এরপর কী হবে নেতানিয়াহুর

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪, ০৩:৩১ এএম

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে জারি হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। ১২৪টি দেশ তাকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য। বিস্তারিত লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার প্রাক্তন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরোয়ানার আইনি ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক। যার ফলে রোম সন্ধির আওতায় ১২৪টি রাষ্ট্র এখন নেতানিয়াহু এবং গ্যালান্টকে গ্রেপ্তার করার বাধ্যবাধকতার অধীনে। রোম সন্ধিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে সব ইইউ সদস্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে জর্দান, তিউনিসিয়া এবং ফিলিস্তিন এতে অন্তর্ভুক্ত। তবে অন্যান্য রাষ্ট্র বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত এবং রাশিয়া এতে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। তুরস্ক এবং সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশও আইসিসিকে স্বীকৃতি দেয় না। রায় ঘোষণার পর বেশ কয়েকটি দেশ আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখার অভিপ্রায় ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, জর্দান, বেলজিয়াম এবং আয়ারল্যান্ড। 

গত বৃহস্পতিবার এ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। যা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক কোনো দেশের নেতার বিরুদ্ধে প্রথম গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। আইসিসি জানিয়েছে, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের জন্য এ দুজনকে দায়ী করার যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। দুজনের প্রত্যেকে অন্যদের সঙ্গে মিলে যৌথভাবে যুদ্ধের পদ্ধতি হিসেবে ক্ষুধার ব্যবহার এবং হত্যা, নিপীড়ন ও অন্যান্য অমানবিক কাজের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। তবে আন্তর্জাতিক আদালতের এই পদক্ষেপকে ইহুদিবিদ্বেষী বলে মন্তব্য করেছেন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগকে ‘অযৌক্তিক’ এবং ‘মিথ্যা’ উল্লেখ করে তা প্রত্যাখ্যানও করেন তিনি।

লিডেন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক গিউলিয়া পিনজাউটি মিডলইস্ট আইকে বলেন, এটি একটি অবিশ্বাস্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। রাষ্ট্রপক্ষের আদালতকে সহযোগিতা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং তা করা উচিত। আদালতের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। সম্ভবত নেতানিয়াহু এবং গ্যালান্ট এই ১২৪ দেশ এড়িয়ে যাবেন। যেমন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন তার বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর এমন নীতি অনুসরণ করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০২ সালে। নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত এই আন্তর্জাতিক আদালতের উদ্দেশ্য ছিল গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের মতো নৃশংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা। তবে এটি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) থেকে আলাদা।

অপরাধ

আলজাজিরায় কলামিস্ট বেলেন ফার্নান্দেজ লিখেছেন, নেতানিয়াহু এবং গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে যে ‘কমপক্ষে ৮ অক্টোবর ২০২৩ থেকে ২০ মে ২০২৪ পর্যন্ত উভয় ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এবং জ্ঞাতসারে গাজার বেসামরিক জনগণকে তাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য বস্তু থেকে বঞ্চিত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে খাদ্য, পানি, ওষুধ এবং চিকিৎসা সরবরাহের পাশাপাশি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ’। শেষের তারিখটি সেই দিনটিকে নির্দেশ করে যেদিন আইসিসির প্রসিকিউটর গ্রেপ্তারি পরোয়ানার জন্য আবেদন করেন। যার অর্থ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধ গত ছয় মাসে হ্রাস পেয়েছে এমন নয়। আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় প্রায় ৪৫ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, যদিও প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা নিঃসন্দেহে বহুগুণ বেশি।  জাতিসংঘের একটি কমিটি সম্প্রতি গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের যুদ্ধের পদ্ধতিগুলোকে ‘গণহত্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে খুঁজে পেয়েছে।

তবে যেহেতু নেতানিয়াহু নিজেই এখন ইসরায়েলের ক্ষমতায়। ফলে তিনি নিজে গিয়ে আদালতে ধরা দেবেন না, এটা নিশ্চিত। তিনি এ রায়কেই নাকচ করে দিয়েছেন। যদি ইসরায়েলে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে, তাহলে তারা এ দুজনকে হেগে হস্তান্তর করতে পারে। কারণ দেশটি রোম সন্ধির অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে যেসব দেশ বা অঞ্চল রোম সন্ধির সদস্য নয়, তারা সন্দেহভাজনদের আত্মসমর্পণ করাতে, তাদের অঞ্চলে প্রবেশে বাধা দিতে বা তাদের অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থার অধীনে তাদের বিচার করতে পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী ট্রিস্তিনো মারিনেলো বলেছেন, নেতানিয়াহু সরকারে থাকাকালীন ইসরায়েল কর্র্তৃক তাকে প্রত্যর্পণ করার সম্ভাবনা কম। তবে তিনি ১২৪টি রাজ্যে ভ্রমণ করতে পারবেন না, যেগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মারিনেলো এমন পরোয়ানাকে ঐতিহাসিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা নেতানিয়াহু এবং গ্যালান্টের বাইরেও প্রভাব তৈরি করবে। তার মানে, এ পরোয়ানা ইস্রায়েলের অন্যান্য নাগরিকদের, বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলির দ্বৈত নাগরিকদের বিরুদ্ধে চলমান ঘরোয়া মামলাগুলোকে উসকে দিতে পারে। তিনি বলেন, অপরাধের সঙ্গে জড়িত অন্য যে কেউ আন্তর্জাতিক স্তরেও বিচারের মুখোমুখি হতে পারে।

গ্রেপ্তার হবেন কি

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, আইসিসির নিজস্ব কোনো পুলিশ বাহিনী নেই। ফলে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার জন্য তারা তাদের সদস্যভুক্ত দেশগুলোর ওপর নির্ভর করে। এ আদালত প্রতিষ্ঠার যে ১২৪ দেশ ‘রোম স্ট্যাটিউট’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, তার মধ্যে ৩৩টি আফ্রিকান, ১৯টি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয়, ১৯টি পূর্ব-ইউরোপীয়, ২৮টি লাতিন আমেরিকান এবং ক্যারিবীয় ও ২৫টি পশ্চিম ইউরোপীয় ও অন্যান্য রাষ্ট্র রয়েছে। ইসরায়েল আইসিসির সদস্য দেশ না হওয়ায় এর ওপর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কোনো এখতিয়ার নেই বলে দাবি করে দেশটি। তবে বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ঘোষণা করার সময় আইসিসি জানায় যে, এর সদস্য রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের আঞ্চলিক বিচারিক এখতিয়ারের ভিত্তিতে ইসরায়েলের ওপর বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। যদিও কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আইসিসি সাধারণত অনুপস্থিত আসামিদের বিচার করে না। যার অর্থ দাঁড়ায়, সম্ভবত নেতানিয়াহু এবং গ্যালান্ট আইসিসির কোনো সদস্য রাষ্ট্রে ভ্রমণ করা বা গ্রেপ্তার না হওয়া কিংবা দুজনকে হেগে না আনা পর্যন্ত তাদের বিচারের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে পরোয়ানা জারি হলেও নেতানিয়াহু কিংবা গ্যালান্টকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হতে হবে না। তবে এরপর থেকে তাদের জন্য যেকোনো দেশে ভ্রমণ করা জটিল হবে, একই সঙ্গে এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইসরায়েলকে আরও বিচ্ছিন্ন করার হুমকি তৈরি হলো। নেতানিয়াহু সবশেষ জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে ‘আপত্তিজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি বলেন, আইসিসি যা-ই বোঝাক না কেন, ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে তুলনার জায়গা নেই। ইসরায়েলের নিরাপত্তার হুমকির মুখে পড়লে আমরা সবসময় তাদের পাশে দাঁড়াব। যুক্তরাজ্যে এলে কি তাকে গ্রেপ্তার করা হবে সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে দেশটির সরকারি মুখপাত্র বলেন, আমরা কোনো পূর্বানুমানে যাব না। তবে খোলাখুলিভাবেই নিজেদের ভূখণ্ডে যেকোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দুই দেশ ইতালি এবং নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ।

ইসরায়েলের ‘রক্ষক’

নেতানিয়াহু সবসময়ই বলে আসছেন, তিনি ইসরায়েলের রক্ষক। সবাই যেন মৃত্যুর পর সেই হিসেবে তাকে স্মরণ করে, এটাই তার চাওয়া। দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা ইসরায়েলের এ প্রধানমন্ত্রী এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইংরেজি এবং হিব্রুতে এ কথা বলে আসছেন। তিনি বলে থাকেন, ‘আপনি আমাকে পছন্দ নাও করতে পারেন, বিশ্বাস নাও করতে পারেন, কিন্তু শুধু আমি আপনাকে নিরাপদ রাখতে পারি।’ তবে তার কথা আর বাস্তবতা এক নয়। একমাত্র রক্ষক থেকে তিনি এখন ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যর্থ নেতা। অনেকে বলেছেন, এটা নিশ্চিত তিনি আর কখনো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে পারবেন না। তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইসরায়েলের রাজনীতিতে সক্রিয় নেতানিয়াহুকে ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’ নাম দেওয়া হয়। ইসরায়েলের রাজনীতিতে অন্য যেকোনো নেতার চেয়ে বেশি সময় ধরে শীর্ষস্থানে থাকার কারণে তাকে ‘কিং বিবি’ ডাকা হয়। তার আরও একটি ডাকনাম আছে, যেটি তিনি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেন। সেটি হলো ‘মিস্টার সিকিউরিটি’। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস হামলার পর তার সব বুজরুকি ফাঁস হয়ে যায়। ইসরায়েলের নিরাপত্তা দিতে তিনি ব্যর্থ বলে প্রতীয়মান হন। যা ঢাকার জন্য তিনি বর্বরতম হামলা চালান গাজায়। যে হামলা ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। ইরানের মতো শক্তি এখন তার বিরুদ্ধে। আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ লেগে যেতে পারে বলে আশঙ্কা। আর যুদ্ধ মানেই নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি নাগরিকদের একটা বড় অংশের দাবি, গণতন্ত্র খর্ব করার চেষ্টা করছে নেতানিয়াহু। তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভও হয়। তবে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, নেতানিয়াহুর স্বেচ্ছায় পদ ছাড়ার সম্ভাবনা নেই। তিনি যুদ্ধ বাধিয়ে রেখে নিজের গুরুত্ব ধরে রাখবেন। এ অবস্থায় আরেকটি নির্বাচন হবে ইসরায়েলে। দুর্বল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তিনি আবার দেশটির ক্ষমতায় বসতে পারেন। কারণ হেরে যাওয়ার সুযোগ তার সামনে নেই। দুর্নীতি, যুদ্ধাপরাধ, ইসরায়েলের নাগরিদের নিরাপত্তা দিতে না পারার অভিযোগে তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। এসব থেকে বাঁচতে হলে ক্ষমতা ধরে রাখতে হবে। আর ক্ষমতা ধরে রাখার তার একমাত্র উপায় যুদ্ধ। গাজা যুদ্ধ শেষ হয়েও হচ্ছে না। তিনি হিজবুল্লাহর সঙ্গে সেই যুদ্ধের

বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান। ধারণা করা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় আসায় নেতানিয়াহুর সুবিধা হয়েছে। তার পক্ষে ঘুরতে থাকবে যুদ্ধের চাকা। কিন্তু ট্রাম্পের মনে যে কী আছে, সেটা কেউ বুঝতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকে ইউক্রেনের দিকে টেনে নিয়ে গেলে নেতানিয়াহু কী করবেন? যদিও ট্রাম্প এখনো ক্ষমতায় বসেননি। তিনি নিজ হাতে যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝে পেলে কী করবেন তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ব। হতে পারে এতে নেতানিয়াহুর ভাগ্য খুলে যাবে। আর যদি আগামী নির্বাচনে জয়ী না হন, তাহলে আম ও ছালা দুই যাবে নেতানিয়াহুর। দেশের ভেতরে মামলা আর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এড়াতে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রই হবে তার শেষ আশ্রয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত