ডোনাল্ড ট্রাম্পের এশিয়া অধ্যয়ন

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:২৩ এএম

ইউরোপ মহাদেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতপূর্ণ আবহের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে একটি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিশেষত বৈশ্বিক শৃঙ্খলের ওপর গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের (পিআরসি) সর্বব্যাপী চ্যালেঞ্জ ইতিমধ্যে বাস্তবতা হিসেবে হাজির। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পিভট পলিসি’ নিয়ে আধুনিক মার্কিন প্রেসিডেন্টরা মনোযোগী হলেও শেষ পর্যন্ত তা কেউই অর্জন করতে পারেনি। অথচ পিভট তথা কেন্দ্রীয় নজর প্রক্ষেপণের এই নীতি আমেরিকান ক্ষমতার প্রশ্নে বৈশ্বিক শৃঙ্খলা রক্ষাকল্পে এখনো প্রাসঙ্গিক ও ফলপ্রসূ। উল্লেখ্য, ‘পিভট টু এশিয়া’ নীতির অর্থ হলো মার্কিন জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় পররাষ্ট্রনীতিকে এমনভাবে বিন্যস্ত করা, যা এশিয়া, বিশেষত চীনের দিকে বেশি দৃষ্টি আরোপ করে। 

পরবর্তী কমান্ডার-ইন-চিফ যদি উদ্ভূত ভারসাম্যহীনতার দিকে নজর না দেন, তাহলে পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। তাই ট্রাম্পের নতুন প্রশাসনকে বিভিন্ন সামরিক থিয়েটারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্বল্পমেয়াদি বরাদ্দগুলোকে ঘিরে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যেখানে চীন-চ্যালেঞ্জকে সর্বব্যাপী দৃষ্টিতে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রাধিকারের আওতায় আনতে হবে।

যা ঘটল

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণ সামরিক আক্রমণ এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস কর্র্তৃক ইসরায়েলে হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাতের যে চক্রব্যূহ সৃষ্টি হয়েছে, তা আমেরিকার ক্লান্ত চোখকে আবার ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ফিরিয়ে এনেছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান ৭ অক্টোবর হামলার মাত্র এক সপ্তাহ আগেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য শান্ত রয়েছে’। এরই মধ্যে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর একটি জরুরি অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে, যা মোটেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গত মে মাসে তাইওয়ানে প্রেসিডেন্ট হিসেবে লাই চিং-তের অভিষেকের পর চীন দ্বীপটির মানুষের গণতান্ত্রিক চর্চার বিরুদ্ধে প্রতিশোধস্বরূপ তাজা মারণাস্ত্র ব্যবহার করে মহড়া করেছে। তাইওয়ানের জাতীয় দিবসের পরও চীন মহড়া চালিয়েছে। তাইওয়ানকে সন্ত্রস্ত করতে চীন এসব নেতিবাচক কাজে লাগাম পড়ায়নি। বরং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পশ্চিমা বিশ্ব ও এর মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী অবস্থায় রয়েছেন। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেমন রাশিয়াকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, আবার ন্যাটো জোটকে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের জন্য দাগিয়ে দিয়েছে বেইজিং।

এখন যা ঘটছে

চীন এখন অন্যায্যভাবে ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক নৌযানগুলোকে ভয় দেখিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘকালের মিত্র হলো ফিলিপাইন। দক্ষিণ চীন সাগরে বিরোধপূর্ণ দ্বীপ ও জলভাগে ভয় দেখানোর ঘটনাগুলো নিত্যদিনের। কিছুটা কম মাত্রায় হলেও, চীন একই আচরণ করছে জাপানের সঙ্গেও, যারা কি না যুক্তরাষ্ট্রের আরেক ঘনিষ্ঠ মিত্রদেশ। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র বিবাদে ঢুকে পড়তে পারে। এর বাইরে উত্তর কোরিয়া দ্রুত হুমকির পুনরুজ্জীবন ঘটাতে পারে, যারা চীনের মদদে এবং রুশ সমর্থনে আবদ্ধ। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মস্কোকে সামরিক-বেসামরিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে পিয়ংইয়ং। এসব পরিস্থিতির সাপেক্ষে, সাহসী নতুন বিশ্বের কথা বিবেচনায় নিয়ে ভাবতে হবে, কে দায়ী এবং কী করতে হবে?

কে দায়ী

সহজ সাবলীল উত্তর হলো, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণ হলো রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের নব্য-সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব, একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে কিছু সহজাত গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে; যেমন হামাস, হিজবুল্লাহ ও তাদের সহযোগীরা। আর মধ্যপ্রাচ্যে এসব শক্তির মদদাতা হলো ইরান, যাদের রাষ্ট্রীয় নীতি হলো ইসরায়েল রাষ্ট্র (ছোট শয়তান) এবং যুক্তরাষ্ট্রকে (বড় শয়তান) মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়া। এদিকে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও এমন অস্তিত্বের সংকট রয়েছে, যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। দেখা যাচ্ছে, এখানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সেনা ঘাঁটি ও বেসামরিক ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্ত বানাচ্ছে তেহরান।

যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের কাজটা করছে না, এটাই সংকটের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর শক্তি প্রদর্শন করতে ইচ্ছুক নয়, যা আগে ছিল। এ ধরনের আচরণ শত্রুদের উৎসাহিত করছে। ২০১৩ সালে তারা সিরিয়ার মাটিতে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি। এর ফলে ২০১৫ সালে রাশিয়ার জন্য ফাঁকা মাঠ তৈরি হয়। পরে রুশ সমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের মতো ভয়ংকর শাসক টিকে যায়। ২০১৪ সালে পুতিন ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখলে নিলে ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্র কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিল। ২০২১ সালের আগস্টে একতরফাভাবে আফগানিস্তান ছেড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। 

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণ সামরিক আগ্রাসনের প্রভাব গিয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বে ‘বেইজিং-মস্কো-পিয়ংইয়ং-তেহরানের স্বৈরশাসকদের অক্ষ’ তৈরি হয়। হামাসের ৭ অক্টোবরের আক্রমণ বিশ্বের দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে দেয়, যা ইউক্রেন থেকে নজর ঘুরিয়ে নিতে তাড়িত করে। এ ঘটনা পুতিনকে সুবিধা করে দিয়েছিল।

খোলামেলা ও উন্মুক্ত পরিবেশ শূন্যতার মধ্যে ঘটেনি। মার্কিন রাজনীতিতে  লোকরঞ্জনবাদী ভাবধারার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ববর্তী দশকগুলোতে মার্কিন সামরিক প্রতিশ্রুতির চাপ নিঃসন্দেহে ওয়াশিংটনের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক দুর্দশা তৈরির পেছনে ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু শেষ অবধি, আমাদের প্রতিপক্ষকে চিরতরে নিবৃত্ত করার জন্য মার্কিন সংকল্পের অভাবই সম্ভবত পুতিনকে ইউক্রেন আক্রমণ করতে, হামাসকে আক্রমণ শুরু করতে এবং ইরানের দিক থেকে প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে নিশানা করার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। আর শেষ পর্যন্ত, এই পরিস্থিতি অতিরিক্ত মার্কিন সামরিক সম্পদের জন্য উৎসাহিত করেছিল। ভারত মহাসাগরের পরিবর্তে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করতে হয়েছিল সেইসব সেনা ও সামরিক সম্পদ। এখন একটি নতুন প্রশাসন ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে এই সর্বব্যাপী প্রভাবকগুলোর ভিত্তিতে আরও দৃঢ় বৈশ্বিক মার্কিন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা প্রদর্শন করা উচিত, যেন ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতিগুলো ছাঁটাই করা না হয়।

যা করতে হবে

মার্কিন স্বার্থের প্রশ্নে স্বল্পমেয়াদি উত্তর হলো আমেরিকান স্বার্থের প্রতি হুমকি মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকরভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সম্পদ নিয়োগ করতে হবে। একটি অস্থির বহুমাত্রিক থিয়েটার হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মূল স্বার্থ এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর জন্য তীব্র হুমকিমূলক জায়গাতে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এদিকে, আগামীকালই পুতিন ন্যাটোর এক সদস্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করলে, যুক্তরাষ্ট্র ৮০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইউরোপে তীব্রতম যুদ্ধে নিজেকে খুঁজে পেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই জাতীয় শক্তির অভ্যন্তরীণ এবং বৈশ্বিক নিয়ামকগুলোকে ব্যাপক উন্নত করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক শক্তির চাবিকাঠি; তা মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ বা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর হোক।

লেখক : ব্রাডফোর্ড এম. ফ্রিম্যান ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জর্জ ডব্লিউ বুশ ইনস্টিটিউট

এশিয়া টাইমসের নিবন্ধের ভাষান্তর : মুজাহিদ অনীক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত