অনেকদিন ধরেই মন্দাভাব বিরাজ করছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে। বাড়ছে নানামুখী চাপ। অস্বস্তিতে ব্যবসায়ীরা। যে কারণে বিনিয়োগে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা চেপে বসেছে ব্যবসা খাতে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে অন্তর্র্বর্তী সরকার। চলতি বছরের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পুলিশের অনুপস্থিতি এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে। এ রকম অবস্থায় নতুন বিনিয়োগ দূরের কথা, বিদেশি বিনিয়োগও কমে আসছে। যে কারণে স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়ী গোষ্ঠী রীতিমতো উদ্বিগ্ন। ফলে শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে দেশের বিনিয়োগ তো হবেই না, বিদেশি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হবে। এখনো কারখানা মালিকরা নিরাপদ নন। নানা সংকটে থেকেও তারা কারখানা চালুর চেষ্টা করছেন, কিন্তু কিছু পরিকল্পিত ঘটনায় ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন। ব্যবসায়ীদের এমন উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা আশ^স্ত করে বলেছেন, কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতা আসতে শুরু করেছে। দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত বাণিজ্য সম্মেলনে ব্যবসায়ী নেতা ও সরকারের উপদেষ্টারা বিভিন্ন কথা বলেন। ‘প্রাইভেট সেক্টর আউটলুক : প্রত্যাশা ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন। এ ছাড়াও বাণিজ্য সম্মেলনে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি জাভেদ আখতার, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সভাপতি আবদুল হাই সরকার।
প্রত্যেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে ‘আইনশৃঙ্খলা ঠিক না হলে হবে না বিনিয়োগ’ এই বিষয়টি বিভিন্নজনের বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য উপদেষ্টা যখন বলেন, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তখন ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের কারণটি সহজেই বোধগম্য। আবার অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ যখন বলেন, ‘বিগত সরকারের রেখে যাওয়া অনিয়ম-দুর্নীতি দু-চার মাসে স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। তবে কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতা আসতে শুরু করেছে’ তখন টের পাওয়া যায়, সত্যিকার অর্থে ব্যবসা-বাণিজ্যে কী ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সম্মেলনে দুটি বক্তব্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। নতুন এক সমস্যার নাম মামলা-বাণিজ্য। এটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন আমাদের পলিসি সাপোর্ট প্রয়োজন। তাহলেই ব্যবসা এগিয়ে যাবে।’ আরেকদিকে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি জাভেদ আখতার জানাচ্ছেন ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। আমাদের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে যদি এখনই যাই, দেশে নাটকীয়ভাবে কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হতে পারে। ভালো কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে, পাশাপাশি অন্তর্বর্তীমূলক কর্মযজ্ঞ রাখতে হবে।’
একটি গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিনিয়োগ কম হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বছরে এই প্রবণতা দেখা যায়। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি একতরফা জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানে দেশ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটেনি। একেক দিন একেক শ্রেণিগোষ্ঠী নানা দাবিতে মাঠে নামছে। এ অবস্থায় নতুন বিনিয়োগ আশা করার কারণ নেই। আগের বিনিয়োগ টেকানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে, নিরাপত্তাহীনতার কারণে অর্থনীতি ভঙ্গুর হলে কোনো কিছুই জোড়া লাগবে না।
