জনগণের আস্থার স্বীকৃতি পেয়েছে সশস্ত্র বাহিনী

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৪, ০৫:২৩ এএম

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সশস্ত্র বাহিনী দেশের জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও পরবর্তী সময় এবং সংকটকালে সবসময় সশস্ত্র বাহিনী দেশের জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। ছাত্র-ছাত্রী এবং সাধারণ জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে সশস্ত্র বাহিনী আবারও দেশের জনগণের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা গতকাল বৃহস্পতিবার সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে সেনাকুঞ্জে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন।

এদিকে শারীরিক অসুস্থতা নিয়েই এক যুগ পর গতকাল সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তাকে সেনাকুঞ্জে পৌঁছালে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন অভ্যর্থনা জানান। প্রধান উপদেষ্টাসহ তার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আসা অতিথিরা।

অনুষ্ঠানে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান স্মরণ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে সশস্ত্র বাহিনী জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র নির্মাণ, দুর্যোগ মোকাবিলা, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং সাধারণ মানুষ এক হয়ে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে আক্রমণ চালিয়েছিল।

২১ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধের একটি মাইলফলক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সশস্ত্র বাহিনী ১৯৭১ সালের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্মলাভ করে, যেখানে সেনা, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সশস্ত্র বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা প্রশিক্ষণও প্রদান করে। ড. ইউনূস বলেন, এই বিশেষ দিনে ‘আমি গভীরভাবে স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং সব সাহসী মুক্তিযোদ্ধাকে বিশেষ করে আহত করা হয়েছিল।’

প্রধান উপদেষ্টা জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সব শহীদ এবং আহতদের স্মরণ করেন। তিনি বলেন, তাদের আত্মত্যাগ দেশ পুনর্গঠনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং জাতি চিরকাল তাদের এই ত্যাগকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ড. ইউনূস তার বক্তব্যের শুরুতেই খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া আজ এখানে আমাদের মধ্যে উপস্থিত আছেন। এক যুগ ধরে তিনি এই মহাসম্মিলনীতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাননি। আজকে সুযোগ পেয়েছেন। আমরা সবাই আনন্দিত এবং গর্বিত যে এই সুযোগ দিতে পেরেছি আপনাকে।’

ড. ইউনূস খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘শারীরিক অসুস্থতার পরও এই বিশেষ দিবসে সবার সঙ্গে শরিক হওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’ এ সময় খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তি কামনা করেন প্রধান উপদেষ্টা।

এর আগে বেলা ৩টা ৫০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে পৌঁছান বেগম জিয়া।

কারামুক্ত হওয়ার পর এই প্রথম কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ঘরের বাইরে বের হলেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় এবং শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। ফলে অনেক বছর পর আওয়ামী লীগের কোনো পর্যায়ের নেতাকে এবার সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা সম্মিলিতভাবে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণের সূচনা করেন। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে প্রতি বছর দিনটি ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে বাংলাদেশ।

যথাযোগ্য মর্যাদায় নৌ-অঞ্চলগুলোয় সশস্ত্র বাহিনী দিবস-২০২৪ উদযাপিত : যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা নৌ-অঞ্চলগুলোয় সশস্ত্র বাহিনী দিবস-২০২৪ উদযাপিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সব মসজিদগুলোয় বাদ ফজর মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী বীর শহীদদের আত্মার মাগফিরাত, দেশের সুখ ও সমৃদ্ধি, সশস্ত্র বাহিনীর উত্তরোত্তর উন্নতি ও অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। এ ছাড়া নৌবাহিনীর সব জাহাজ ও ঘাঁটিগুলোয় মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর অবদানের ওপর নির্মিত বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন এবং নৌবাহিনী স্কুল ও কলেজগুলোয় সশস্ত্র বাহিনী দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।

নৌবাহিনীর খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও নৌ-সদস্যদের শান্তিকালীন পদক প্রদান : সশস্ত্র বাহিনী দিবস-২০২৪ উদ্যাপন উপলক্ষে নৌবাহিনীর খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরাধিকারীদের সংবর্ধনা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বীরত্ব ও সাহসিকতাপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ নৌ-সদস্যদের শান্তিকালীন পদক প্রদান করা হয়। এ উপলক্ষে গতকাল নৌ সদর দপ্তরে সাগরিকা হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান সম্মাননা স্মারক ও শান্তিকালীন পদক তুলে দেন। উক্ত অনুষ্ঠানে নৌবাহিনীর খেতাবপ্রাপ্ত ২২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরাধিকারীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে বীরত্ব ও সাহসিকতাপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩ সালে ৪০ এবং ২০২৪ সালে ৩৭ জনসহ ৭৭ নৌ-সদস্যকে শান্তিকালীন পদকে ভূষিত করা হয়। শান্তিকালীন পদকপ্রাপ্তদের মধ্যে ৩ জন নৌবাহিনী পদক (এনবিপি), ১০ জন অসামান্য সেবা পদক (ওএসপি), ১০ জন বিশিষ্ট সেবা পদক (বিএসপি), ১৪ জন নৌ গৌরব পদক (এনজিপি), ২০ জন নৌ উৎকর্ষ পদক (এনইউপি) এবং ২০ জন নৌ পারদর্শিতা পদক (এনপিপি) পদকে ভূষিত হয়েছেন।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিনের পরিবারসহ পাঁচজন বীরউত্তম, আটজন বীরবিক্রম, আটজন বীরপ্রতীক মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তান এবং পরিবারের সদস্যরাসহ নৌ-সদরের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসাররা ও ঢাকা নৌ-অঞ্চলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন, ইআরএ-১-এর উত্তরাধিকারী এই অকুতোভয় বীরের পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত