পাচার প্রতিরোধে চাই শাস্তি

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:২৫ এএম

একদিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অন্যদিকে ভৌত অবকাঠামোর অনুপস্থিতি যখন থাকে, তখনই হয় অর্থ পাচার। যেহেতু আমাদের দেশে অবৈধ অর্থের উৎস বেশি, মূলত সেই কারণে হাসিনা সরকারের সময় যে বিপুল পরিমাণে অর্থপাচার হয়েছে, তখন দেশের অর্থনীতিকে কার্যকর রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা ও সুবিধা প্রদানকারী অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবস্থা ছিল পুরোপুরি চিহ্নিত গোষ্ঠী স্বার্থে। ঠিক তখনই চোরাচালানি এবং পুঁজি পাচারকারী ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস মালিক-শিল্পপতি, দুর্নীতিবাজ আমলা ও পুঁজি-লুটেরা রাজনীতিবিদরা পেয়ে গেছেন নিরাপত্তাযুক্ত অবাধ সুযোগ।  ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম অবজারভার ও বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের যৌথ অনুসন্ধানে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠদের ৪০ কোটি পাউন্ডের সম্পত্তি নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল দ্য গার্ডিয়ান। তখন স্পষ্ট অভিযোগ উঠেছিল লন্ডনের মেফেয়ার, গ্রোসভেনর স্কয়ারের মতো অভিজাত এলাকায় অন্তত সাতটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের মালিক সালমান এফ রহমানের পরিবার। তখনই জানা যায়, পাচার করা অর্থ দিয়ে এসব সম্পত্তি কেনা হয়েছে।  

নিয়মতান্ত্রিকভাবে কর ফাঁকি, কর অব্যাহতির অপব্যবহার ও সরকারি তহবিলের দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফলে রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, ব্যাহত হয়েছে উন্নয়ন। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বছরে কত বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে? জানা যাচ্ছে ১৫ বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনা ও তার পরিবার এবং তাদের সরাসরি প্রশ্রয়ে রাজনীতিবিদ, আমলা, এমপি, মন্ত্রী, পুলিশসহ বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিরা শুধু পাচারই করেছেন ৩০ লাখ কোটি টাকার বেশি। গড়ে প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। টাকার অঙ্কে যা প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। সে হিসাবে ১৫ বছরে পাচারের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ লাখ কোটি টাকা। এমনটিই জানাচ্ছে, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা নিয়ে শ্বেতপত্র’ শিরোনামের প্রতিবেদন। দেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন রবিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করে। প্রধান উপদেষ্টার তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রতিবেদন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে কমিটির প্রধান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ছাড়াও অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। কমিটির পর্যবেক্ষণ বলছে, রাষ্ট্রীয় ভুলনীতি ও ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সীমাহীন লুটপাট এবং অনিয়ম হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এই প্রতিবেদন আমাদের জন্য একটা ঐতিহাসিক দলিল। আর্থিক খাতে যে ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তা ছিল একটা আতঙ্কিত বিষয়। আমাদের সামনে এ ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কেউ এটা নিয়ে কথা বলেননি।’ শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যা এই সময়ের বার্ষিক প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ও প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগের দ্বিগুণেরও বেশি।

কমিটির সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান অর্থ পাচারে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে বিচারকাজ শুরুর পরামর্শ দেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১৫ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ১৭ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে এবং এর ৪০ শতাংশ বা প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। কমিটি আরও জানায়, ব্যাংক খাতই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। এরপর রয়েছে ভৌত অবকাঠামো এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকার যে মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত করেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়েই বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছাড়িয়েছিল ১০০ বিলিয়ন ডলার। প্রকল্প অনুমোদনের পর কৃত্রিমভাবে ব্যয় বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, যাতে নতুন বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ করা যায়। এই কাজ বৃহৎ কোনো শক্তির সমর্থন ছাড়া সম্ভব হয়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, পাচারকৃত অর্থ কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে? অর্থ চুরির সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দরকার। এত টাকা পাচার হয়, অথচ কোনো টাকা ফেরত আনা যায় না। এমনকি অপরাধীদেরও ধরা হয় না। কোন ধরনের আইন বা নীতি সংস্কার করলে তা সম্ভব, সেটি চূড়ান্ত করা জরুরি। প্রয়োজন অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত