বোর্ড পরীক্ষায় ইংরেজি বিপর্যয় কেন

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:৩৪ এএম

সম্প্রতি প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ইংরেজি বিষয়টি নির্ণায়কের ভূমিকা নিয়েছে। ইংরেজিতে পাস বা ফেল গোটা ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলেছে। ইংরেজি বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার ছিল মাত্র ৬৮. ৮৯ শতাংশ আর সামগ্রিক পাসের হার ছিল ৭০ শতাংশ। পুরো বাংলাদেশের চিত্রই কম-বেশি অনেকটা একই রকম। গত দুই দশকে যেখানে এ+ পাওয়ার মচ্ছব, সেখানে চট্টগ্রাম বোর্ডে একটি বিষয়ে (ইংরেজি) ৩১ শতাংশ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়াকে রীতিমতো বিপর্যয় বলা চলে। শিক্ষা বোর্ড ইংরেজি বিষয়ের ফলাফল বিপর্যয়কে একটি অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছে। অথচ ইংরেজি বিষয়ের প্রশ্ন বিগত সাত-আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে সহজ প্রশ্ন ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

ইংরেজি ভীতি যেন কমছেই না, বরং ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্যের ব্যবধানটা দিন দিন বাড়ছে। ২০২৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় ইংরেজিতে এ+ এর সংখ্যা বেড়েছে, অপরদিকে ইংরেজিতে অনুত্তীর্ণের সংখ্যাও বেড়েছে। জেলা শহর এবং মহানগরের অনেক স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি দখল অনেক ভালো। শহর থেকে একটু দূরে গেলেই এর সূচক অনেক নিম্নগামী। ভালো স্কুল/কলেজগুলো আরও ভালো করছে, অন্যদিকে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দুর্বল হচ্ছে।

কেন ইংরেজি বিষয়ের কারণে ফলাফল বিপর্যয় হয়? প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত টানা ১২ বছর ইংরেজি পড়ে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন তো দূরের কথা, সামান্য পাস মার্কস কেন তুলতে পারছে না তা ভাবাটা জরুরি। 

এইচএসসি পরীক্ষায় ইংরেজি বিষয়ে ফলাফল সন্তোষজনক না হওয়ার কয়েকটি কারণ :

১. ইংরেজি বিদেশি ভাষা হওয়ায় ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে রীতিমতো আতঙ্কের নাম। তার ওপর করোনা মহামারীর প্রভাব। এক শ্রেণির শিক্ষার্থীর বদ্ধমূল ধারণা ইংরেজি পড়ে তারা কোনো অবস্থাতেই আয়ত্তে আনতে পারবে না। কলেজের শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই অনেক দুর্বল ছাত্র-ছাত্রীর যথেষ্ট আন্তরিকতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। অনেক শিক্ষার্থী মাসের পর মাস কলেজে উপস্থিত হয় না। এসএসসি পাসের পর অনেক অসচ্ছল পরিবারের সন্তানরা চাকরিতে ব্যস্ত হয়ে যায়। সারা বছর পড়াশোনায় সম্পৃক্ত না থেকে পরীক্ষার ভেন্যু/হলের ভাগ্যের ওপর তীর্থের কাকের মতো বসে থাকে। (তাছাড়া ইংরেজি বিষয়ের বেশিরভাগ উত্তর এক শব্দের/শব্দগুচ্ছ/বাক্যাংশ হওয়ার কারণে পরীক্ষার হলের সুবিধা নিয়ে অনেক ছাত্র-ছাত্রী ভালো নম্বরও পেয়ে যায়)।

২. ছাত্র-ছাত্রীদের বড় একটা অংশ শ্রেণিকক্ষে শেখার চেয়ে কোচিং সেন্টারের পড়াশুনাকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে, শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণ এখন কোচিং সেন্টারের হাতে!

