এ তল্লাটে কারা সেই ‘ভানসর্বস্ব পুঁজিবাদী’

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২৪, ০২:২০ এএম

পুরুষতান্ত্রিকতা, শ্রেণি আধিপত্যবাদ, শ্বেতাঙ্গ কুলীনতা, বর্ণ বৈষম্য, জাতি বৈষম্য, লিঙ্গ বৈষম্য রক্ষণশীলতার প্রতিটি ক্ষেত্রেই সদলবলে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করা (এবং একটি ক্ষেত্রে আদালতে অপরাধী প্রমাণিত হওয়া) ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি গলাধঃকরণে অনেকেরই বেগ পেতে হচ্ছে। কিন্তু ট্রাম্প শুধু বিজয়ই পাননি, তিনি ডেমোক্র্যাট শিবিরের দীর্ঘদিনের ভোটব্যাংক নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন, যা গেল কয়েক দশকেও ঘটেনি।

ট্রাম্প নিজের নির্বাচনী প্রচারণায় ঘোষণা দিয়েছেন যে, সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণ শেষ করবেন এবং ‘আমেরিকার ইতিহাসে বৃহত্তম নির্বাসন কর্মসূচি’ পরিচালনা করবেন। তার রানিং মেট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, প্রতি বছর ১০ লাখ পর্যন্ত অনিবন্ধিত অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর টার্গেট রয়েছে তাদের। তারপরও অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে হিসপ্যানিক ভোটাররা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন। অভিবাসী, মুসলিম এবং নারী ভোটাররাও আগের তুলনায় বেশি ভোট দিয়েছেন ট্রাম্পকে। আর শ্বেতাঙ্গ ও পুরুষ ভোটের জোয়ার স্বাভাবিকভাবেই ছিল ট্রাম্পের পক্ষে। কিন্তু কেন?

এর জবাব খুঁজতে গিয়ে খুঁজে পাই মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী মুসা আল গারবির তত্ত্ব। ২০১৬ সালে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়তে নিউ ইয়র্কে আসার পর গারবির চোখে পড়ে এক ‘গোষ্ঠীগত বর্ণপ্রথা’; যার আওতায় ব্যবহারের পর ছুড়ে ফেলার উপযোগী চাকররা পরিচ্ছন্নতার কাজ, বাচ্চা কিংবা পোষা প্রাণীর দেখভাল, খাবার সরবরাহসহ সব ধরনের সেবা প্রদানের বিনিময়ে ন্যূনতম উপার্জন করছেন। এই সেবাদানকারীরা মূলত কৃষ্ণাঙ্গ কিংবা হিসপ্যানিক। দৈনন্দিন জীবনে চরম বৈষম্যের শিকার এই মানুষগুলো মৌলিক চাহিদাই মেটাতে পারছেন না অথচ তাদের শ্রমের ওপরই গোটা ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে।

‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের সময় গারবি দেখেছেন, বিক্ষোভকারীরা নিউ ইয়র্কের আপার ওয়েস্ট সাইডে অবস্থান কর্মসূচি করতে গিয়ে সেই বেঞ্চিগুলোর দখল নিয়েছে যেগুলো গৃহহীন মানুষের রাতের আশ্রয়। তারা কৃষ্ণাঙ্গদের বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য আন্দোলন করছে, কিন্তু চোখের সামনের গৃহহীন কৃষ্ণাঙ্গ তাদের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। এই শিক্ষিত উদারপন্থি শ্রেণি যারা সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে সোচ্চার কিন্তু নিজেদের আশপাশের বাস্তব অসমতা ও বৈষম্যের বিষয়ে বেখেয়াল। তাদের নাম গারবি দিয়েছেন, ‘সিম্বলিক ক্যাপিটালিস্ট’, যার বাংলা আমি করতে চাই ‘ভানসর্বস্ব পুঁজিবাদী’। এই অ-অভিজাত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই ‘ওকনেস’ বা সামাজিক ন্যায়বিচারের ভাষাকে ব্যবহার করছেন একটি আদর্শিক আঠা হিসেবে যা দিয়ে সুবিধার সিঁড়ির একটি করে ধাপ তারা জোড়া লাগাচ্ছেন এবং উঠে যাচ্ছেন সামাজিক পুঁজির চূড়ায়।

অবশ্য, এই শ্রেণি কোনোভাবেই নিজেদের অভিজাত বা এলিট বলতে নারাজ। নিজেদের সামাজিক ভূমিকা নিয়ে তারা নানা ধরনের গল্প ফাঁদেন এমনকি মিথও তৈরি করেন। যা তাদের সামাজিক ন্যায্যতা ও সমতায় সত্যিকার অর্থেই বিশ্বাসী বলে প্রতিষ্ঠা পেতে সাহায্য করে এবং ক্ষমতা কাঠামোর স্বীকৃতি লাভের পথে এগিয়ে দেয়। তাদের এই সামাজিক ন্যায়বিচারের ছদ্মভাষা অসমতাকে আরও জায়েজ ও অস্পষ্ট করে তোলে। এই চর্চার আড়ালে তারা নিজেরা অভিজাত খেতাবের আরও কাছাকাছি যেতে থাকেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকৃত অর্থেই বৈষম্যপীড়িত, প্রান্তিক এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের বলিতে চড়ানোর মাধ্যমে।

কারা এই ‘ভানসর্বস্ব পুঁজিবাদী’? গারবি বলছেন এরা হচ্ছেন সেই পেশাজীবীরা যারা ‘প্রতীক আর অলংকরণ, চিত্র আর বয়ান, তথ্য আর বিশ্লেষণ, ধারণা আর বিমূর্ততা’য় বিচরণ করেন।’ এরা হলেন লেখক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, প্রযুক্তিবিদ। তারা নিজেদের সংঘাতকে উপস্থাপন করেন অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে দরিদ্র ও অধিকারবঞ্চিতের সংঘাত হিসেবে। সামাজিক মাধ্যমে নারী অধিকার, এলজিবিটিকিউ অধিকার, কৃষ্ণাঙ্গ ও হিসপ্যানিকদের প্রতি বৈষম্য, অভিবাসীদের বঞ্চনাসহ নানা বিষয়ে তাদের অবস্থান বিশ্ব জুড়ে মানুষকে আবেগি করে তোলে। লাইক, কমেন্ট, শেয়ারের তোড়ে নানা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরনের অর্থায়ন ও অনুমোদন বানের জলের মতো তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নানাবিধ প্রকল্প ও গবেষণার মাধ্যমে তারা সামাজিক ন্যায়বিচারের ভাষা নির্মাণে আরও মনোযোগী হন, বয়ানকে আরও সূক্ষ্ম কিন্তু মজবুত করতে থাকেন। আর এভাবেই সত্যিকারের সাবঅল্টার্নের এজেন্সি বেহাত হয়ে যায়। আর ‘ভান সর্বস্ব পুঁজিবাদী’রা সামাজিক পুঁজির অবিরাম জোগানকে একেবারে বাষ্পনিরোধী করে তোলেন।

আর এটাই ব্যাখ্যা করে, কীভাবে মার্কিন ডেমোক্রেটিক পার্টি দিনকে দিন এই ধরনের শিক্ষিত ধনিক শ্রেণির ক্লাব হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাটরা ভাষায় ও বয়ানে আপাত সংবেদনশীলতা ও সহমর্মিতার নজরদারি বহাল রেখেছে ঠিকই কিন্তু কর্মজীবী ভোটারদের নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার নজির রেখেছে বারবার। খাবারের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, অপর্যাপ্ত গৃহায়ন, উচ্চশিক্ষা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে চড়া ঋণ এ সমস্ত বাস্তব আর দৈনন্দিন সমস্যার কোনো সুরাহাই হয়নি, সেই সঙ্গে বেড়েছে বেকারত্ব। সামাজিক অনুক্রমে যারা নিচের দিকে ছিলেন তারা আরও নিচে নেমেছেন, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য আকাশ ছুঁয়েছে অনেক আগেই। যুক্তরাষ্ট্রের এই চিত্র বিশ্বের এ প্রান্তেও অচেনা মনে হয় না। ‘ভানসর্বস্ব পুঁজিবাদী’দের দৌরাত্ম্য এ তল্লাটেও কি দেখতে পাই, যারা সামাজিক ন্যায়বিচারের ধ্বজাধারী হিসেবে আধিপত্য বিস্তারের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন?

লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত