ন্যূনতম আয় বাস্তবায়ন হলে দারিদ্র্য কমবে ৬.১৩ শতাংশ

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪, ০২:৪২ এএম

দেশে সামাজিক নিরাপত্তার জন্য যেসব কর্মসূচি রয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত উপকারভোগী এসব সহায়তা পান না। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় বাজেট ও অর্থ বিতরণ নিয়েও রয়েছে জটিলতা। এমন বাস্তবতায় ইউনিভার্সেল বেসিক ইনকাম (ইউবিআই) বা ‘সর্বজনীন ন্যূনতম আয়’ নামে একটি সমন্বিত সুরক্ষা কর্মসূচির প্রস্তাব করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

সংগঠনটি জানিয়েছে, নতুন এ পদ্ধতিতে দেশের প্রত্যেক উপযোগী পরিবার জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম একটি আয় (অর্থ সহায়তা) রাষ্ট্র থেকে পাবে। আর এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে জাতীয়ভাবে দারিদ্র্যের হার ৬ দশমিক ১৩ শতাংশ কমানো সম্ভব হবে। আগামী বাজেট থেকেই স্বল্প বা বিস্তৃত পরিসরে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।

গতকাল রবিবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত এক সেমিনারে সিপিডির পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বৈষম্যহীন টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় সম্পদ আহরণে গঠিত টাস্কফোর্সের প্রধান কে এ এস মুরশিদ ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি।

অনুষ্ঠানে রেহমান সোবহান বলেন, ‘ইউবিআই নিয়ে প্রথম আলোচনা শুরু হয় ১৯৮০ সালের দিকে। তবে বাংলাদেশে এটি আলোচনার টেবিলে আসতে চার দশক সময় লেগেছে। আমরা এখন নতুন সময়ে উপনীত হয়েছি। দেশের এমন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইউবিআই আর অ্যাকাডেমিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এ কর্মসূচি গুরুত্ব সহকারে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘নাগরিক হিসেবে আমাদের ন্যূনতম আয় পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এ অধিকার আমাদের দিতে হবে। কীভাবে সেটি নিশ্চিত হবে তা নীতিনির্ধারকরা ঠিক করবেন। সারা দেশে একবারে না করা গেলেও ধাপে ধাপে এটি করা সম্ভব। এটা করতে গিয়ে শুধু সুরক্ষা নয়, আগামী দিনে কার্যকরভাবে যাতে উপকারভোগীরা স্বাবলম্বী হতে পারে সে জায়গাও তৈরি করতে হবে। এ জন্য দক্ষতা বৃদ্ধির অন্যান্য কার্যক্রম কীভাবে বাড়ানো যায় সেটি দেখতে হবে।’

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি জানান, ‘দেশে দারিদ্র্য কমলেও বৈষম্য বেড়েছে। অবস্থা এমন যে আরেকটু ধাক্কা এলে বহু মানুষ আবার দরিদ্র হয়ে যাবে। ফলে দারিদ্র্যকে টেকসই আকারে কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। সে লক্ষ্যেই ইউবিআই কর্মসূচি প্রস্তাব করা হয়েছে।’ তৌফিকুল ইসলাম জানান, তারা হিসাব করে দেখেছেন পরিবারপ্রতি মাসে ৪ হাজার ৫৪০ টাকা ন্যূনতম নিশ্চিত আয় (সহায়তা) দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, নিজস্ব উৎস থেকে আয়ের পাশাপাশি এ পরিমাণ অর্থ পেলে একটি পরিবার তার মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারবে। মোট দশটি সূচকের মাধ্যমে একটি পরিবারের বহুমাত্রিক দারিদ্র্য ও অসচ্ছল পরিস্থিতি যাচাই করে উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে। শুধু মাথাপিছু দারিদ্র্যের ভিত্তিতে এ ভাতা দেওয়া হবে না।

জাতীয়ভাবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে চাইলে এক বছরে সরকারের ৭৫ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা লাগবে। আর অতিদারিদ্র্যপ্রবণ ১১ জেলায় এটি বাস্তবায়ন করলে ১৪ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে, যা দেশের মোট বাজেটের ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, আগামী বাজেটেই এ কর্মসূচি হাতে নেওয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে।

সর্বজনীন ন্যূনতম কর্মসূচির অর্থায়ন বড় কোনো সমস্যা না বলে জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘অতীতে আমরা প্রকল্পে অপচয় দেখেছি। এমন অনেক বিনিয়োগ হয়েছে, যা থেকে আশানুরূপ ফল (রিটার্ন) পাইনি। সুতরাং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এবং ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় (অপচয় বোঝাতে) না করলে এ ধরনের কর্মসূচিতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’ বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা রূপরেখা মধ্যেও দরিদ্র মানুষের সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র করতে হলে ইউবিআই-এর মতো কার্যক্রমের মধ্যে আমাদের যেতে হবে। দেশে উত্তরোত্তর যে বৈষম্য বেড়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই আন্দোলন হয়েছিল। ফলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের যৌক্তিকতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় এ ধরনের কর্মসূচির প্রয়োজন রয়েছে।

কে এস এ মুরশিদ জানান, বিচ্ছিন্নভাবে এতগুলো সামাজিক সুরক্ষা (যা বর্তমানে রয়েছে) কর্মসূচি না রেখে তা সমন্বিতভাবে এক ছাতার নিচে আনা গেলে কর্মসূচি বাস্তবায়ন, অর্থায়ন ও বিতরণ কাজ অনেক সহজ হবে। তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকেও এর আওতায় আনা প্রয়োজন। 

জোনায়েদ সাকী বলেন, ‘আজ পর্যন্ত দেশে জাতীয়ভাবে ন্যূনতম মজুরি ঠিক করা যায়নি। দেশ থেকে যদি এত পরিমাণে অর্থ পাচার হয়, তাহলে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে যাব কী করে, আর ইউবিআই-এর মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিই বা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে?’

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা কামাল বলেন, ‘সাধারণত পরিকল্পনায় ত্রুটি ও বাস্তবায়নে দুর্বলতার কারণে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো আশানুরূপভাবে সফল হচ্ছে না। ফলে নতুন কোনো কর্মসূচি নেওয়ার আগে এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে।’

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান জানান, ‘করোনার সময়ে এক মোবাইল নম্বরে ৩০০ জনের প্রণোদনা সহায়তা যাওয়ার খবর দেখেছেন। নতুন কর্মসূচিতেও যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে।’ সামাজিক সুরক্ষার ভাতা যেন ন্যূনতম মজুরির ওপরে চলে না যায়, সেটি নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন তিনি। তাহলে মানুষ কর্মবিমুখ হয়ে বসে পড়তে পারে।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন বলেন, ‘যে কোনো সরকারি কর্মসূচির সফলতার মূলে রয়েছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করা আবশ্যক। এ ধরনের কর্মসূচির অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকারি তহবিল ছাড়াও বন্ড, বিদেশি সহায়তাসহ উদ্ভাবনী বিভিন্ন পদ্ধতি নেওয়া যেতে পারে।’

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ কার্যালয়ের সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আনিকা রহমান ও বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক কর্মসূচি ব্যবস্থাপক আইওলি ভ্যালেন্তিনা লুকেজি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত