সরস কথা ও প্রশাসনের প্রাসঙ্গিকতা

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৪:৪৫ এএম

হ্যাচ-বার্নওয়েল ছিলেন একজন ইংরেজ আইসিএস অফিসার। চাকরিতে ঢুকেছিলেন ১৯৩৩ সালে। প্রথমে কাজ করেছেন ব্রিটিশ বাংলায়। ভারতবর্ষ স্বাধীন হলে চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। পরবর্তী সময় ১৯৬৬ সালে মেম্বার, বোর্ড অব রেভিনিউ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করে নিজ দেশ ইংল্যান্ডে প্রত্যাবর্তন করেন। হ্যাচ-বার্নওয়েল ছিলেন দক্ষ আমলা। কাজ করতে গিয়ে এখানকার মাটি ও মানুষকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তার দক্ষতা ও সহৃদয়তার পরিচয় পাই, ১৯৫৬ সালে খাদ্য বিভাগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও স্থায়ীকরণে তার অনবদ্য ভূমিকার মধ্য দিয়ে। ‘শেষ অভিভাবক’ শিরোনামে একটি অসাধারণ স্মৃতিকথা লিখে গেছেন। চাকরি জীবনের অসংখ্য অসাধারণ অনুকাহিনি বইয়ে স্থান পেয়েছে। সেখান থেকে কয়েকটি এখানে তুলে ধরা হলো 

সে সময় আইসিএস অফিসারদের মধ্যে যাদের অপেক্ষাকৃত কম দক্ষ মনে করা হতো, তাদের বিচার বিভাগে চালান করার ব্যবস্থা নেওয়া হতো। নোয়াখালী জেলায় সে রকম একজন বিচারক নিয়োজিত ছিলেন। অনেক দিন চাকরি করার পরও সেখান থেকে তার বদলি হচ্ছিল না। সহকর্মীদের সঙ্গেও তার তেমন সখ্য ছিল না। একবার গভর্নর সেখানে পরিদর্শনে যান। সে সময় তিনি নিজের বদলির জন্য তার কাছে তদবির করেন। কিন্তু গভর্নর সেটা আমলে নেন না। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে গভর্নরকে কৌশলে শায়েস্তা করতে সুযোগ খুঁজতে থাকেন। কিছুদিন পর তার আদালতে একটা গুরুত্বপূর্ণ হত্যা মামলা আসে। সে মামলায় জেলার এসপি মামলাটি এমনভাবে সাজান, যাতে তার সত্যের অপলাপের প্রয়াস সামনে চলে আসে। বিচারক এই মামলায় তার অপছন্দের দুই ব্যক্তি গভর্নর ও এসপি এই দুজনকে ঘায়েল করার ব্যবস্থা নেন। প্রথমে তিনি মামলাটা নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করেন এবং রায় লেখার পর্যায়ে উপনীত হন। এরপর শপথ ভঙ্গের অভিযোগে এসপিকে জেলে তোলেন। এসপি যাতে কোনো ক্রমেই তাড়াতাড়ি জামিন না পান, তা নিশ্চিত করতে তিনি মামলার সব রেকর্ডপত্র জেলার সবচেয়ে অগম্য হাতিয়া মুন্সেফ আদালত পরিদর্শন করতে যান। উদ্দেশ্য ছিল, এসপিকে বেশি দিন জেল খাটানো এবং মামলার রায় লিখে গভর্নরকে জব্দ করা।

বিচার বিভাগ তাদের কাজে সবসময়ই স্বাধীনতা ভোগ করে। এই সুযোগে তিনি রায় লেখার সময় ভারতীয় দণ্ডবিধির নানা উদাহরণ নিপুণভাবে তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে গোপনে কিস্তিতে কিস্তিতে রায়টা কলকাতার প্রধান প্রধান সংবাদপত্রে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। সেখানে মামলার একপক্ষ কর্র্তৃক চিহ্নিত অপর পক্ষের দুজন সাক্ষীর আপাত-বিরোধী সাক্ষ্যের একটা দৃষ্টান্ত ছিল। যেমন জনাব ক বলেছেন যে, কাজটা সংঘটনে জনাব খ-এর বিশেষ ভূমিকা ছিল। আবার জনাব গ বলেছেন যে, আসলে ঐ কাজটাতে জনাব ঘ-এর ভূমিকা ছিল। আসলে খ ও ঘ-এর মধ্যে কোনো অমিল ছিল না। প্রথম নামটা ছিল ব্যক্তিটির আনুষ্ঠানিক নাম, আর দ্বিতীয়টা ছিল গ্রামে প্রচলিত ডাক নাম। ক্ষুব্ধ বিচারক এই উদাহরণটা টেনে দুজনের আপাত অমিলটাকে মিল করতে রায়ে লেখেন যে, যেমন আমাদের গভর্নর মহোদয় আনুষ্ঠানিক পরিমণ্ডলে ‘স্যার ভি ডব্লিউ’ বলে আখ্যায়িত হয়ে থাকেন। কিন্তু যারা তাকে ভালোভাবে চেনেন, তারা তাকে তৈল-মর্দন-প্রিয় ‘পিছলা শ্যাম’ নামেও অভিহিত করেন। বিচারক এভাবে তার অনাক্রম্যতার ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে দাম্ভিক গভর্নরের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন।

পাকিস্তান আমলে ঘণ্টায় ষাট টাকা খরচ করে মহামহিমদের দেশের অভ্যন্তরে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আনতে সরকারি পর্যায়ে কয়েকটা উড়োজাহাজ পোষা হতো। একবার প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান পূর্ব পাকিস্তান আসেন। তাকে কয়েকটি দ্রষ্টব্য স্থান দেখাতে একটি উড়োজাহাজ প্রস্তুত করা হয়। আরোহণের জন্য মহামহিম মই বেয়ে বিমানের ভেতরে এক পা রেখেছেন। তারপর কীসের এক দ্বিধায় হঠাৎ যেন তিনি থেমে যান; ঢুকতেও পারছিলেন না, আবার বের হতেও পারছিলেন না। আসলে তার জন্য প্রস্তুত-করা উইজিওন বিমানের দরজা ছিল ভীষণ সংকীর্ণ। আর প্রধানমন্ত্রীর শরীর ছিল চর্বি-মাংসে উছলানো। সমস্যাটি আন্দাজ করে ট্রান্সপোর্ট অপারেশন বিভাগের সুপারের সাহায্য চাওয়া হয়। তিনি ছিলেন বয়সে তরুণ এবং স্বাস্থ্যে পেশিবহুল। তিনি দ্রুত জায়গামতো পৌঁছে গিয়ে মহামহিমের প্রশস্ত পশ্চাৎদেশে দুই হাত চেপে এমন জোরে এক ধাক্কা মারেন যে, তাতে কায়েদে মিল্লাত বিমানে ঢুকে পড়তে সক্ষম হন। তবে এই মহামহিম সফর থেকে ফিরে এসে কীভাবে বায়ুযান থেকে নির্বিঘ্নে অবতরণ করেছিলেন, হ্যাচ-বার্নওয়েল সে বিবরণ লেখেননি। 

এই বিমানের পাইলট নিয়োগ নিয়ে আরেকটা ঘটনা ঘটে। এক ইংরেজ পাইলট চাকরি ছাড়তে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। সে জন্য তার জায়গায় পাইলট নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। একজন অত্যন্ত যোগ্য তরুণ প্রার্থী পাওয়া যায়। তাকে জরুরি ভিত্তিতে কাজে যোগদান করতে তারবার্তা প্রেরণ করা হয়। তিনি কাজে যোগদান করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে একটা বিষয় বিবেচনা করতে অনুরোধ করেন চাকরিটার চুক্তিতে উল্লেখ ছিল যে, বিবাহিত হলে কাজে যোগদানের বেলায় পাইলট নিজের ও স্ত্রীর জন্য দুটো বিমান ভাড়া প্রাপ্য হবেন। তিনি বিবাহিত নন, কিন্তু পাত্রী ঠিক করা ছিল, যেকোনো সময় বিয়ে সম্পন্ন হতে পারে। এ জন্য চুক্তিপত্রে উল্লিখিত ‘স্ত্রী’ শব্দটির পরিবর্তে ‘বাগদত্তা’ শব্দটা বসানোর জন্য তিনি অনুরোধ করেন, যাতে সরকারি খরচে বাগদত্তাকে সঙ্গে করে তিনি ঢাকায় আসতে এবং কর্মস্থলে বিয়েটা সম্পন্ন করতে পারেন।

যোগ্য প্রার্থীর জন্য চুক্তিপত্রে এ সামান্য পরিবর্তন তেমন কিছু না। কিন্তু নিয়ম হলো, তার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। নথি যথারীতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে চলে যায়। দুর্ভাগ্যবশত এই নথিটা গিয়ে পড়ে এক সহকারী সচিবের হাতে। সেখানে তিনি নবনিয়োজিত শিক্ষানবিশদের শর্তের আদলে লেখে দেন যে, ‘ভদ্রমহিলা শিক্ষানবিশ হিসেবে চলে আসতে পারেন এবং তিনি যদি এ সময় পরিতৃপ্তি দান করতে পারেন, তবে সরকার তার ভাড়া পরিশোধ করবেন।’ নথিটা যখন ফিরে আসে তখন হ্যাচ-বার্নওয়েল সফরে ছিলেন। জরুরি প্রয়োজন মনে করে অফিসের অধস্তনরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই মতামতটি হুবহু অনুলিপি করে হবু পাইলটের কাছে পাঠিয়ে দেন। এতে প্রাপক ভীষণভাবে আহত হন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব হয়তো ‘পরিতৃপ্তি দান’ কথাটার প্রচ্ছন্ন অর্থ ‘বিয়ে’ বুঝিয়ে থাকবেন, কিন্তু পাইলট সাহেব এর অর্থ আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করেন। ফলে তিনি চাকরির প্রস্তাবটা তৎক্ষণাৎ প্রত্যাখ্যান করেন।

পাকিস্তানের স্বাধীনতার পরপর কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, দেশের অবাণিজ্যিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো আমদানি কাজে যথেষ্ট পারঙ্গম না হওয়ায় তাদের আমদানির কাজ দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করার জন্য একটা আলাদা সংস্থা গড়ে তোলা হবে। সে অনুযায়ী, যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়, সেটা হলো সরবরাহ ও উন্নয়ন পরিদপ্তর। এ প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে ছিলেন একজন মহাপরিচালক, সংক্ষেপে ইংরেজিতে তার পদবি ছিল ডিজিএসঅ্যান্ডডি (Director General, Supply  & Development)। এই পটভূমিতে রেলপথ বিভাগ বেশ কিছু ফিশপ্লেটের জন্য অধিযাচনপত্র ডিজিএসঅ্যান্ডডি-এর দপ্তরে প্রেরণ করে। এদিকে ফিশপ্লেটের অভাবে রেলপথ বিভাগ ক্রমেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন রেলপথ বিভাগ দুর্ঘটনার আশঙ্কা ব্যক্ত করে কখন ফিশপ্লেট পাওয়া যাবে, তা জানাতে অনুরোধ করে।

হ্যাচ-বার্নওয়েল তার চাকরির শেষ দিকে পূর্ব পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অনুক্রমের দিক থেকে এই প্রতিষ্ঠানে তিনি ছিলেন তৃতীয় চেয়ারম্যান। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছিল একটি আইনের মাধ্যমে। একদিন অলস মুহূর্তে তিনি এই আইনটি পড়তে গিয়ে দেখেন, সেখানে চেয়ারম্যানকে অন্যত্র বদলি করার কোনো বিধান রাখা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে চেয়ারম্যান যদি পাগল হয়ে যান বা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হন, তবে তাকে অপসারণ করা যাবে। এর অর্থ করপোরেশনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় কোনো চেয়ারম্যানেরই নিয়োগের বৈধতা নেই। প্রথম জনই তখনো কাগজে-কলমে চেয়ারম্যান রয়েছেন। করপোরেশনে নিজের নিয়োগ নিয়মিতকরণ এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় চেয়ারম্যানের কাজের বৈধতা দিতে তিনি অতি গোপনে মুখ্য সচিবকে আইন সংশোধন করতে অনুরোধ করেন। মুখ্য সচিব আইন সংশোধনের ঝামেলাপূর্ণ কাজে আর তখন যাননি। তিনি হ্যাচ-বার্নওয়েলের নিয়োগের বৈধতা দিতে পরবর্তী গেজেটে দুটো রূঢ় বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। ওই বিজ্ঞপ্তি দুটিতে উল্লেখ করা হয়, তার দুজন পূর্বসূরি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন এবং সে কারণে যে তারিখ থেকে তাদের করপোরেশন থেকে বদলি করা হয়েছিল, সে তারিখ থেকে তাদের অপসারণ করা হলো। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এই বিলম্বিত অপসারণ আদেশ প্রাপ্ত হয়ে প্রথম চেয়ারম্যান ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তবে দ্বিতীয় জন গভর্নর আজম খানের এক অবাস্তব আদর্শিক খামখেয়ালিপনায় তাল দিতে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ আলু বীজ আমদানি করে ফেলেন। তাতে সরকারের যথেষ্ট অর্থ ক্ষতি হয়। এই প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর হ্যাচ-বার্নওয়েল কর্মে যোগদানের তারিখ থেকে ভূতাপেক্ষভাবে করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে স্বীকৃতি পান ঠিকই, কিন্তু আইনের সংশোধনী আলোর মুখ দেখে না। পরবর্তী সময়ে তিনি সেখান থেকে বদলি হয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে যোগদান করেন এবং এর কিছু দিনের মধ্যে অবসর গ্রহণ করেন।

দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি যে ক্ষেত্রের কথাই বলা যাক না কেন, রাশভারী কাজের সঙ্গে কিছু কৌতুকের উপাদান যুক্ত না হলে সেটা একঘেয়ে ও নিরানন্দ হয়ে পড়ে, কাজ গতি হারায়। সে জন্য আগের দিনে সব যাত্রাপালা ও নাটকে ভাঁড় এবং বিদূষকের উপস্থিতি ছিল বিনোদনে গতি আনার এক অপরিহার্য শর্ত।   পাকিস্তান আমলে যে এই অনুষঙ্গটা ভালোই ছিল, হ্যাচ-বার্নওয়েল তা তার সুনিপুণ হাতে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ আমলে পতিত স্বৈরাচারের সুদীর্ঘ সময়ের রঙ্গমঞ্চে এসব বিদূষকদের সাক্ষাৎ মিলেছে  এন্তার। ফলে তখন কর্ম-পরিবেশ ছিল খুবই ফুরফুরে। তবে স্বৈরশাসকমুক্ত দেশেও তাদের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে কাজের বাতাবরণ যে তাগড়াই থাকবে, তাতে সন্দেহ নেই।

লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, খাদ্য অধিদপ্তর ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত