কৃত্রিম বৃষ্টি কি কমাবে বায়ুদূষণ

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৪:৩৬ এএম

শুষ্ক শীত মৌসুমে বায়ুদূষণ অতি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। কৃত্রিম বৃষ্টি কি কমাতে পারে এ দূষণ? লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ভারতে বায়ুদূষণ চলতি সপ্তাহে বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে। বিশেষত ভারতের রাজধানী দিল্লিতে এ সংকট তীব্র হয়েছে। যার ফলে দেশটির ওই রাজ্যের কর্মকর্তারা চলাচল সীমিত করেছে এবং বিষাক্ত ধোঁয়া দূর করার জন্য কৃত্রিম বৃষ্টির পরিকল্পনা তারা পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সপ্তাহে দিল্লি কর্র্তৃপক্ষ স্কুল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। ব্যবসা এবং অফিস অর্ধেক সক্ষমতায় চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়। দিল্লির বিষাক্ত ধোঁয়া সাধারণত প্রতি শীতকালে উদ্ভূত হয় এবং ৩৩ মিলিয়ন মানুষের রাজধানী শহরকে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত এলাকায় পরিণত করে। গত বুধবার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময়, দিল্লির পরিবেশমন্ত্রী গোপাল রাই বলেন, দিল্লি সরকার ধোঁয়া দূর করতে কৃত্রিম বৃষ্টিকে উৎপাদনের টি জরুরি পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত ছিল, তবে কেন্দ্র থেকে অনুমোদন পেতে দেরি হচ্ছে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক পরামর্শ দিচ্ছে, শুধু একক দেশ হিসেবে বায়ুদূষণ কমানোর উদ্যোগ নিলে হবে না। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ মিলে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ বায়ুকে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারে। এককভাবে কোনো দেশ নিজেকে দূষণমুক্ত করলে, অন্য দেশের ক্ষতিকর পদার্থ বাতাসের মাধ্যমে ঠিকই আবার ছড়িয়ে পড়বে।

জটিলতায় দিল্লি

দিল্লি সরকারে রয়েছে আম আদমি পার্টি (এএপি)। তারা আবার ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরোধী। যে কারণে দিল্লির পরিবেশমন্ত্রী গত সপ্তাহে বেশ কয়েকটি বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ভারতের পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দর যাদবকে তাদের সংকট বিষয়ে নীরব থাকার জন্য দায়ী করেছেন। রাই বলেন, তিনি গত মাসে চারবার যাদবকে একটি ক্লাউড-সিডিং পরীক্ষার জন্য ছাড়পত্র চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ধোঁয়া পরিষ্কারের জন্য কৃত্রিম বৃষ্টি সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করবে। গত বছর থেকে তাদের সরকার উত্তর প্রদেশের কানপুরের অভিজাত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির বিজ্ঞানীদের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করেছে। ওই মন্ত্রী বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার এভাবে চুপ থাকতে পারে না। কৃত্রিম বৃষ্টি এখন দিল্লির জরুরি প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা ক্লাউড সিডিং নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন, এ পদ্ধতি জটিল, যা কিছু ক্ষেত্রে বৃষ্টিপাত বাড়াতে কাজ করে। কেউ কেউ বলেছেন, এটি খুব পরীক্ষামূলক এবং দূষণের মূল কারণ দূর করতে ব্যর্থ হয়েছে।

কৃত্রিম বৃষ্টি ও অন্যান্য

সাধারণত ক্লাউড সিডিং ভূমি থেকে উৎক্ষেপণ বা বিমানের সাহায্যে মেঘে সাধারণত সিলভার আয়োডাইড বা সাধারণ লবণ ছড়িয়ে তৈরি করা হয়। যা কৃত্রিম বৃষ্টি হিসেবে পৃথিবীর পৃষ্ঠে ফিরে আসে। ক্লাউড সিডিং কার্যকর কিনা তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো মতৈক্য নেই। পুনের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল ম্যানেজমেন্টের বায়ুমানের পূর্বাভাসকারী শচীন ঘুডে, দিল্লিভিত্তিক সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, দিল্লির পরিকল্পনা দূষণের মূল কারণ এবং ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক বিজ্ঞানী পরিবেশের ওপর সিলভার আয়োডাইডের প্রভাব নিয়েও উদ্বিগ্ন। তবে চীনের মতো দেশে নিয়মিত বৃষ্টির জন্য বা বৃষ্টিপাত এড়াতে মেঘের বীজ (ক্লাউড সিড) ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ২০০৮ অলিম্পিকের সময় আয়োজকরা আকাশে এক হাজারেরও বেশি রকেট নিক্ষেপ করে, যাতে মেঘ বা বৃষ্টি না হয়। ভারতে ১৯৫০ সাল থেকে ক্লাউড সিডিং পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। ২০০৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্য ক্লাউড সিডিং পদ্ধতি অবলম্বন করে। কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রকল্পটি ১৪ থেকে ৪৫ শতাংশ বৃষ্টিপাত বাড়িয়েছিল। কয়েক বছর আগে ভারত সরকার ভারত স্টেজ এমিশন স্ট্যান্ডার্ডস চালু করে, যা মোটরগাড়িসহ ইগনিশন ইঞ্জিন থেকে বায়ুদূষক নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করে। তারা পরে অসংগতিপূর্ণ ইঞ্জিন বা গাড়ির বিক্রয় এবং নিবন্ধন সীমাবদ্ধ করে। ১০০ শহরকে লক্ষ্য করে ২০১৯ সালে ন্যাশনাল ক্লিন এয়ার প্রোগ্রামও চালু করে দেশটি। যার লক্ষ্য ছিল নিরীক্ষণের উন্নতির মাধ্যমে ২০২৬ সালের মধ্যে নির্বাচিত স্থানে বায়ুর গুণমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা।

বাংলাদেশে

বিশ্বব্যাংক চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশের বায়ুদূষণ পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রতিবেদনে বলেছে, গত এক দশকে বাংলাদেশে বায়ুদূষণ বেড়েছে। বাংলাদেশের বাতাসে অতিক্ষুদ্র ও ক্ষতিকর উপাদানের বার্ষিক গড় মাত্রা সারা দেশে প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে মাইক্রোগ্রামে ৬০ থেকে ১০০ এবং ঢাকায় ৯০ থেকে ১০০। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়ুর গুণমান নির্দেশিকা থেকে অনেক ওপরে। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত শুষ্ক মাসে এগুলো এমনকি বার্ষিক গড় থেকে দুই বা তিনগুণ বেশি হতে পারে। বিশ্বব্যাংক জানাচ্ছে, বাতাসে সবচেয়ে ক্ষতিকর দূষণকারী ফাইন পার্টিকুলেট ম্যাটার মানুষের চুলের প্রস্থের চেয়ে অনেক ছোট মাইক্রোস্কোপিক পদার্থ। যা সহজে ফুসফুসের গভীরে এবং রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে মারাত্মক রোগ যেমন হৃদরোগ এবং ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করে। ঢাকার বাতাসে শ্বাস নেওয়ার অর্থ প্রতিদিন প্রায় দুটি সিগারেট খাওয়ার সমান। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্টাল অ্যানালাইসিস ২০২৩ অনুসারে, আশপাশ এবং গৃহস্থালী বায়ুদূষণ স্বাস্থ্যের ওপর সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। যার ফলে দেশে বছরে দেড় লাখের বেশি অকাল মৃত্যু হয় এবং আড়াই বিলিয়নেরও বেশি দিন অসুস্থতায় ভুগতে হয় বাংলাদেশের মানুষদের। সব অকাল মৃত্যুর ৫৫ শতাংশ প্রধানত পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।

বিশ্বব্যাংক জানাচ্ছে, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রথমে দূষণ নির্গমনের প্রধান উৎসগুলো খুঁজতে হবে। যদিও ইটভাটা এবং রাস্তার যানবাহনের মতো সাধারণ নির্গমন উৎসগুলো সুপরিচিত এবং নথিভুক্ত। তবে সম্প্রতি দেখা গেছে, গৃহস্থালী কার্যকলাপ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বর্জ্য পোড়ানোর কারণে বায়ুদূষিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৭৪ দশমিক দুই শতাংশ রান্নায় জ্বালানি হিসেবে কাটা কাঠ, খড়, শুকনো গোবর ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। এর দুই-তৃতীয়াংশই ঘরের ভেতরে রান্না করা হয়। এ ছাড়া উচ্চ সালফার জ্বালানি ও তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বায়ুর গুণমান খারাপ হওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। এ ছাড়া পৌরসভার কঠিন বর্জ্য খোলা বাতাসে পোড়ানোর ফলেও বায়ুদূষণ বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, এসবের সমাধান দরকার। এ সংকট মোকাবিলার জন্য সমাজের সব ক্ষেত্র থেকে একটি সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টা প্রয়োজন এবং নিঃসরণ কমানো ও বায়ুর গুণমান উন্নত করার লক্ষ্যে ব্যাপক নীতি সংস্কার প্রয়োজন। তারা বলেছে, বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি বায়ুর মান উন্নত করার জন্য গৃহীত কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ন্যাশনাল এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান ২০২৪-২০৩০ অনুমোদন দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। যা বায়ুর গুণমান নিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে দেশে মারাত্মক বায়ুদূষণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি বিস্তৃত কাঠামো প্রদান করবে।

এক দেশের সংকট নয়

নয়াদিল্লির আশপাশে বায়ুর গুণমানের এই হ্রাস প্রতি বছর শীতের আগের মাসগুলোতে ঘটে। প্রতি নভেম্বরে উত্তর-পশ্চিম ভারতের কৃষকরা পরবর্তী ফসলের জন্য জমি পরিষ্কার করতে ধান কাটার পরে অতিরিক্ত খড় পুড়িয়ে ফেলে, এটি তাদের একটি অভ্যাস। যার মাধ্যমে দেশের বৃহত্তম শহর নয়াদিল্লিসহ ওই অঞ্চলে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। গত বছর মরগান স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং নাসার বিজ্ঞানী হিরেন জেথভা বলেন, ধোঁয়া বঙ্গোপসাগরে ছড়িয়ে পড়ছে। তার বক্তব্য, দিল্লির ধোঁয়া আশপাশের বায়ুর মানে সমস্যা তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। গত কয়েক বছরে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, নয়াদিল্লির মতো নভেম্বরের শুরুতে লাহোর, করাচিতে বিষাক্ত বাতাসের ঘনত্ব গ্রাস করতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সমস্যাটি আরও খারাপ হচ্ছে। বিশেষ করে পাঞ্জাবে সরকারকে ব্যবসা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, স্কুল এবং এমনকি হাইওয়ে বন্ধ করতে বাধ্য করে। এমন ধোঁয়ার সংমিশ্রণে শত শত মানুষ গলাব্যথায় ভোগে, তাদের চোখ চুলকায়। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, এক দশক আগ পর্যন্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোর ছিল একমাত্র শহর, যেখানে এই ধোঁয়ার সমস্যার দেখা দেয়। এখন যা প্রায় পুরো প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ক্রমে করাচিকেও গ্রাস করে এ ধোঁয়া। গত বছর আগস্টে প্রকাশিত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের একটি প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, বায়ুদূষণ বৃদ্ধির ফলে লাহোর, পেশোয়ার, কাসুর এবং শেখুপুরা জেলার বাসিন্দাদের আয়ু কমপক্ষে সাত বছর কমতে পারে। এতে শিশুর ওপর ধোঁয়ার বিরূপ প্রভাব তুলে ধরে বলা হয়, দূষণের বর্তমান স্তরের সংস্পর্শে আসা দিনে ৩০টি সিগারেট পানের সমান। বায়ুদূষণ ছড়িয়ে পড়া নিয়ে আবার পাল্টাপাল্টি দোষারোপের ঘটনাও আছে। ধোঁয়া এবং বায়ুদূষণকারী পদার্থ ভারতের পাঞ্জাবের জলন্ধর থেকে লাহোরে প্রবেশ করেছে বলে পাকিস্তানের অভিযোগ। আবার কয়েক বছর আগের সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দিল্লিতে বিপজ্জনক বায়ুদূষণের জন্য পাকিস্তান ও চীন দায়ী।

বিশ্বব্যাংক বলছে, বায়ুদূষণ কোনো সীমানা জানে না। যার অর্থ হলো, একটি একক দেশ এর সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং পাকিস্তান একটি সাধারণ আকাশপথ ভাগ করে, যা ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমিতে বিস্তৃত। এই বিস্তৃত আকাশে বাতাসের মাধ্যমে কণা স্থানান্তরিত হয়। এমনকি যদি একটি দেশ তার অভ্যন্তরীণ বায়ু পরিচ্ছন্ন রাখে, তাহলেও প্রতিবেশী দেশের ক্ষতিকর কণা বাতাস দূষিত করেন তুলতে পারে। তাই সমষ্টিগতভাবে সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন স্তরে সংলাপের মাধ্যমে শক্তিশালী আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রয়োজন। আশার কথা, বাংলাদেশ সরকারের এই প্রতিশ্রুতির ওপর জোর দিয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীদেরও একটি বড় ভূমিকা পালন করতে হবে এবং বিশ্বব্যাংক এই গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডায় বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা করতে প্রস্তুত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত