গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে নতুন বাস্তবতায় এবারের সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন সম্পর্কিত আলোচনা বিশেষ জায়গা করে নেবে। বিশ্ব জলবায়ু তহবিলের বর্তমান ১০০ বিলিয়ন ডলার সরবরাহের মেয়াদ ২০২৫ সাল নাগাদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের আলোচনা চলছে। উদ্বোধনী অধিবেশনের এবারের সম্মেলনের সভাপতি ও আজারবাইজানের পরিবেশমন্ত্রী মুখতার বাবায়েভ বলেন, ‘এটা হবে উন্নয়নশীল বিশ্বে অর্থ সহায়তার ক্ষেত্রে একটি নতুন দৃষ্টান্ত, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা শেষে বাকুতে নতুন দিগন্তের শুরু হলো। যদিও এখনো অনেক কিছু বাস্তবায়ন করার বাকি আছে।’
সম্মেলনের শুরুতেই কিছুটা সফলতা অর্জিত হয়েছে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির ৬.৪ অনুচ্ছেদ সম্পর্কিত ঐকমত্য পৌঁছানোর মাধ্যমে। এর ফলে জাতিসংঘের জলবায়ু সংস্থার (ইউএনএফসিসিসি) অধীনে কার্বন ক্রেডিট ট্রেডিং-এর জন্য একটি কর্র্তৃপক্ষ গঠিত হবে। যাদের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক কার্বন মার্কেট পরিচালিত হবে। ধারণা করা হচ্ছে এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কার্বন ক্রেডিটের চাহিদা বেড়ে যাবে এবং এর বিনিময়ে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে অতিরিক্ত অর্থায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক কার্বন বাণিজ্যের মাধ্যমে মূলত জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত অভিযোজন ও প্রশমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। যদিও কার্বন ট্রেডিং নিয়ে জলবায়ু আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে বিতর্ক আছে। অনেকেই কার্বন ট্রেডিংকে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত ১.৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করেন। অর্থের বিনিময়ে দূষণের দায়িত্ব আরেক দেশের ওপর চাপানোর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না বলে তাদের মত।
অন্যদিকে জীবাশ্ম-জ্বালানি সম্পর্কিত উদ্যোগের ক্ষেত্রে এবারের সম্মেলনের প্রেসিডেন্সি ও ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (আইইএ) গতবারের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (কপ ২৮) চিহ্নিত লক্ষ্যসমূহের অগ্রগতির ক্ষেত্রে পাঁচটি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছে। এই সম্ভাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে এই শতাব্দীর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতার তিন গুণ বৃদ্ধির জন্য স্টোরেজ ও গ্রিড সক্ষমতা বৃদ্ধি। জ্বালানি দক্ষতা দ্বিগুণ করার জন্য বিশ্বব্যাপী নীতি বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা। জীবাশ্ম জ্বালানি ও মিথেন গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনতে গুরুত্বারোপ করা। জ্বালানি রূপান্তরে উন্নয়নশীল দেশসমূহে ক্লিন এনার্জিতে বিনিয়োগ করা এবং পরবর্তী জাতীয় নির্ধারিত অবদান (ন্যাশনাল ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন-এনডিসি) প্রণয়নের জন্য ‘গ্লোবাল স্টকটেক’-এর সর্বশেষ হিসাব বিবেচনায় নেওয়া। আজারবাইজান ও ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের এই ঘোষণা জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনা সম্পর্কিত পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতি ‘ফেইজআউট’ বা ‘ফেইজডাউন’ সম্পর্কিত কোনো কার্যকরী অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে প্রতি বছর বাংলাদেশে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনকে কেন্দ্র করে প্রত্যাশার পারদ চড়তে থাকে। জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে নিশ্চিতভাবে আমাদের প্রত্যাশা থাকে বিশ্বের গড় তাপমাত্রার প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা। বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করা। মূলত ধনী ও অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশগুলো এ জন্য দায়ী। অপরদিকে বাংলাদেশের জন্য অন্য আরেকটি গুরুত্বের ক্ষেত্র হচ্ছে অভিযোজন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা যা দেশের কোটি কোটি জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য একান্ত প্রয়োজন; এবং এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে জলবায়ু তহবিল থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাওয়া। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টা জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তার ‘থ্রি জিরো’ তত্ত্বের জন্য বিশ্বে সুপরিচিত। তিনি পৃথিবী থেকে তিনটি বিষয়ের বিলোপ চান। এগুলো হচ্ছে শূন্য দরিদ্রতা, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নেট কার্বন নির্গমন। তার এই শেষ লক্ষ্যটি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়ন এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা এই শতাব্দী শেষে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত।
উন্নত দেশ ও বিশ্বে তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর বিপরীতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জোট জি৭৭ জলবায়ু সম্পর্কিত দেনদরবারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এবারের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনকে কেন্দ্র করে জি৭৭ জলবায়ু তহবিল সম্পর্কিত নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে (এনসিকিউজি) প্যারিস চুক্তির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে বলেছে। তারা আরও বলেছে, অর্থায়ন সম্পর্কিত নতুন লক্ষ্যমাত্রা হতে হবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী। এটা হতে হবে ন্যূনতম ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার, যা অভিযোজন, প্রশমন ও জলবায়ু ক্ষতিপূরণ সম্পর্কিত। সবচেয়ে বড় কথা জলবায়ু তহবিলের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা থাকতে হবে যা সব দেশের একই ধরনের ভূমিকা কিন্তু দেশগুলোর অবস্থা ও সক্ষমতা বিবেচনায় ভিন্ন মাত্রায় দায়িত্ব পালনের নীতির আলোকে তৈরি এবং জাতিসংঘের কর্মপদ্ধতির আওতাধীন।
এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে স্বল্পোন্নত দেশগুলো যদি তাদের জাতীয় নির্ধারিত অবদান (ন্যাশনাল ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন-এনডিসি) বাস্তবায়ন করতে চায় তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে ১.৪৮ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। জি৭৭ জোট ন্যূনতম বছরে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বছরে ২০০ বিলিয়ন ডলার দাবি করছে। তাদের দাবি অভিযোজন ও জলবায়ু ক্ষতিপূরণ বাবদ জলবায়ু তহবিল হতে হবে অনুদানভিত্তিক। কার্বন নির্গমন কমিয়ে আনা সম্পর্কিত উদ্যোগের জন্য প্রয়োজন খুবই স্বল্পসুদে তহবিল সংস্থান করা।
এবারের সম্মেলন কতটুকু সফল হবে, বাংলাদেশ ও জি৭৭ দেশগুলোর দাবি-দাওয়া কতটুকু অর্জিত হবে তা দেখার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। বিশ্ব জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে এই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। নতুন সরকার এক্ষেত্রে কতটুকু ও কী ভূমিকা পালন করে সে সম্পর্কেও সবার দৃষ্টি থাকবে। প্রধান উপদেষ্টার ‘থ্রি জিরো’ তত্ত্ব সম্মেলনে কীভাবে আলোচনায় প্রতিফলিত হয় তার প্রতি নজর থাকবে। তবে লক্ষ্য অর্জনে আশঙ্কার কালো মেঘের অভাব নেই। প্রত্যেক জলবায়ু সম্মেলনেই ধনী দেশগুলোর প্লাটফর্ম জি৭, ব্রিকস ও তেলসমৃদ্ধ ওপেক দেশগুলো প্রভাব বিস্তার করে থাকে বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো টিকিয়ে রাখার জন্য। এবারের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বের অনেক বড় বড় দেশের নেতারা অংশগ্রহণ করছেন না তাদের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো অন্যান্য প্রভাবশালী দেশগুলো রয়েছে। যা সম্মেলনের ফলাফল অর্জনে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে। তার ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যেন নতুন মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বের হয়ে আসছিলেন। এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি প্রতিশ্রুতি ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর কম বিধিনিষেধ আরোপ করা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট (নির্বাচিত) ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ গ্রহণের পর যদি আবার জলবায়ু চুক্তি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন তা হবে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়ন এবং বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের উদ্দেশ্য অর্জনের ক্ষেত্রে একটি বড় আঘাত।
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
