রাজনীতি ও দল সংস্কারের কী হবে?

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৪, ০৩:৫৯ এএম

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলে ছিল আল্লাওয়ালা ভবন নামের এক সুরম্য অট্টালিকা। ওই ভবনে ছিল সেনাপতি থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের বানানো রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টির ঢাকা মহানগর শাখার অফিস। এরশাদের অনুগত বিরোধী দল জাসদ (আ.স.ম রব গ্রুপ)-এর অফিসও ছিল একই ভবনে। স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র-গণআন্দোলন চলাকালে বিরোধী দলের কর্মসূচির ওপর মাঝে মাঝে হামলা চালানো হতো ওই ভবন থেকে। ১৯৯০ সালের অন্তিম লগ্নে স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে তখন বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালিয়ে আল্লাওয়ালা ভবন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। মানুষের উন্মত্ত ক্রোধে সেই ভবটির হাল এমন হয়েছিল যে, সেটি আর ব্যবহারের উপযুক্ত ছিল না। ভাঙাচোরা ক্ষতবিক্ষত দেয়ালের অংশবিশেষ শুধু রক্ষা পেয়েছিল। তারপর অনেকদিন সাধারণ মানুষ পরিত্যক্ত ভবনটিকে ব্যবহার করত গণপেশাবখানা হিসেবে। দল ধরে লোকে ওই ভবনে গিয়ে মূত্রত্যাগ করত। উৎকট দুর্গন্ধ পাওয়া যেত ভবনটির আশপাশ দিয়ে চলাচল করতে। পুরোপুরি ভেঙে ফেলার আগ পর্যন্ত অনেকদিন ধরে আল্লাওয়ালা ভবনের সেই ধ্বংসাবশেষ স্বৈরশাসকের প্রতি জনগণের ক্রোধের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

এই ইতিহাস খুব পুরনো দিনের নয়। কিন্তু ঐযে, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট। ৩৪ বছরেরও কম সময়। সময়ের এই স্বল্প ব্যবধানে, ঐতিহাসিক এই ঢাকা মহানগরীতেই ফের ঘটে গেল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। মতিঝিল থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের দূরত্ব খুবই কম। ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হওয়ার সময় দোর্দণ্ড প্রতাপশালী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল এই এভিনিউতেই। ১৯৭১ সালে প্রতিবেশী দেশ ভারতে বসে এই দলের নেতারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছে প্রবাসী সরকার পরিচালনার মাধ্যমে। কয়েক দফায় প্রায় ২৫ বছর দেশ শাসন করেছে আওয়ামী লীগ। তবে যতবারই তারা ক্ষমতা করায়ত্ত করেছে ততবারই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে গণতান্ত্রিক শাসনপদ্ধতিকে। স্বাধীনতার পর তারা গণতন্ত্র হত্যা করে একদলীয় বাকশাল পদ্ধতি প্রবর্তন করেছিল। আর তাদের সর্বসাম্প্রতিক শাসনকাল কলঙ্কিত হয়েছে ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপের জন্য। এদেশে আওয়ামী লীগের শাসন বরাবরই হত্যাযজ্ঞ, নিপীড়ন, লুণ্ঠন, দখলদারি, দলীয়করণ, ন্যায়বিচারে হস্তক্ষেপ, নিষ্ঠুরতা, চক্রান্ত ও অপপ্রচারের নগ্ন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সব দিন সমান যায় না। ২০২৪ সালে ক্রোধে উন্মত্ত ছাত্র-জনতার দুঃসাহসী আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস ও আতঙ্কের শাসন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। দুঃশাসনের মূল হোতা হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন। আর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় জনতার রুদ্ররোষে এক বিধ্বস্ত পোড়োবাড়িতে পরিণত হয়েছে। এখন নগরীর ঠাঁই-ঠিকানাহীন ভাসমান মানুষ ও মাদকাসক্ত লোকেরা সেই ভবনটিকে গণশৌচাগার হিসেবে ব্যবহার করছে। দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতার দম্ভ ও কর্র্তৃত্বের রাজনৈতিক কেন্দ্র হয়ে থাকা একটি ইমারতের কী শোচনীয় পরিণতি!

বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি কি দুঃশাসনের এই করুণ পরিণতির ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নেবে? রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি এই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির পথ বন্ধ করবে? আমরা জানি না, আমরা নিশ্চিত নই। হানাহানি ও হিংসাতুর রাজনীতি এদেশে ২০০৭ সালে এক-এগারো নামের এক ছদ্মবেশী সেনাশাসন ডেকে এনেছিল। সেই শাসনের কমবেশি ‘ভিকটিম’ হয়েছিল দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলই। তখনকার শাসকরা উভয় দলের ওপরেই রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সংস্কারের ব্যাপারে জবরদস্তি করেছিল। তখন দুদলের নেতারাই বলেছেন, তারা সংস্কারের পক্ষে। তবে চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার নয়। মুক্ত পরিবেশে তারা নিজেরাই রাজনীতি ও দলের সংস্কার করবেন। করেছিলেন? না, করেননি। হিংসা-বিদ্বেষ-সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করবেন বলে তারা কথা দিয়েছিলেন। কথা রাখেননি। বরং তারা ক্ষমতায় গিয়ে রাজনীতিকে আরও বেশি নিষ্ঠুর জিঘাংসাপূর্ণ করে তুলেছেন। সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে যে সংশয় ও দ্বন্দ্ব গড়িয়েছিল লগি-বৈঠার পৈশাচিক মারণযজ্ঞে এবং যার পরিণতিতে জাতীয় নির্বাচন দুই বছর পিছিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারপর একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গিয়ে সেই নির্বাচনকেই আরও নজিরবিহীন নিকৃষ্ট প্রহসনে পরিণত করেছিল। এসব উদাহরণ আমাদের সামনে যে তিক্ত সত্যকে তুলে ধরে তা হচ্ছে, ইতিবাচক কোনো পরিবর্তনকে রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দিলে তারা আবারও অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে পারেন। কেননা আদপে এ ব্যাপারে তাদের কোনো সদিচ্ছা আছে বলেই প্রমাণ মেলে না।

বর্তমানে রাষ্ট্রকাঠামো ও সাংবিধানিক সংস্কার কথাটি খুব জনপ্রিয় প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছে। কাজেই রাজনৈতিক নেতারা প্রায় সবাই নিজেদের সংস্কারপন্থি বলে জাহির করছেন। তারা ক্ষমতায় গেলে সংস্কার করবেন বলে অঙ্গীকার করছেন এবং কিছু কর্মসূচিও হাজির করছেন। নির্বাচন ত্বরান্বিত হলে দলনেতারা এসব কর্মসূচিকে হয়তো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও সন্নিবেশিত করবেন। কিন্তু জাতি হিসেবে আমাদের দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী অঙ্গীকার করেই কেবল তা লঙ্ঘন করার জন্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার কালে সমাজতন্ত্র কথাটি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তখন প্রায় সব প্রধান রাজনৈতিক দলই বুঝে কিংবা না বুঝেই হয়ে উঠেছিল সমাজতন্ত্রের প্রবল প্রবক্তা। কিন্তু স্বাধীনতার পর ক্ষমতায় গিয়ে লুটেরাতন্ত্র চালুর মাধ্যমে রাজনীতিকরা সমাজতন্ত্রের যে ক্ষতি করেছিলেন তা সমাজতন্ত্রের সবচেয়ে কট্টর বিদ্বেষী মার্কিন রাজনীতিবিদ জন ফস্টার ডালেসের পক্ষেও করা সম্ভব হয়নি। একালে বাংলাদেশের রাজনীতিকরা ক্ষমতায় গেলে সংস্কারের কথা বলেই সংস্কার কর্মসূচি ঠেকিয়ে দিতে পারেন বলে যে শঙ্কা অনেকের মধ্যেই রয়েছে, তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সংস্কার অবশ্যই একটি ধারাবাহিক ও চলমান প্রক্রিয়া। কাজেই সময়ের চাহিদা ও প্রয়োজন মেটাতে সংস্কার বিভিন্ন সময়ে অপরিহার্য হয়ে উঠবে। তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় শাসনক্ষমতার পরিবর্তন এবং জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠনের জন্য সর্বসম্মত একটি কার্যকর নির্বাচনব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। এই নির্বাচনব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের সংস্কারও করতে হবে। সেই সঙ্গে সাংবিধানিক সংস্কার করে ফেলতে পারলেও ভালো হবে। আর অন্যান্য বিষয়ে সংস্কারের ব্যাপারে নির্বাচনের আগেই একটি জাতীয় ঐকমত্য পৌঁছানো বা অঙ্গীকারনামা প্রণয়ন করা কর্তব্য। কারণ সংস্কার অবশ্যই একটি জাতীয় ঐকমত্যের ব্যাপার। নির্বাচিত একটি রাজনৈতিক দলের মর্জির ওপর তা ছেড়ে দিলে ভবিষ্যতে যে-কোনো ইস্যুতে ভিন্নমত ও সংঘাত মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।

এ তো গেল রাষ্ট্রকাঠামো ও সাংবিধানিক সংস্কারের কথা। এইসব সংস্কার রাজনৈতিক ও দলীয় সংস্কার ছাড়া কোনোক্রমেই টেকসই হতে পারবে না। অথচ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর কোনোটিই এই অতি প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও দলীয় সংস্কারের কথা বলছে না। এ ব্যাপারে তাদের সুস্পষ্ট কোনো লক্ষ্য বা কর্মসূচিও নেই। রাষ্ট্রপরিচালনা করবে মূলত রাজনৈতিক দলগুলোই। তাদের অনুসৃত রাজনীতি ও সাংগঠনিক কাঠামোর সংস্কার ছাড়া গতানুগতিক ধারার দলের পক্ষে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্যেই তার প্রমাণ রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা নিজেরা পরিবর্তিত না হলে রাষ্ট্রের সব সংস্কার ও গণতন্ত্রকেই পরিবর্তন করে তারা দুঃশাসন ও স্বৈরাচারী প্রথা ফিরিয়ে আনবে। আওয়ামী লীগের প্রায় ষোলো বছরের সীমাহীন অপকর্মের শিকার হয়েছে এদেশের নাগরিক সমাজ। ওদের পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার আগেই বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর একশ্রেণির নেতাকর্মীর দুর্বৃত্তপনা দৃশ্যমান হচ্ছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে প্রায় রোজ ধারাবাহিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবুও অন্যায়-অপরাধের প্রবণতা থামছে না। এভাবে সাংগঠনিক সাজা দিতে থাকলে একসময় হয়তো ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হবে কিন্তু তাতে কি কাজের কাজ কিছু হবে? হবে না। আসলে দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি এবং সাবেকি ও জীর্ণ দলীয় কাঠামোর সংস্কার ছাড়া কোনো দল রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব পেলে সে দায়িত্ব দ্রুতই কলুষিত হয়ে পড়বে। জনগণ কোনো সুফল পাবে না। কেবল সরকার পরিচালনা নয়, সংস্কার ছাড়া বিরোধী দলের রাজনীতিও সুষ্ঠু ধারায় পরিচালনা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক, বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেস সচিব

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত