কাগজে ভাসা নদী

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:৫১ এএম

বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। নদীর পানির ধারার ওপরেই সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা হিসেবে পরিচয় ছিল এই বদ্বীপের। নদী কেবল যে পানির স্রোত বয়ে নিয়ে চলে তাই না নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা। নদীর অবস্থানের ওপর জীবনের গতিপ্রকৃতি বদলে যায়। গড়ে ওঠে মানুষের পেশা, কৃষ্টি, ইতিহাস। নদী সেই অর্থে বাংলাদেশের রক্তপ্রবাহের মতো। অথচ নদীমাতৃক দেশ কথাটা কেবল কথার কথাই হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। নদী নিয়ে কবি, গীতিকার, ছড়াকারদের হাজার হাজার সৃষ্টি হচ্ছে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি। দখলের করাল গ্রাসে নদীগুলো মরে যাচ্ছে, দূষণে শ^াসরুদ্ধ হয়ে গেছে কতশত নদী। এমনকি কলমের খোঁচায় নদী নাই হয়ে যাচ্ছে। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, অন্তত ২৭৪টি নদীর নাম বাদ দিয়েই নতুন তালিকা করা হচ্ছে।

‘বাংলাদেশের নদনদীগুলোর তথ্যাদি হালনাগাদকরণ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে নদীর তালিকা করা হচ্ছে। দেশের আট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে তালিকা করা হয়েছে। তালিকা কমিশনারদের দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এসব তালিকা অনুযায়ী, দেশে মোট নদী ৬৮৫টি। পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম. ইনামুল হকের ‘বাংলাদেশের নদনদী’ বইয়ের (জনান্তিক/২০২০) তথ্যমতে, দেশে নদী ১ হাজার ১৮০টি। গত বছর নদীরক্ষা কমিশনের প্রকাশ করা বাংলাদেশের নদনদীর খসড়া তালিকায় নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৮। তাদের হিসাবে অন্তত ৩২৩টি নদী তালিকা থেকে বাদ পড়ছে। তালিকাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু নদী ভিন্ন নামে এবং ভিন্ন জেলায় রয়েছে। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, তারপরও অন্তত ২৭৪টি নদীর নাম পাওয়া যায়নি।

জবরদখলকে স্বীকৃতি দিতেই নদীগুলোর নাম বাতিল করা হচ্ছে বলে নানা সূত্রে জানা গেছে। তালিকা থেকে বাদপড়া নদীগুলোর বেশিরভাগই প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। তাদের নদীর জায়গা স্থায়ীভাবে ‘উপহার’ দেওয়ার জন্যই এ আয়োজন করা হচ্ছে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশ জুড়ে বহু এলাকায় নদীগুলো জীবন্ত থাকলেও কাগজকলমে এদের অস্তিত্ব নাই করে ফেলা হচ্ছে। নদীগুলোতে নৌকা চলে, এসবের পানি দিয়ে কৃষকরা সেচ দেন, আরও বহুভাবে নদীগুলো মানুষের কাজে লাগে, কিন্তু এদের কলমের খোঁচায় অদৃশ্য করে ফেলা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় নদীগুলোকে প্রভাবশালীদের দখলের পথ তৈরি করা হচ্ছে। বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ, বালু উত্তোলন, স্থাপনা নির্মাণের মতো কাজ করে নদীগুলো জবরদখল করে প্রভাবশালীরা।

নদীর এই জবরদখল কেবল নদীগুলোকেই মেরে ফেলছে না, একই সঙ্গে আশপাশের প্রাণপ্রকৃতি, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রাকে ব্যাপকভাবে বিনষ্ট করছে। নাগরিকদের অভিযোগ, সরকারি লোকজন সচিবালয়ে বসে নদীর তালিকা ঠিক করছে। জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় ভূমি অফিস যে তালিকা করছে তাতে সঠিক চিত্র উঠে আসছে না। সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়া তালিকা প্রকাশ করা জবরদখলকে বৈধতা দেওয়ার শামিল। তবে ঢাকার বিভাগীর কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো নদীর নাম বাদ পড়লে তা অবশ্যই যুক্ত হবে। তবে নদীর নামের ভিন্নতা রয়েছে। প্রায়ই দেখা যায়, কাগজপত্রে এক নাম আর মানুষের মুখে অন্য নাম। এটাও বাদ পড়ার একটি কারণ। সত্যিই বাদ পড়েছে কি না, যাচাই করে দেখা হবে।’ গত ১০ অক্টোবর পানি সম্পদ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সভাপতিত্বে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হয়। সভায় নদনদীর আঞ্চলিক বা পরিচিত নাম অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রবহমান নদী, হারিয়ে যাওয়া বা শুকিয়ে যাওয়া নদীর নাম, নদীর উৎস মুখে এবং ভাটিতে স্থানীয় কী নাম তা উল্লেখ করা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, নদীরক্ষা কমিশন এবং জেলা ও বিভাগীয় তালিকা বিশ্লেষণ করে আদালতের রায় অনুযায়ী সিএস/আরএস রেকর্ড মতে, নদনদীর তালিকা চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। তবে এ বিষয়ে সদিচ্ছা ও মাঠ পর্যায়ে কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ জরুরি। নদী আমাদের প্রাণভোমরা, নদীকে মেরে ফেলা মানে বাংলাদেশকে মেরে ফেলার দিকে এগোনো। একেকটি নদী মৃত হওয়া মানে দেশের অঙ্গহানির সমান। ফলে নদীবিষয়ক তালিকা, নীতিমালা ও কর্মসূচিকে অবশ্যই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রণয়ন করতে হবে। নদীগুলো যেন কাগজে ভেসে না যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত