শপথ নেওয়ার আগেই বাণিজ্য যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করলেন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের পর থেকেই চীনের সঙ্গে বাণিজ্য পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করছিলেন বিশ্লেষকরা। এবার সে বিষয়টি নিজেই জানালেন দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত সোমবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিনেই চীন, কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করবেন। যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার ও অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। আগামী ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি শপথ নেবেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প বলেন, মেক্সিকো ও কানাডা থেকে আসা সব পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। মাদক পাচার ও অভিবাসীদের অবৈধ প্রবেশ ঠেকানোর পদক্ষেপ নেওয়ার আগ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। তার এই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে ২০২০ সালে কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তির (ইউএসএমসিএ) শর্ত লঙ্ঘন হতে পারে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের মধ্যে অধিকাংশ পণ্যের শুল্ক মুক্ত বাণিজ্য হয়ে থাকে। তবে ২০২৬ সালে চুক্তির ‘সানসেট’ ধারার আওতায় বিষয়টি পুনরায় আলোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। ২০২৩ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মেক্সিকোর ৮৩ শতাংশ ও কানাডার ৭৫ শতাংশ রপ্তানি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে যায়। মেক্সিকোতে স্বল্প ব্যয়ে উৎপাদিত এশীয় গাড়ি ও ইলেকট্রনিক পণ্যের ওপরও এই শুল্কের প্রভাব পড়তে পারে। ট্রাম্প মনে করছেন, দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ এ সমস্যাটি সহজেই সমাধান করতে পারে মেক্সিকো ও কানাডা। আলাদা আরেক পোস্টে প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হওয়ার জন্য চীনকে আক্রমণ করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ফেন্টানিলের ব্যবসায় জড়িতদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চীনের কর্মকর্তারা তা পূরণ করেননি। ফলে যতক্ষণ পর্যন্ত না দেশটি থেকে সিনথেটিক ওপিওড ফেন্টানিল মাদক পাচার বন্ধ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত দেশটির ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ফেন্টানিলে ব্যবহৃত উপাদানগুলোর উৎপাদন বন্ধে পদক্ষেপ নিতে চীনকে আহ্বান জানিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে, ফেন্টানিল মাদক সেবনের কারণে দেশটিতে গত বছর ৭৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে, ট্রাম্পের এই ঘোষণা বিশ্বে নতুন করে বাণিজ্য যুদ্ধের শঙ্কা সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন একটি শক্তিশালী বাণিজ্য অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এটি বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে জটিলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। এটিকে প্রচ্ছন্ন হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছেন বিশ্লেষক উইলিয়াম রেইন্সচ। শুল্কারোপের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন, মেক্সিকো ও কানাডা। ওয়াশিংটনের চীনা দূতাবাস বলেছে, এই শুল্ক আরোপের ফলে নতুন করে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র বা চীন কেউই লাভবান হবে না। চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ বলেন, বেইজিং-ওয়াশিংটনের মধ্যে পারস্পরিকভাবে উপযোগী অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা নিশ্চিত করা উচিত। চীন জেনেশুনে ফেন্টানিলে ব্যবহৃত উপাদানের রাসায়নিক যুক্তরাষ্ট্রে যেতে দিচ্ছে এমন ধারণা মোটেও সত্য নয় এবং তা বাস্তবতার বিপরীত। ঘোষণার পর কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপ হয়েছে ট্রাম্পের। এক কানাডীয় সূত্র জানিয়েছে, তাদের আলোচনায় বাণিজ্য ও সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয় উঠে আসে। মেক্সিকোর নিম্নকক্ষের নেতা রিকার্ডো মনরিয়েল শুল্ক আরোপের বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরনের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা সাধারণ জনগণের ক্ষতি করবে ও মূল সমস্যার সমাধান করবে না।
