‘এটি অন্য কলার চেয়ে অনেক ভালো... আসলেই...’

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৮:০৫ এএম

শাহ আলম, বয়স ৭৪। বিপত্নীক এই সরকারি চাকুরে ২০০৭ সালে আমেরিকায় পাড়ি জমান দুই সন্তানের কাছাকাছি থাকার জন্য। এখন নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্কসে বেজমেন্ট অ্যাপার্টমেন্টে ভাগাভাগি করে থাকেন আরও পাঁচজন পুরুষের সঙ্গে। বিশ্বখ্যাত নিলামঘর সথেবিজের কেন্দ্রীয় কার্যালয় লাগোয়া একটি ছোট্ট ফলের দোকানে সপ্তাহে চারদিন কাজ করেন ১২ ঘণ্টা করে, প্রতি ঘণ্টায় তার পারিশ্রমিক ১২ ডলার। এই প্রবাসী বাংলাদেশির কাছ থেকেই মাত্র ২৫ সেন্টে কিনে নেওয়া হয় সেই কলা যা নিয়ে আলোচনা চলছে দুনিয়া জুড়ে। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন। ডাক্ট টেপ দিয়ে আটকানো কলা যা সথেবিজেই নিলামে বিক্রি হয়েছে ৬২ লাখ মার্কিন ডলারে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৭৪ কোটি টাকার বেশি।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদক যখন শাহ আলমকে বিষয়টি জানান, তখন তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। সত্তরোর্ধ্ব এই প্রবাসী যাকে কঠোর পরিশ্রম করে নিজের জীবিকা উপার্জন করতে হয়, তিনি বারবার বলছিলেন, ‘আমি একটা গরিব মানুষ। আমি এত টাকা কোনোদিন দেখিনি।’ শিল্পকর্মটির দাম বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘যারা এটি কিনেছে, তারা কী ধরনের মানুষ? তারা কি জানে না কলা কী জিনিস?’

‘কমেডিয়ান’ নামে ভাইরাল শিল্পকর্মের বর্তমান মালিক ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোক্তা জাস্টিন সান। ৩৪ বছর বয়সী এই উদ্যোক্তা নিলাম জয়ের পরেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই কলা তিনি খাবেন। তিনি অঙ্গীকার পূরণ করেছেন। হংকংয়ের অন্যতম নামি দামি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন ডেকে, সাংবাদিকদের সামনে কলা খেয়েছেন। কয়েক কামড় খেয়েই তিনি বলেন, ‘এটি অন্য কলার চেয়ে অনেক ভালো... আসলেই বেশ ভালো।’ সংবাদে সম্মেলনে কলা খাওয়ার ঘটনাটি শিল্পকর্মটির ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। শুধু তাই নয়, শাহ আলমের ছোট্ট ফলের দোকান থেকে ১ লাখ কলা কেনার অঙ্গীকারও করেছেন সান। এবং বলেছেন এই কলাগুলো বিশ্ব জুড়ে বিতরণ করা হবে, ‘দৈনন্দিন জীবন এবং শিল্পের সুন্দর সম্পর্কের উদযাপন’ হিসেবে। কোনো একদিন সশরীরে শাহ আলমের দোকানে যাওয়ার আশাও প্রকাশ করেন তিনি।

ইতালীয় কনসেপচুয়াল শিল্পী মাউরিজিও কাতেলানের এই ধারণাগত শিল্পকর্মটি এ নিয়ে তিনবার খাওয়া হলো। ২০১৯ সালে তিনটি সংস্করণে এটি সৃষ্টি করা হয়। এই শিল্পকর্মে একটি তাজা কলা দেয়ালের মেঝে থেকে ঠিক ১.৬ মিটার উঁচুতে ডাক্ট টেপ দিয়ে আটকানো থাকে। শিল্পকর্মের সঙ্গে একটি সত্যতা সনদ এবং এটি সঠিকভাবে প্রদর্শনের বিস্তারিত নির্দেশনা সরবরাহ করা হয়, যাতে মালিক প্রদর্শনের কাজে ব্যবহার করতে পারেন। কলা এবং ডাক্ট টেপ প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা যাবে। এবং এটাও বলে দেওয়া হয়েছে যে, শিল্পকর্মটি এর শারীরিক উপস্থাপন দ্বারা সীমিত নয়। ‘কমেডিয়ান’ এর দুটি সংস্করণ ২০১৯ সালেই প্রতিটি ১ লাখ ২০ হাজার ডলারে বিক্রির পর ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে যেসব প্রশ্ন উঠেছে তার সারমর্ম করলে দাঁড়ায় একেই কি বলে কলা!!!

কলা বা আর্ট কী বা কেমন হতে পারে তা নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং গোলযোগ চলছে শত শত বছর ধরে। ফরাসি শিল্পী মাহসেল ডুশম্প বিশ শতকের গোড়ার দিকেই শিল্পকে চোখ নয় মননকে তৃপ্ত করার কাজে লাগানোর কথা বলেন। অর্থাৎ জীবনকে প্রতিফলন/অনুকরণের চক্র ভেঙে শিল্প চিন্তার জগৎকে আন্দোলিত করবে। ডুশম্পের কাজকে হালের কনসেপচুয়াল আর্ট বা ধারণাগত শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়, যেখানে দাবি করা হচ্ছে শিল্পকর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে চিন্তা বা ধারণা। মার্কিন শিল্পী সল লিউইটের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘ধারণা হবে সেই যন্ত্র যা শিল্পকর্মটি সৃষ্টি করবে।’

কাতেলানের ‘কমেডিয়ান’কে তুলনা করা হয়েছে মার্কিন পপ আর্ট কিংবদন্তি অ্যান্ডি ওয়ারহলের শিল্পকর্মের সঙ্গেও। প্রসঙ্গত, পপ আর্টের উদ্দেশ্য ছিল শিল্পের প্রথাগত আভিজাত্যকে চ্যালেঞ্জ করা। এবং এ আন্দোলনের প্রবক্তারা তা করেছিলেন পুনরুৎপাদনের ধারণা এবং কারখানায় উৎপাদিত ও গণব্যবহারের সামগ্রীকে শিল্পকর্মে ব্যবহারের মাধ্যমে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন নিত্যব্যবহার্য বস্তুকে চেনা প্রেক্ষাপট থেকে সরিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে বৈপরীত্য সৃষ্টি করতে চাইতেন তারা। শিল্পে শ্রেণিবিভাজনকে ভেঙে গণমুখী করে তোলা তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। আর তাই আমেরিকানদের নিত্যব্যবহার্য ক্যাম্পবেল স্যুপক্যান আজ কালোত্তীর্ণ শিল্প। কিন্তু ডাক্ট টেপ দিয়ে আটকানো কলা কি সেই জায়গা করে নিতে পারছে? নিঃসন্দেহে এটি ভাইরাল হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে মিম এবং পোস্টের বন্যা বইছে। সংবাদমাধ্যমে লেখা হচ্ছে এন্তার। কিন্তু দর্শকের ধারণার জগতে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারছে এই শিল্পকর্ম।

আবার ফিরি শাহ আলমের প্রসঙ্গে। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে এক ইমেইলে শিল্পী কাতেলান লেখেন, ‘কলা বিক্রেতার প্রতিক্রিয়া আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে, আর এটা তুলে ধরেছে যে শিল্পী কীভাবে অনাকাক্সিক্ষত এবং প্রগাঢ়ভাবে অনুরণিত হতে পারে। তবে, শিল্প প্রকৃতিগতভাবেই, সমস্যা সমাধান করে না যদি তা করত এটা হতো রাজনীতি।’ শাহ আলমের হাতে যে কলার মূল্য ২৫ সেন্ট, জাস্টিন সানের হাতে তার মূল্য ৬২ লাখ ডলার। আর এভাবেই পুঁজিবাদী বৈষম্যের চরম নিদর্শন হয়ে দাঁড়ায় ‘কমেডিয়ান’। শ্রম ও শ্রেণিবিভাজনের এই বিশ্বে পণ্যায়নের রাজনীতি আর প্রদর্শনবাদিতার নগ্নতাকে প্রকট করে তোলে। ডাক্ট টেপ দিয়ে মোড়ানো কলা তখন পুঁজিবাদের সেই লাগামহীন ধনক্ষুধার প্রতীক হয়ে ওঠে যা গোটা দুনিয়াকে গিলে খাচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত