গাজীপুরের শিল্পকারখানাগুলোয় শ্রমিক অসন্তোষ থামছেই না। বিভিন্ন দাবি নিয়ে বারবার মহাসড়ক আটকে দিচ্ছেন শ্রমিকরা। গত তিন মাসে অন্তত ২৫ বার ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। কয়েক দিন পর পর অবরোধের কারণে অসহনীয় দুর্ভোগে পড়ছেন এসব পথে চলাচলকারী হাজারো যানবাহনের যাত্রীরা। এর প্রভাব পড়ছে ঢাকাসহ সারা দেশের জনজীবন ও অর্থনীতিতে। সর্বশেষ বকেয়া বেতন আদায় করতে গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর এলাকার বেক্সিমকো গ্রুপের শ্রমিকরা গত চারদিন ধরে চন্দ্রা-নবীনগর সড়ক অবরোধ করে রেখেছেন। গত অক্টোবর মাসের বকেয়া বেতন না পাওয়া পর্যন্ত তারা সড়ক থেকে উঠবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। সেনাবাহিনী, পুলিশ, প্রশাসন কারও কথাই শুনছেন না তারা। সম্প্রতি গাজীপুর মহানগরীর টিএনজেড পোশাক কারখানার শ্রমিকরা দেশের অন্যতম ব্যস্ততম ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক তিন দিন ধরে অবরোধ করে রাখেন। এতে কয়েক হাজার শ্রমিকের কাছে গাজীপুর-ঢাকাসহ উত্তরবঙ্গের লাখ লাখ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েন। পরে শ্রম মন্ত্রণালয়, শিল্প পুলিশ এবং বিজিএমইএর সহযোগিতায় টিএনজেড পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিএনজেড কারখানার শ্রমিকদের বকেয়া বেতন আদায়ের এই পদক্ষেপে অন্য কারখানার শ্রমিকরাও উৎসাহিত হয়েছেন। তাদের সফলতা দেখেই রাস্তায় নেমেছেন বেক্সিমকো গ্রুপের শ্রমিকরা। তাদের সড়ক অবরোধ এবং বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে ওই এলাকার অন্তত ২০টি পোশাক কারখানায়। যার কারণে কোনো সমস্যা না থাকলেও ওইসব পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদনে ধস নেমে এসেছে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ওই এলাকার একটি পোশাক কারখানা আগুন দিয়ে পুড়িয়েও দিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর গাজীপুরে গত তিন মাসে অন্তত ২৫ বার ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়ক অবরোধ করা হয়েছে। অবরোধ ছাড়াও অনেক স্থানে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছেন। তবে সেগুলো কারখানা এলাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই সময়ে জেলায় অন্তত ৪০টি কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটে বলে শিল্পপুলিশ সূত্রে জানা গেছে।শ্রমিক নেতা আরমান হোসাইন বলেন, গাজীপুরে কয়েকটি কারখানায় মূলত ঝামেলা দেখছি। তাদের পাওনাও খুব বেশি না। প্রয়োজনে ওইসব মালিকের কিছু সম্পদ বিক্রি করে হলেও পাওনা পরিশোধ করুক। মূলত শ্রমিকরা মনে করেন একমাত্র রাস্তা অবরোধ করে রাখলেই দাবি আদায় হবে। এই ধারণাটা পাল্টাতে হবে। গাজীপুরের বলাকা পরিবহনের চালক সুলতান মিয়া বলেন, গাড়ি চালাই ১০ থেকে ১২ বছর ধরে। কখনোই শান্তিমতো গাড়ি চালাতে পারলাম না। নানা কারণে শ্রমিকরা রাস্তায় নামছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করছে। এতে আমাদেরও আয় কমছে, মালিকদেরও লোকসানে পড়তে হচ্ছে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম বলেন, বেতনের দাবিতে সড়ক কেন অবরোধ করতে হবে? শ্রমিকরা ইচ্ছা করলে বিজিএমইএর ভবনে যেতে পারেন। কারখানায় আন্দোলন করতে পারেন। হাজার হাজার মানুষকে কষ্ট দিয়ে সড়ক অবরোধ করে রাখা ঠিক হচ্ছে না।
তবে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোটের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান মনে করেন, গাজীপুরে বেশির ভাগ কারখানায় বড় কর্মকর্তাদের সঙ্গে শ্রমিকদের একটা দূরত্ব ছিল। দাবির বিষয়ে কথা বলতে শ্রমিকরা সেই সময় ভয় পেতেন। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা তাদের দাবি নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন। সড়ক অবরোধ করলেই সবার টনক নড়ে, সমস্যার সমাধানও হয়। শ্রমিকরা বিজিএমইএর ভবনে গিয়েও কোনো সুরাহা পাননি। তাই বাধ্য হয়েই শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে হয়।
