মিষ্টি রোদের সকাল, চকচকে লাল একটা বল, সবুজ ঘাসে ছাওয়া মাঠে ধবধবে সাদা পোশাকের ক্রিকেট। অস্ট্রেলিয়ার গ্রীষ্মকালীন ক্রিকেট সূচি মানেই এই ছবি। পরনে আভিজাত্যের সাদা পোশাক আর মাথায় অভিজ্ঞতায় পোড়খাওয়া রংচটা ব্যাগ্রি গ্রিন, অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘ ক্রিকেট ঐতিহ্যের সবচেয়ে মূল্যবান স্মারক। পার্থে আজ থেকে শুরু হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ান গ্রীষ্মের নতুন মৌসুম, ডাউন আন্ডারে এবারের অতিথি ভারত। অস্ট্রেলিয়ার তাসমান সাগরের প্রতিবেশী কিউইরা ভারতকে তাদেরই মাটিতে টেস্ট সিরিজে হারিয়ে এসেছে ৩-০ ব্যবধানে, করেছে দর্পচূর্ণ। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলতে হলে ভারতকে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পাঁচ টেস্টের সিরিজ জিততে হবে ৪-০ ব্যবধানে। ২০১২-১৩ সালে ভারত সফরে আসা অস্ট্রেলিয়া দলকে ৪-০-তে হোয়াইটওয়াশ করে টেস্ট সিরিজ জিতেছিল মহেন্দ্র সিং ধোনির দল। রোহিত শর্মার দলকে এবারের অস্ট্রেলিয়া সফরে তেমন কিছু করে দেখাতে হবে, না হলে দর্শক হয়ে থাকতে হবে এবারের আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে।
পার্থের প্রথম টেস্টে অবশ্য রোহিত শর্মা খেলছেন না। পিতৃত্বকালীন ছুটি শেষে রোহিত ভারতীয় দলের সঙ্গে যোগ দেবেন ২৪ নভেম্বর, পার্থ টেস্টের তৃতীয় দিনে। তার জায়গায় পার্থে ভারতীয় দলের নেতৃত্বে জাসপ্রিত বুমরা। অস্ট্রেলিয়া দলেও ‘দুজন সদ্যজাত সন্তানের বাবা’ আছেন, ট্রাভিস হেড ও মিচেল মার্শ। তারা অবশ্য পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে ছিলেন না দলে, ছুটি থেকে ফিরে অনুশীলনে দুজনেই ঝালিয়ে নিয়েছেন নিজেদের। রোহিত শর্মার অবর্তমানে ইনিংসের সূচনা করবেন লোকেশ রাহুল, কোচ গৌতম গম্ভীর এমনটাই জানিয়েছেন। সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে অভিমন্যু ঈশ্বরনের নামও শোনা গিয়েছিল, এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান ভারতের ‘এ’ দলের হয়ে অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দলের বিপক্ষে খেলা দুটো চার দিনের ম্যাচের ৪ ইনিংস ৭, ১২, ০ ও ১৭ রান করায় বোধহয় তার ওপর ঠিক ভরসা করছেন না ‘গম্ভীর অ্যান্ড কোং’। অস্ট্রেলিয়াতেও নতুন একজন উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানকে দেখা যাবে, নাম তার নাথান ম্যাকসুইনি। বছর দেড়েক আগেও ম্যাকসুইনি ছিলেন প্রায় অচেনা এক ক্রিকেটার, অথচ ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রথাগত সব উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানদের বাদ দিয়ে সাউথ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ওয়ান ডাউনে ব্যাট করা ম্যাকসুইনিকেই উসমান খাজার সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছে জর্জ বেইলির নেতৃত্বাধীন নির্বাচক কমিটি, যেখানে কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডও আছেন।
গত নভেম্বরেই আহমেদাবাদের নীলসমুদ্রকে চুপ করিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছেন প্যাট কামিন্স। এবার তার সামনে বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি জয়ের হাতছানি, যেটা তার মতো আরও অনেকেরই অধরা। সংবাদ সম্মেলনে কামিন্স বললেন, ‘ড্রেসিং রুমের অর্ধেকের বেশি সদস্যই এটা (বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি) জেতেনি, আমার মনে হয় আমাদের তালিকায় আর একটা কাজ বাকি রয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে আমাদের দিকে যে চ্যালেঞ্জই ছুড়ে দেওয়া হয়েছে, আমরা সেটা উতরে গেছি। সামনে আরেকটা বছর, আরেকটা অস্ট্রেলিয়ান গ্রীষ্ম। আমাদের দেখিয়ে দিতে হবে যে, সাফল্য কেবল এক-দুই মৌসুম স্থায়ী হয়নি, অর্ধেকটা প্রজন্ম এই সাফল্য টিকে আছে।’
স্টিভ ওয়াহ বা রিকি পন্টিংয়ের অজেয় অস্ট্রেলিয়ার মতো মহিমান্বিত না হলেও প্যাট কামিন্সের দলটাও কিন্তু কম সফল নয়। সবশেষ তিন বছরে, ক্রিকেটের তিন সংস্করণেরই বিশ্বকাপ জিতেছে অস্ট্রেলিয়া। একই সঙ্গে ঘরের মাঠে ভারতকে হারানোর কৃতিত্বটাও এক দশক পর পুনরাবৃত্তি করতে পারলে আগামী প্রজন্ম নিঃসন্দেহে কামিন্স-স্টার্ক-স্মিথদের মনে রাখবে কিংবদন্তি হিসেবেই।
ভারতেও নেতৃত্বে একজন পেস বোলার-জাসপ্রিত বুমরা। কপিল দেবের পর প্রথম ফাস্ট বোলার হিসেবে তিনি ২০২১ সালে একটি টেস্টে নেতৃত্বে দিয়েছিলেন ভারতকে (বিরাট কোহলির অনুপস্থিতিতে)। আবার সেই সুযোগ প্রসঙ্গে তার মন্তব্য, ‘আমি যখন অধিনায়ক থাকি, তখনই নিজেকে সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারি। আমি টের পাই কখন আমি একদম তরতাজা আছি, কখন আমাকে আরেকটু ভালো করতে হবে, কখন আমাকে আরও বেশি করে চেষ্টা করতে হবে। অধিনায়কত্বের অনেক চ্যালেঞ্জ আছে, আবার সুবিধাও আছে। আমি সুবিধাগুলোই দেখছি। আমি বোলিংটা বুঝি, উইকেটের পরিবর্তন বুঝি। কখন কোথায় ফিল্ডার কীভাবে সেট করতে হবে সেটা বুঝি। অবশ্যই বোলাররা ব্যাটসম্যানদের চেয়ে অনেক বেশি তথ্যনির্ভর, অধিনায়কের কাজটা কঠিন, তবে চ্যালেঞ্জের মুখেই সেরাটা বের হয়ে আসে।’
বাংলাদেশ সময় সকাল ৮-২০ মিনিটে পার্থের অপ্টাস স্টেডিয়ামে শুরু হবে বোর্ডার-গাভাস্কার সিরিজের প্রথম টেস্ট। অপ্রত্যাশিতভাবেই দুদিন আগে খানিকটা বৃষ্টি হয়েছে পার্থে, মাঠকর্মীরা তাই কাক্সিক্ষত মানে নিয়ে যেতে পারেননি। যদিও প্রধান কিউরেটর আইজ্যাক ম্যাকডোনাল্ড বলেছেন, ‘ব্যাট আর বলের লড়াইয়ের একটা সুখী মধ্যবর্তী জায়গায় আছে উইকেট।’ এক লাখের বেশি দর্শক মাঠে আশা করছে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট কর্র্তৃপক্ষ। এই মাঠে সবশেষ টেস্ট ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে, তার চেয়ে ১৫০ গুণ বেড়েছে টিকিটের চাহিদা। খেলোয়াড় এবং দর্শক, সবাই মুখিয়ে আছে আগুনে এক লড়াইয়ের, যা অস্ট্রেলিয়ান গ্রীষ্মের উত্তাপকে বাড়িয়ে দেবে বহুগুণে।
