মঞ্চে-নেপথ্যে

অনামী

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২৪, ১২:০৪ এএম

১৯৪৭ সালে ছাত্রাবস্থায় তিনি ‘দৈনিক আজাদ’-এ সাংবাদিকতা শুরু করেন এবং পরে বার্তা সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালে ‘আজাদ’-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর সেই বছরই ‘ইত্তেফাক’-এর বার্তা সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৭০ সালে হন নির্বাহী সম্পাদক। ১৯৬৯-৭০ সালে ‘অনামী’ ছদ্মনামে লেখা অনবদ্য উপসম্পাদকীয় ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’ কলামে উঠে এসেছে তৎকালীন রাজনীতির তীক্ষè পর্যবেক্ষণ এবং বিচার-বিশ্লেষণ। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর তাকে শান্তিনগর, চামেলীবাগের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সৈন্য ও আলবদর-রাজাকাররা। এরপর এই সাংবাদিকের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে ছাপা হলো, পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের  জনপ্রিয় উপসম্পাদকীয় ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’

আজ আমাদের জাতীয় জীবনের একটি ক্লেদাক্ত দিন ইতিহাসের পাতায় যুগ যুগ ধরিয়া যে দিনটি বিরাজ করিবে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে। আজ হইতে এগারো বছর আগে সারা জাতি যখন গভীর ঘুমে নিমগ্ন তখনই সকলের অগোচরে এক কূটচক্রান্তের মাধ্যমে পরস্বাপহারী জেনারেল আইয়ুব খান দশ কোটি মানুষের সব অধিকার হরণ করিয়া রাতারাতি নিজেই পাকিস্তানের ভাগ্যবিধাতা বনিয়া বসিলেন। কেহ জানিল না, কেহ বুঝিল না। এগারো বছর আগে এই দিনটিতেই ঘুম হইতে জাগিয়া সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাতে জাতি প্রথম দেখিল, রাতের অন্ধকারে ন্যক্কারজনক পথে আইয়ুব তাহাদের যথাসর্বস্ব হরণ করিয়া বসিয়াছে। যে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার যোগসাজশে তিনি সেদিন জাতির স্কন্ধে সওয়ার হইলেন, বিশ দিন না যাইতেই দেখা গেল, তিনিই সর্বাগ্রে তাহার নয়া আমদানি করা পাশর্^চরের হাতে ঘায়েল হইয়াছেন।

পাকিস্তানের মানুষের সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা ছিল না, সমগ্র জাতি তাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িল। দেশের ‘ত্রাণকর্তার’ মুখোশ পরিয়া জনগণের অধিকার হরণকারী আইয়ুব সেদিন গণসংযোগের নামে দেশের উভয় অঞ্চল সফর করিলেন। ‘হুজুগে পাগলের’ মতো দেশের একশ্রেণির সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবী ‘হুজুরের’ সেবায় জানপ্রাণ নেছার করিয়া তার জয়ঢাক পিটাইতে শুরু করিলেন। সময়কালে কুচক্রীর মস্তিষ্কপ্রসূত উদ্ভট খেয়ালও জাতির ওপর চাপাইয়া দেওয়া হইল। শুরু হইল ‘মৌলিক গণতন্ত্রের’ যুগ। লজ্জায় মাথা হেঁট করিয়া জাতি দেখিল, দেশের গোটা বুদ্ধিজীবী মহলটাই যেন আত্মবিক্রয় করিয়া বসিয়াছে। যাহাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ ও সাধনার বলে পাকিস্তান দুনিয়ার মানচিত্রে স্থান পাইয়াছিল, সেই দেশবরেণ্য নেতৃবৃন্দকে যিনি ‘এবডো’ করিয়া রাজনীতি হইতে নির্বাসন দিলেন, হাজার হাজার নেতা ও কর্মীকে কারাগারে আটক করিয়া কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করিলেন, অসংখ্য পরিবারকে রিক্ত নিঃসম্বল করিয়া পথের কাঙালে পরিণত করিলেন, সেই বিবেকহীন ক্ষমতালোভী মানুষটির লালসার অগ্নিতে ঘৃত জোগাইয়া এ দেশের একশ্রেণির মানুষ সেদিন নিজেদের ভাগ্য গড়িল আর অত্যাচার নির্যাতনের স্টিম রোলারের নিচে চাপা পড়িয়া সমগ্র জাতি গুমরিয়া মরিতে লাগিল! যেমন সামরিক শাসন যুগে, তেমনি ’৬২-র শাসনতন্ত্রের যুগে ‘প্রভু’র পাশে  ‘সেবাদাসের’ও অভাব হইল না।

জনগণের কণ্ঠ স্তব্ধ করিবার জন্য সংবাদপত্র জগতের ‘মস্তিষ্ক ধোলাই’ এবং তাহা সম্ভব না হইলে পত্রিকার কণ্ঠরোধের অভিনব ব্যবস্থাবলিও দেশবাসীর অজানা নাই। দেশের ১৪টি পত্রিকার বিলুপ্তি, কোনটি আবার ছলে-বলে- কৌশলে কুক্ষিগতকরণ এবং কোনোটির প্রকাশনা বৎসরের পর বৎসর বন্ধ রাখা, জামানত তলব, সম্পাদক ও সাংবাদিকের গ্রেপ্তার, শিল্পপতিমহলের টাকায় রাতারাতি ট্রাস্ট গঠন করিয়া তল্পিবাহক পত্রিকাগোষ্ঠী সৃষ্টি করিয়া আজীবন ক্ষমতায় বহাল থাকার দুর্মর সাধ ও সাধনারও তাদের অন্ত ছিল না। আজ মনে পড়ে একটি দিনের কথা, যেদিন আমাদেরই কয়েকজনকে তিনি শুনাইয়াছিলেন যে, ইত্তেফাকের সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মচারীর সন্তান-সন্ততির মঙ্গলার্থেই তিনি ইত্তেফাকের প্রকাশ বন্ধ করিয়াছেন। ‘অকৃতজ্ঞ’ বাঙালিদের উপর নিজের ‘গোস্সা’ জাহির করিতেও সেদিন তিনি কম করেন নাই। ‘আজ স্বীকার না করলে কী হবে, একদিন বাঙালিদের স্বীকার করতেই হবে যে, গভর্নর হিসেবে মোনায়েম খাঁ তাদের মঙ্গলের জন্য কী করেছেন’-এ কথাটিও তিনি বেশ প্রত্যয়ের সহিতই আমাদিগকে শুনাইয়াছিলেন। আজ ভাবি, বাঙালিরা সত্যিই অকৃতজ্ঞ তাহা না হইলে...। আইয়ুবের দীর্ঘ দশ বৎসরব্যাপী শাসনামলে কেবল বাংলার নিরীহ মানুষের উপরই নয়, বেলুচিস্তান, সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশের মানুষের উপরও সমানে অত্যাচার নির্যাতন চলিয়াছে।

‘অস্ত্রের ভাষা’, ‘আগরতলা ষড়যন্ত্রের মামলা’র কথা নাই-বা বলিলাম। ‘দেশ উদ্ধারের’ নামে ক্ষমতা দখল করিয়া আইয়ুবের ব্যক্তিগত লোভ-লালসা চরিতার্থ করার সে জঘন্য কারসাজিতে শরিক ছিলেন এদেশের বহু ‘কীর্তিমান’ পুরুষের দল, যাদের চেহারা কাহারও অজানা নয়। দেশসেবার নামে  ‘গৌরী সেনের’ টাকার বেধড়ক লুটতরাজ ও ভাগ্য গড়ার জোয়ারে গা ভাসাইয়া সরকারি প্রশাসনযন্ত্রের ভেতরে ও বাহিরে ‘নমস্য’ হইয়াছেন এদেশের কত না আমলা। ওয়ার্কস প্রোগ্রামের নামে কোটি কোটি টাকা ‘হরির লুট’ করিয়া দুর্নীতির পাহাড় রচিত হইয়াছে জীবনের সর্বস্তরে। চরিত্র বিনষ্ট করিয়া জাগ্রত জাতিকে এমন করিয়া পঙ্গু করার চেষ্টার দ্বিতীয় নজির আর কোথাও আছে কিনা জানি না। জাতির সর্বস্ব অপহরণকারী আইয়ুব-মোনেমের শাসনামলে স্তাবকের অভাব অবশ্য ছিল না। রাজা ক্যাডিউটের স্তাবক দলও এ দেশের এই স্তাবকগোষ্ঠীর কাছে নিঃসন্দেহে হার মানিয়াছে। আর সে স্তাবকতার ধরন-ধারণে ক্যাডিউটের স্তাবকেরা লজ্জায় হয়তো অধোবদনও হইয়াছে। স্তাবকঘেরা আইয়ুবের শাসনামলে ’৬২-এর জানুয়ারিতে দেশবরেণ্য সংগ্রামী নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করিয়াই সম্ভবত আইয়ুব তাহার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করিয়াছিলেন। আর সেই কারণেই পদ্মা-মেঘনা-যমুনার কূলে কূলে সেদিন যে উত্তাল তরঙ্গ বারবার আছাড় খাইয়া পড়িয়াছে, তাহারই প্রচ- আঘাতে স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতার আসন হইতে ছিটকাইয়া পড়িতে হইয়াছে। স্তাবকতায় বিশ্বাসী মানুষ কোন স্তরে নামিতে পারে এবং স্তাবকতা মানুষের জীবনে কী বিপর্যয়ই-বা ডাকিয়া আনিতে পারে আইয়ুব-মোনেমরা তারই জ¦লন্ত প্রমাণ।

আজ আইয়ুব গিয়াছে, মোনেম গিয়াছে, স্তাবকের দলও আজ অন্ধবিবরে মুখ লুকাইয়াছে। কিন্তু স্তাবকঘেরা সেই স্বৈরাচারী শক্তির অক্টোপাস হইতে মুক্তি পাইতে বিগত দশ বৎসরে এদেশের অগণিত মানুষকে গোলাগুলির মুখে প্রাণ দিতে হইয়াছে। বিগত বৎসরের শেষভাগে দেশের দুই অঞ্চলে যে প্রচ- গণবিস্ফোরণ ঘটিল তাহাতে আইয়ুব-মোনেমচক্র বিতাড়িত হইল বটে, কিন্তু অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছিবার পূর্বে সে আন্দোলন কেন বিপথে চলিয়া গেল, কাহার ইঙ্গিতে, কাহার আহ্বানে দেশের এখানে সেখানে আগুন জ্বলিল, অসংখ্য ‘গরুচোর’ (?) নিহত হইল, তাহা আজ ভাবিয়া দেখিতে হইবে। সেদিনকার সে প্রচ- গণ-আন্দোলনের মুখে অফিস আদালতে ‘ঘেরাও’ ও থানা ‘চড়াও’র ডামাডোলের মধ্যে প্রদেশের এখানে সেখানে ‘গরুচোর’ (?) হত্যার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয় নাই সত্য, কিন্তু সরকারের অপ্রকাশিত হিসাবে তাহাদের সংখ্যা নাকি ৭ শতেরও উপরে। দেশব্যাপী সেই গণ-আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণও এখানেই নিহিত। দেশে এখন সামরিক শাসন বিরাজিত। ক্ষমতাসীন সরকার দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সংকল্প ঘোষণা করিয়া শান্তিপূর্ণ পথে ক্ষমতা হস্তান্তরে সাহায্য করার জন্য ‘নৈরাজ্য অভিলাষী’ শক্তির অশুভ চক্রান্ত হইতে জনসাধারণকে হুঁশিয়ার থাকার আহ্বান জানাইয়াছেন। এ কথা সর্বজনবিদিত যে, বিশৃঙ্খলা বা নৈরাজ্য সৃষ্টির মধ্য দিয়া গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক অধিকার কখনও ফিরাইয়া পাওয়া যায় না। বিগত গণ-আন্দোলনের ব্যর্থতার পিছনে আইয়ুব-মোনেম চক্রের ‘পোড়ামাটি’ নীতি অশুভ উসকানি যে ছিল না এবং তাহাদেরই ইঙ্গিতে নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের গণতন্ত্রসম্মত কামনা-বাসনাকে যে বানচাল করা হয় নাই, তাহাই-বা কে বলিতে পারে!

‘নির্বাচনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান নয়’ বলিয়া আজ যাহারা চিৎকার করিয়া ফিরিতেছেন, তাহাদের উদ্দেশ্য বুঝিতে কাহারও কষ্ট হওয়ার কথা নহে। ‘নৈরাজ্যের পথে মুক্তি’ এ স্লোগানে এ দেশের মানুষ বিশ্বাসী নহে। স্বভাবতই ‘নক্সালবাড়ি’ যেমন কোনো দেশপ্রেমিক পাকিস্তানির বাড়ি হইতে পারে না, তেমনি  ‘জ্যোতি বসুর চ্যালার’ খাতায় নাম লিখাইয়া ছককাটা সমাজতন্ত্রের আরাধনা করিতেও তাহারা রাজি নহে। গণতান্ত্রিক পথের অভিযাত্রী হিসেবে বাধিত লক্ষ্যই তাহাদের একমাত্র কামনা ও বাসনা। তাই এগারো বছর আগের ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবসের’ সেই অশুভ ক্ষণের স্মরণমুহূর্তে দাঁড়াইয়া সকল গণস্বার্থবিরোধী শক্তি ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়ানোই হউক এদেশের মানুষের জীবনব্রত। এ কথা অবশ্য অনস্বীকার্য যে, পার্লামেন্টারি শাসনের নামে সে আমলের রাজনীতিতে ‘প্যালেস ক্লিকের’ ভূমিকার পটভূমিতে আইয়ুবের ক্ষমতায় আবির্ভাব প্রথম পর্বে সাধারণভাবে অভিনন্দিতই হইয়াছিল এবং নিয়ত ভাঙা-গড়ার রাজ্যে স্থিতিশীলতা ফিরাইয়া আনিবার যে ওয়াদা দিয়া তিনি যাত্রারম্ভ করিয়াছিলেন, তাহাতে অনেকের মনে জাতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাও যে না জাগিয়াছিল, তাহাও নহে। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে বল্লাহীন রকমে ক্ষমতাপ্রিয় হইয়া উঠিয়া আইয়ুব সমগ্র জাতিকেই যে কেবল আশাহত করিয়াছেন, তাহাই নহে, বরং নিজের সীমাহীন লালসা চরিতার্থ করিতে গিয়া নিজের সঙ্গে সঙ্গে দেশেরও তিনি ভরাডুবি ঘটাইয়া গিয়াছেন। কেবল ‘অহম’ দর্শনে বিশ্বাসী হইয়া স্তাবকদলের উপর নির্ভর করিয়াই তিনি যে সকলের সঙ্গে সঙ্গে নিজেরও ভাগ্যবিপর্যয় ঘটাইয়াছেন, এ কথা তিনি নিজেও হয়তো আজ আর অস্বীকার করিতে পারিবেন না।

আইয়ুবের শাসন হইতে দেশবাসীর যথেষ্ট শিক্ষাও যে না হইয়াছে তাহাও নহে। এ শিক্ষার হয়তো-বা প্রয়োজন ছিল। সে স্বৈরাচারী শাসন হইতে জাতি যে শিক্ষা পাইয়াছে, তাহাতে আগামী দিনে চলার পথে দেশের রাষ্ট্রনায়ক হইতে শুরু করিয়া সকল মানুষই হয়তো-বা মঙ্গলময় পথপরিক্রমারই প্রেরণা পাইবে। মতিবিভ্রম, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, লোভ-লালসা, জনগণে অবিশ্বাস ও ক্ষমতার দাপট দেশকে কোথায় লইয়া যাইতে পারে, আইয়ুবের ডিকেডি শাসন উহারই এক জলজ্যান্ত নজির। এ নজিরের পুনরাবৃত্তি কোনো দেশপ্রেমিকেরই কাম্য হইতে পারে না, এ কথা বলাই বাহুল্য। (ঈষৎ সংক্ষেপিত)

লেখক: সিরাজুদ্দীন হোসেন

নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক

অক্টোবর ৮, ১৯৬৯

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত