অন্তর্বর্তী সরকার কত দিন থাকবে, কবে নির্বাচন দেবে এ নিয়ে মানুষের মধ্যে যেমন কৌতূহল আছে, তেমনি বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যেও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর মধ্যে নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এক-এগারোর সরকারের মতো দুই নেত্রীকে মাইনাস করার কোনো কৌশল এ সরকারের থাকতে পারে বলে আশঙ্কা আছে। আর অন্য কারণ হলো দলের প্রতি জনসমর্থন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ।
গত ৫ আগস্ট প্রবল গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।
অন্তর্বর্তী সরকার ছয়টি খাতে সংস্কারের ঘোষণা দেয়, যাতে স্বৈরশাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায় এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত হয়। গণমাধ্যমসহ আরও কয়েকটি খাতে সংস্কারের জন্য কয়েক দিন আগে আরও ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। তবে সব সংস্কার অন্তর্বর্তী সরকার করে দিয়ে যাবে, সেটা চায় না বিএনপি। দলটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে। এজন্য ‘যৌক্তিক’ সময় দিতে রাজি। পাশাপাশি বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলো নির্বাচনী রোডম্যাপ দাবি করেছে। এরই মধ্যে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ডিসেম্বরের মধ্যে রোডম্যাপের ঘোষণা না এলে আগামী মার্চ-এপ্রিল থেকে আন্দোলন কর্মসূচিতে যাবে দলটি।
নির্বাচন ও সংস্কার ইস্যুতে বিএনপি এমন মনোভাব প্রকাশের মধ্যে গত রবিবার অন্তর্বর্তী সরকারের ১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, নির্বাচনী সংস্কারের সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে খুব দ্রুত নির্বাচনের রোডম্যাপও (রূপরেখা) পাওয়া যাবে। সুযোগ দিলে প্রয়োজনীয় কিছু সংস্কার শেষে নির্বাচন দেওয়া হবে। তবে সংস্কারের জন্য নির্বাচন কয়েক মাস বিলম্বিত হতে পারে।
মঙ্গলবার আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, অতিপ্রয়োজনীয় কিছু সংস্কার করে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
যদিও এর আগে গত ১৩ নভেম্বর সংবাদ সংস্থা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সংস্কারের গতিই ঠিক করে দেবে নির্বাচন কত দ্রুত হবে।
সেপ্টেম্বর মাসে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেনাপ্রধান ওয়াক-উজ-জামান বলেছিলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণ এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে হওয়া উচিত। যদিও তার এ বক্তব্যকে নিজস্ব মতামত হিসেবে উল্লেখ করে সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, নির্বাচনের সময় নির্ভর করবে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ও তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার ওপর।
তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংস্কারের একটা ‘সীমারেখা’ টেনে দিয়েছেন মঙ্গলবার। পুলিশ প্রশাসন ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার করে দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিএনপি নির্বাচনের জন্য কেন তাড়াহুড়া করছে, জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য জনগণের গণতন্ত্র, যা এখনো ফিরে পাইনি। আমরা ২০০৮ সাল থেকে গণতন্ত্রের লড়াইয়ে নেমেছি। একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠান, নিজের ভোট নিজে না দেওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরে যাব না। নির্বাচনের জন্য কতটুকু সময় লাগবে, বলেন (অন্তর্বর্তী সরকার) না কেন?’ তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীর প্রধান বলেছেন ১৮ মাস। পরের দিনই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো, এটা সরকারের কথা না। তাহলে নির্বাচন দিতে কত সময় লাগবে, তা তো আমাদের জানাতে হবে।’
গয়েশ্বর বলছেন, ‘এক-এগারোর সময় বিরাজনীতিকরণ বা রাজনীতিবিদদের অপসারণ করা হয়েছিল। তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা সরকার সংস্কারের নামে কুসংস্কারের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। এখনো সেই সংস্কার শব্দটি ঘুরছে।’
বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকারকে অবিলম্বে একটি রোডম্যাপ দিয়ে সামনে এগোনো দরকার। যত দিন পর্যন্ত এই রোডম্যাপ দেওয়া না হবে, তত দিন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক-এগারোর মতো ‘নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার যে শঙ্কা’ তা কাটবে না।
তারা বলছেন, একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে এবং এই সহযোগিতা ‘যৌক্তিক সময়’ পর্র্যন্ত অব্যাহত থাকবে। তাই সরকারের সব কার্যক্রমের ফোকাস হওয়া উচিত নির্বাচন। নির্বাচন নিয়ে জনমনে যে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে, সেটা কাটাতে এ সরকারকে দ্রুত রোডম্যাপ দিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢোকা দরকার।
গত শনিবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে বলেছেন, ‘এ সরকারকে ব্যর্থ করে দিতে পতিত স্বৈরাচার ও তার দোসররা বসে নেই। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে জন-আকাক্সক্ষার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে বোধহয় অন্তর্বর্তী সরকার কিছু কিছু সিদ্ধান্ত, যেটা তারা ভালো মনে করছে, সেটাই হয়তো চাপিয়ে দিতে চাইছে।’
জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে ভোট প্রয়োগের অধিকার। জনগণ ভোট প্রয়োগের সুযোগ যদি না পায়, তাহলে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের অংশীদারত্বের যে সম্পর্ক, সেটা সৃষ্টি হয় না।
এরপর মঙ্গলবার এক কর্মশালায় তারেক রহমান দলের নেতাকর্মীদের প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমরা প্রায়ই বলি, ষড়যন্ত্র থেমে যায়নি। আপনারা নিশ্চয়ই গত কয়েক দিনের পত্রপত্রিকার খবর থেকে বুঝতে পারছেন। কোথাও কিছু একটা ষড়যন্ত্র চলছে।’
বিএনপি নেতৃত্ব মনে করে, এক-এগারোর সময় ক্ষমতাসীনরা দুই নেত্রীকে (বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা) মাইনাস করতে কিংস পার্টি গঠন করেছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত সেটি সফল হয়নি। এবারেও সে রকম কোনো বিষয় থাকতে পারে বলে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক মহলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিএনপি চাইছে সম্ভাব্য কিংস পার্টি গঠনের আগেই নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা হোক। রোডম্যাপ ঘোষণা হলে সব দল নির্বাচনী কার্যক্রমে ব্যস্ত হয়ে যাবে। ফলে এক-এগারোর ভয় অনেকটাই কেটে যাবে। রাজনৈতিক মহলে এটাও আলোচনায় রয়েছে, এক-এগারোর শঙ্কা থেকেই চিকিৎসার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশযাত্রা বিলম্বিত হচ্ছে।
গত ৬ আগস্ট বিএনপিপ্রধান সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদেশে তার চিকিৎসার জন্য দলের পক্ষ থেকে বারবার আবেদন জানানো হয়েছে। এখন বলা হচ্ছে, দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের জন্য তিনি শারীরিকভাবে সক্ষম নন। তার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকরা অনুমতি দিলে তিনি বিদেশে যাবেন। দলটির একটি সূত্রের তথ্যমতে, খালেদা জিয়ার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ভিসার জন্য তার ও সফরসঙ্গীদের পক্ষে আবেদনও করা হয়েছে। গত ১৭ নভেম্বর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। চিকিৎসার জন্য তিনি যেকোনো সময় যুক্তরাজ্য যেতে পারেন।’
নির্বাচন নিয়ে সরকারকে অব্যাহত চাপে রাখতে দ্বিতীয় কারণটি সম্পর্কে দলের নেতাদের মত হচ্ছে, বিএনপি বড় দল, হাজার হাজার নেতাকর্মী। ৫ আগস্টের পর সারা দেশেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। হাইকমান্ড শক্ত অবস্থান নিয়েও তৃণমূল নেতাকর্মীদের সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দলের সমর্থনে ভাটা পড়তে পারে। কারণ গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের হাতে বিএনপি নেতাকর্মীরা দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই দমন-পীড়নের সহমর্মিতার স্মৃতি রয়ে গেছে। সময় যতই অতিক্রান্ত হবে, বিএনপি নেতাকর্মীদের সামাল দিতে না পারলে মানুষের মন থেকে সেই স্মৃতি মুছে যেতে পারে। স্মৃতি মুছে যাওয়ার আগে নির্বাচন হলে বিএনপি কিছুটা হলেও সুবিধা পাবে। আবার নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হলে সব নেতাকর্মী ঝাঁপিয়ে পড়বেন, সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে দলকে শক্ত অবস্থানে নেওয়া যাবে।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করেছে বর্তমান সরকার। আওয়ামী লীগকেও নিষিদ্ধের চাপ রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের পক্ষে বিএনপি নয়। ফলে দলটির নেতারা মনে করছেন, কোনো কারণে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না এলে, তাদের সমর্থক ভোটারদের একাংশের সমর্থন বিএনপিও পাবে।
কিন্তু সরকারের দিক থেকে পরিষ্কার বক্তব্য না আসায় নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিএনপি নেতারা। গত ১১ নভেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, যে যায় লঙ্কা সেই হয় রাবণ। তারা ১০-২০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকতে চায়।’
গত আগে ১৩ নভেম্বর নোয়াখালীতে বিপ্লব ও সংহতি দিবসের আলোচনা সভায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আপনি (প্রধান উপদেষ্টা) নির্বাচনের কথা বলেন, কিন্তু নির্বাচনের কোনো ডেডলাইন দেন না। কিন্তু এটি কেন? এটা তো রহস্যজনক।’