৩. ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে একটা ভুল ধারণা কাজ করে পরীক্ষার খাতায় কিছু একটা লিখলেই নম্বর পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময় প্রশ্নে থাকা প্যাসেজগুলোর মাঝখানে তারা প্যারাগ্রাফ এবং কম্পোজিশনের নামটা লিখে দেয়। পরীক্ষার্থীরা এতে নম্বর পাওয়ার দাবি করে। এবং পরবর্তী সময়ে শিক্ষকদের/পরীক্ষকদের দোষারোপ করতে দ্বিধাবোধ করে না। অনেক শিক্ষার্থী মনে করে তারা একই মানের লিখে জেএসসি, এসএসসি তথা পুরো মাধ্যমিক স্তর পার করে এসেছে। পরে তারা অসন্তুষ্টি নিয়ে রি-স্কুটিনির (রি-চেক) আবেদন করে।

৪. এক শ্রেণির শিক্ষার্থী বাজারি কিছু গাইড ও শর্টকার্ট কৌশল আরোপ করে পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করে। শেখার চেয়ে পরীক্ষা পাসের এই প্রবণতা ভয়ংকর।

৫. ছাত্র-ছাত্রীরা মুখস্থের ওপর গুরুত্ব দেয়। পরীক্ষার্থীদের বড় একটা অংশ এমনকি প্রশ্নই বুঝে না, স্রেফ মুখস্থ ঝেড়ে দেয়। 

৬. এইচএসসিতে আবশ্যিক বিষয় বাংলা এবং আইসিটির তুলনায় ইংরেজি ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে অনেক কঠিন। আইসিটি বিষয়ে প্রথম তিন অধ্যায় (প্রথম বর্ষ ও দ্বিতীয় বর্ষে) পড়লে মোটামুটি কমন পড়ে যায় এবং ৬০ শতাংশ-৭০ শতাংশ নম্বর অনায়াসেই পাওয়া যায়। বাংলা বিষয়ের বিগত ২-৩ বছরের বোর্ডের প্রশ্নগুলো আয়ত্ত করে ৬০ শতাংশ নম্বর সহজে পাওয়া যায়। তাছাড়া বাংলা এবং আইসিটি বিষয়ের প্রশ্নে অপশন দেওয়া থাকে। যেমন : বাংলা দ্বিতীয়পত্রে পাঁচটি রচনার মধ্যে একটি রচনা লিখতে হয় এবং প্রতিটি প্রশ্নের মধ্যে অপশন দেওয়া থাকে। ইংরেজি বিষয়ে কোনো প্রশ্নের মধ্যে অপশন থাকে না। তাছাড়া বিগত ১০ বছরের বোর্ডের প্রশ্ন পড়ে যে কোনো কিছু হুবহু কমন আসবে এর কোনো গ্যারান্টি নেই।

সম্ভাব্য প্রতিকারসমূহ :

১. ফলাফল উত্তরণ তথা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে মাউশি (মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর) এবং শিক্ষাবোর্ডসমূহ ছাত্র-ছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি, শ্রেণি কার্যক্রম মনিটরিং এবং অভিভাবক সমাবেশ ফলপ্রসূ করার ব্যাপারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জোরারোপ করতে পারে।

২. যে সমস্ত কলেজের ফলাফল ৫০ শতাংশের নিচে সে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে শিক্ষা বোর্ডসমূহ শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ফলাফল উত্তরণ শীর্ষক একটি কর্মশালার আয়োজন করতে পারে। ২০২০ সালের আগে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডসহ কয়েকটি বোর্ডে ফলাফল পরবর্তী (ইংরেজি এবং আইসিটি শিক্ষকদের নিয়ে) এই ধরনের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হতো।

৩. শিক্ষা বোর্ডসমূহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে ছাত্র-ছাত্রীদের সুষম বিতরণ ব্যবস্থা (লটারির মাধ্যমে) নিশ্চিত করতে পারে। অনেক এমপিওভুক্ত কলেজে প্রতি শিক্ষাবর্ষে ১২০০, ২৪০০ জন ছাত্র-ছাত্রী। অপরদিকে অনেক প্রতিষ্ঠান ছাত্র-ছাত্রীর অভাবে (ভর্তির ক্ষেত্রে রিকোয়ারমেন্ট জিপিএ ১/২ দেওয়ার পরও) অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে যদিও একই মানের শিক্ষকরা পাঠদান করে আসছেন। ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির ক্ষেত্রে যদি সুষম বণ্টন হয় তাহলে শিক্ষার্থীরা যেভাবে উপকৃত হবে, ছাত্র সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানসমূহও নতুন গতি পাবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক (ইংরেজি)

পরীক্ষক, নিরীক্ষক, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত