প্রফেসর ডা. মো. ইয়াকুব আলী
বিভাগীয় প্রধান
ডিপার্টমেন্ট অব মেডিকেল অনকোলজি
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
নভেম্বর মাস ক্যানসার সচেতনতার মাস।
পৃথিবী জুড়ে ক্যানসার অনেক বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪৫৮ জন নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ক্যানসারে প্রতিদিন গড়ে মারা যাচ্ছে ৩১৯ জন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রোগের প্রকোপের তুলনায় দেশে চিকিৎসাব্যবস্থা অপ্রতুল।
কমপক্ষে ৩২ ধরনের ক্যানসারে এ দেশের মানুষ আক্রান্ত হন বলে তথ্য দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ক্যানসার দীর্ঘস্থায়ী রোগ। এ রোগের চিকিৎসা চলে দীর্ঘদিন। ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি । বাংলাদেশে খাদ্যনালির (গলবিল থেকে খাদ্যনালি পর্যন্ত) ক্যানসার সবচেয়ে বেশি। দেশে প্রধান পাঁচটি ক্যানসারের মধ্যে আছে খাদ্যনালি, ঠোঁট ও মুখ, ফুসফুস, স্তন ও জরায়ু ক্যানসার। পুরুষের ক্ষেত্রে খাদ্যনালির ক্যানসার বেশি, আর নারীর ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসার বেশি। তবে মৃত্যু বেশি হচ্ছে খাদ্যনালির ক্যানসারে।
গ্যাস্ট্রিক বা পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। শুরুতে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। যার ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় কঠিন হয়। ক্যানসার সেলস পাকস্থলীতে বা এর আস্তরণের কোষে বাড়ে। দ্রুত ক্যানসার কোষ ছড়িয়ে পড়ে। পুরুষরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়।
ধরন
পাকস্থলীর যেকোনো অংশে ক্যানসার হয়। হজম হওয়া খাবার বহনকারী টিউবের যে অংশ পাকস্থলীর সঙ্গে সংযুক্ত হয়, যাকে গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল জাংশন বলে। এই গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল জাংশনে ক্যানসার হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্যানসার পাকস্থলীর বডিতে হয়। শুরুতে লক্ষণ না থাকলেও বদহজম ও পেটের ওপরের অংশে ব্যথা হতে পারে। এ ছাড়াও পেটে ব্যথা, দীর্ঘসময় অ্যাসিডিটি বা বদহজম হওয়া। বমি বমি ভাব, ক্ষুধা না লাগা। দ্রুত ওজন কমা। খাবার গিলতে অসুবিধা এবং খাওয়ার পরে দ্রুত পেট ফুলে যাওয়া। ক্লান্তি লাগা। কালচে মল বা মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া। রক্ত বমি করা ইত্যাদি।
কেন হয়
হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি ব্যাকটেরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণকে এই ক্যানসারের প্রধান কারণ ধরা হয়। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস যেমন লবণযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া, পাশাপাশি ফল ও শাকসবজি কম খেলেও স্টোমাক ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে তামাক, ধূমপান, অ্যালকোহল থেকেও কিন্তু এই ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পরিবারে কারও পাকস্থলীর ক্যানসার হয়েছিল এমন ব্যক্তিদের এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের এ ক্যানসার হতে পারে।
রোগ নির্ণয়
ক্যানসারের ধরন এবং কোন পর্যায়ে আছে তার ওপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চিকিৎসা দেন। পাকস্থলীর ক্যানসার নির্ণয়ের জন্য এন্ডোস্কপি, বায়োপসি, ইমেজিং পরীক্ষা করা হয়।
চিকিৎসা
চিকিৎসা নির্ভর করে ক্যানসারের স্টেজ, কোথায় ক্যানসার সেল আছে, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা নির্ণয়ের ওপর। সবচেয়ে সহজ ও সাধারণ চিকিৎসা হলো টিউমার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা। ক্যানসারের স্টেজ ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে পাকস্থলীর একটি অংশ অপসারণ বা পুরো পাকস্থলী অপসারণ করা হয়। বিকল্প হিসেবে অন্ত্রের একটি অংশ নিয়ে খাদ্যনালির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।
ক্যানসার কোষগুলো মেরে ফেলার জন্য কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। এটি অস্ত্রোপচারের আগে নিওঅ্যাডজুভেন্ট কিংবা অস্ত্রোপচারের পরে অ্যাডজুভেন্ট থেরাপি হিসেবে বা অ্যাডভান্সড বা মেটাস্ট্যাটিক ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। রেডিয়েশন থেরাপিও দেওয়া হয়। ক্যানসার কোষকে লক্ষ্য করে হাই বীম রে ব্যবহার করা হয়। এটি সার্জারির আগে ও পরে বা কেমোথেরাপির সংমিশ্রণে ব্যবহার করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ক্যানসার কোষকে দমন করে এমন স্পেসিফিক ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ওষুধগুলো ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট অণুর সঙ্গে বিক্রিয়া করে সেই কোষ ধ্বংসের কাজ করে। ক্যানসার যেন ছড়িয়ে না যায় সেটাও নিশ্চিত করে।
