‘বিবাহ’ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রাপ্তবয়স্ক দুজন নারী-পুরুষের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। বৈধভাবে মানব বংশের ধারা অব্যাহত রাখার মাধ্যম। মানুষের পক্ষে নিঃসঙ্গভাবে একাকী জীবনযাপন করা কষ্টকর। তাই মহান আল্লাহ মানুষকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন এবং স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে ভালোবাসা ও মায়ায় আবদ্ধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তার নিদর্শনের মধ্যে (একটি) হলো এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন। যাতে তোমরা তার কাছে শান্তি লাভ করতে পারো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে অবশ্যই বহু নিদর্শন আছে সেই সম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তা করে।’ (সুরা রুম, আয়াত ২১) স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যেরূপ ভালোবাসা ও মায়া সৃষ্টি হয়, অনুরূপ ভালোবাসা ও মায়া পৃথিবীর অন্য কোনো দুই ব্যক্তির মধ্যে হয় না। এর মাধ্যমে প্রতিটি দাম্পত্য জীবন হয়ে ওঠে স্বর্গসুখের রাজ্য। যে দৃশ্য তাদের পরস্পরের পরিবারের সদস্যদেরও সুখী করে তোলে।
আবার এর বিপরীত পিঠেই আছে দাম্পত্যকলহ। অতঃপর নানা রটনা ও ঘটনা শেষে বিয়েবিচ্ছেদ। ‘বিচ্ছেদ’ শব্দটা শুনতেই কেমন যেন খারাপ লাগা কাজ করে। অতি মর্মান্তিক একটি শব্দ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিয়েবিচ্ছেদ যেন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিচ্ছেদ কথাটির মধ্যে কতটা যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকে, তা উপলব্ধি করার শক্তি যেন মানুষ হারিয়ে ফেলছে। বিয়েবিচ্ছেদ কখনো দুটি মানুষের মধ্যে হয় না, এর সঙ্গে জড়িত থাকে আরও অনেক মানুষের স্বপ্ন।
আমাদের দেশে ভয়াবহভাবে তালাকের হার বাড়ছে। ঢাকায় প্রতি ৪০ মিনিটে একটি করে তালাক হচ্ছে। গত বছর রাজধানীতে তালাক হয়েছে প্রতিদিন গড়ে ৩৭টি করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২২’ শীর্ষক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে দেখা গেছে, কয়েক বছর ধরেই বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিবিএস সূত্র অনুযায়ী, শুধু ঢাকা সিটি করপোরেশনে ২০১২ সালে বিয়েবিচ্ছেদের জন্য আবেদন করা হয় ৭ হাজার ৪০২টি, ২০১৩ সালে ৭ হাজার ৭০৮টি ও ২০১৪ সালে ৯ হাজার ৪৫টি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৯-এর প্রথম ১৮০ দিনে ৪ হাজার ৫০০ তালাকের আবেদন করা হয়েছিল। প্রতি এক ঘণ্টায় একটি পরিবারকে ভাঙার জন্য একটি আবেদন সিটি করপোরেশনে জমা দেওয়া হচ্ছে। ২২ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখের একটি সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুসারে, জুন থেকে অক্টোবর ২০২০ পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মাসে, বিয়েবিচ্ছেদের হার অনেক বেড়েছে। এ সময় প্রতিদিন ৩৯টি তালাক ছিল। প্রতি ৩৭ মিনিটে একটি তালাক। প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজার ১৯৪ তালাক হয়। ২০২০ সালে বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বিয়েবিচ্ছেদ ২৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
যদিও ইসলামে বিয়েবিচ্ছেদের জন্য তালাকের বিধান রয়েছে, তবু ইসলাম তালাককে জায়েজ কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজ বলে আখ্যায়িত করেছে। তাই যথাসম্ভব ওই জায়েজ ঘৃণিত কাজ থেকে বেঁচে থাকা উচিত এবং সমাজে তালাক যাতে বেশি পরিমাণে না হয়, তার চেষ্টা করা উচিত। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হালাল বিষয়গুলোর মধ্যে মহান আল্লাহর কাছে সর্বাধিক ঘৃণিত বিষয় হচ্ছে তালাক।’ (আবু দাউদ) বিয়েবিচ্ছেদ প্রতিরোধকল্পে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আরেকটি হাদিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হজরত আলী (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বিয়ে করো। কিন্তু তালাক দিয়ো না। কেননা তালাকের কারণে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে।’ হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বিশেষ অসুবিধা ছাড়া যে স্ত্রী তার স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার জন্য বেহেশতের সুঘ্রাণও হারাম হয়ে যায়।’ (তিরমিজি) অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘কোনো মুমিন স্বামী কোনো মুমিন স্ত্রীকে যেন অপছন্দ না করে। সে তার কোনো বৈশিষ্ট্যকে অপছন্দ করলেও তার অন্য বৈশিষ্ট্যে সন্তুষ্ট হবে।’ (সহিহ মুসলিম) তালাক প্রদানের বিধান শরিয়ত কর্র্তৃক অনুমোদিত হলেও চূড়ান্ত প্রয়োগের পরিবেশ তৈরি হওয়ার পূর্বপর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে মনোমালিন্য ও বিরোধ দূর করার পথ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশঙ্কা করলে তোমরা তার (স্বামীর) পরিবার থেকে একজন ও তার (স্ত্রীর) পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত করবে। তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চাইলে আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা নিসা ৩৫)
বিচ্ছেদের কারণ যাই হোক না কেন, খুব সহজেই চিন্তা করা যায়, তালাকের পরিণতি কত ভয়াবহ। এই বিয়েবিচ্ছেদ শিশুদের জীবনকে নষ্ট করে দেয়, যদি শিশু থেকে থাকে। বিয়েবিচ্ছেদের এই সংস্কৃতি একদিকে পারিবারিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, অন্যদিকে শিশুদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে। বিয়েবিচ্ছেদ একটি অসম্মানের বিষয়, যা নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটি পবিত্র বন্ধন তালাকের মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে অসম্মানিত হয়।
বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন এবং অবশ্যই এর মূল্য দিতে শিখতে হবে। ধর্মীয়, নৈতিক, সামাজিক ও আইনগতভাবে তালাকের অনুমতি থাকলেও সভ্যসমাজে অহরহ তালাক সংস্কৃতি অব্যাহত রাখা উচিত নয়। সুতরাং স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই বিচ্ছেদ এড়াতে প্রচেষ্টা করা প্রয়োজন। বিয়ের পর অন্য নারী বা পুরুষে আসক্ত হওয়া বিয়েবিচ্ছেদের অন্যতম বড় কারণ। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে পরনারী বা পরপুরুষের আসক্তি থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যথায় পরকালে এই পাপের জন্য থাকবে ভয়াবহ শাস্তি। এ ছাড়া স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, একে অন্যকে সহযোগিতা করার মনোভাব রাখতে হবে। উভয়ের ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার মনোভাব থাকতে হবে। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তর্ক করা যাবে না এবং সামান্য ভুল বোঝাবুঝি থাকলেও, নিজেকে সংযত করার জন্য ধৈর্য ধরতে হবে।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট
