বিষয়ে সেনাবাহিনী সতর্ক আছে বলেও জানান তিনি।
এ ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী কত দিন মাঠে থাকবে, অন্তর্র্বর্তী সরকারই তা নির্ধারণ করবে বলে জানিয়েছেন এই সেনা কর্মকর্তা।
