গাজা নীতির কারণে ইতিহাস বাইডেনকে ক্ষমা করবে না

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:৩৮ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নীতি আমেরিকার বিদেশনীতি বিবেচনায় আগামী দিনের ইতিহাসে সবচেয়ে গভীর ক্ষত হিসেবে চিহ্নিত হবে। বাইডেনের অকার্যকর দৃষ্টিভঙ্গি, তার প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন না হওয়া এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় নির্বাচনের ফলে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমেরিকাকে। এই সংকটের ফলে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সমাধান এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্রমে কমে আসছে। এখন, বাইডেনের সামনে সময় অল্প, তবে ফুরিয়ে যায়নি। এখনো সময় আছে কিছু ভুল সংশোধন করার। যদি তিনি দ্রুত ও সঠিক পদক্ষেপ নেন, তবে তার নীতিতে কিছুটা ভারসাম্য আনতে পারেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পথ তৈরির সুযোগ ফিরে পেতে পারেন।

২০২০ সালের নির্বাচনী প্রচারে বাইডেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমেরিকার বিদেশনীতি হবে মূল্যবোধভিত্তিক। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা বিশ্বে এমন একটি নীতি গ্রহণ করব, যা সব মানুষের স্বাধিকারকে সম্মানিত করবে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হবে এবং ইসরায়েলের পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা সমানভাবে নিশ্চিত করা হবে।’ বাইডেন আরও বলেছিলেন, তিনি জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের জন্য মার্কিন কনসুলেট পুনরায় চালু করবেন এবং ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেবেন। বাইডেন তার ২০২০ সালের নির্বাচনী প্রচারে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে একটি দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের কথা বলেছিলেন। কিন্তু যখন বাইডেন ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি তার প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেননি। এমনকি যখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতিহাসের সবচেয়ে ডানপন্থি সরকার গঠন করেন, তখনো বাইডেন প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। নেতানিয়াহু প্রশাসন মন্ত্রিসভায় চরমপন্থি বেজালেল স্মোটরিচ ও ইটামার বেন গিভিরের মতো নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার পরও বাইডেন প্রশাসন কোনো ধরনের প্রতিবাদ জানায়নি। আশ্চর্যজনকভাবে, বাইডেন প্রশাসন দাবি করেছিল যে, ‘মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিনের মধ্যে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।’ অথচ বাস্তবে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ভয়াবহ আক্রমণে তা বিস্ফোরিত হয়ে পড়ে।

এখানেই বাইডেনের রাজনৈতিক দুর্বলতার বিষয়টি প্রকট হয়ে ওঠে। তিনি যুদ্ধ থামানোর জন্য, অপহৃতদের মুক্তি এবং অঞ্চলটিতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যে ‘পরবর্তী দিন’র পরিকল্পনা করেছিলেন, তা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

বাইডেনের এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো, বারবার নেতানিয়াহুর সরকার তার আহ্বান উপেক্ষা করেছে। বাইডেন তাদের ফিলিস্তিনের জন্য মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি, বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা কমানো, অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধ করা, যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং বন্দিদের ফেরত দেওয়ার জন্য আহ্বান জানালেও নেতানিয়াহু প্রশাসন তার সমস্ত পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছে। বাইডেনের প্রশাসন এর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, অবিরত অস্ত্র ও বোমার সহায়তা দিয়ে নেতানিয়াহু সরকারকে আরও শক্তিশালী করেছে। এতে বাইডেন প্রশাসনের কৌশলগত দুর্বলতা ও মূল্যবোধের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসা ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনে নেতানিয়াহু সরকার আরও সাহসী হয়ে উঠবে। আরও বেশি করে ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করতে এবং ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার চরমপন্থি লক্ষ্যে অগ্রসর হবে। এখন বাইডেনের সামনে একটি স্পষ্ট সংকেত রয়েছে। তিনি যদি তার প্রতিশ্রুতি ও নীতির প্রতি সৎ থাকতে না পারেন, তবে ইতিহাস তাকে ক্ষমা করবে না। বাইডেনের জন্য এখনই সময়, দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ গ্রহণ করে তার নীতির প্রতি দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করা, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থায়ী শান্তির দিকে এগিয়ে যেতে সহায়ক হবে। কী করতে পারেন তিনি? তার হাতে সময় তো খুবই কম। এই মুহূর্তে, বাইডেনের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ হচ্ছে একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়া, যা বিশ^কে জানাবে আমরা চুপ করে বসে থাকব না, কেননা, চরমপন্থি নেতানিয়াহু সরকার মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সম্ভাবনা ধ্বংস করছে এবং সংঘাতের মূল কারণগুলো উপেক্ষা করছে। আমেরিকান জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এটি স্পষ্ট করতে হবে যে, শান্তির জন্য এখন আর কোনো সময় বিলম্বিত করা যাবে না।

এই বার্তা কীভাবে পাঠাবেন? এ জন্য বাইডেন প্রশাসনকে অবিলম্বে নেতানিয়াহু সরকারের উগ্র ডানপন্থি সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে, যারা সহিংসতা উসকে দিয়েছে এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণকে সমর্থন করেছে। এদের মধ্যে রয়েছে বেজালেল স্মোটরিচ ও ইটামার বেন গিভির, যারা অবৈধ বসতি স্থাপনে গভীরভাবে যুক্ত। এর পাশাপাশি, আমেরিকাকে অবশ্যই বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে একটি সঠিক সীমারেখা টানতে হবে, যা শুধু কথায় নয়, কাজে বাস্তবায়িত করা জরুরি। এটা স্পষ্ট যে, নেতানিয়াহু সরকারের চলমান পদক্ষেপগুলো শুধু ইসরায়েলি জনগণের জন্য নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাই, বাইডেনের সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং তা এমনভাবে করতে হবে, যাতে ইসরায়েল সরকারের শীর্ষনেতাদের জন্য কোনো ছাড় না থাকে।

সময় এসেছে স্বীকার করার যে, নেতানিয়াহু সরকার তার দেওয়া নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং যা মানবিক সহায়তা করিডোর আইনের (ফরেন অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্টের ৬২০আই ধারা) সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, নেতানিয়াহু সরকার গাজায় বেসামরিকদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা স্বেচ্ছায় সীমাবদ্ধ করেছে এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করে আমেরিকান অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এমনকি, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, যা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি আলোচনার সুযোগগুলো সংকুচিত করছে। এই বিষয়গুলো আমেরিকার নিরাপত্তা সহায়তা স্থগিত করার জন্য যথেষ্ট কারণ হতে পারে। এটা হবে নেতানিয়াহু সরকারের জন্য একটি শাস্তি, যতক্ষণ না তারা আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে এটা স্পষ্ট করবে যে তারা শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ ছাড়া বাইডেন প্রশাসনকে অবশ্যই পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতিগুলো থেকে আসা পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করতে হবে, অথবা অন্ততপক্ষে সেই পুরনো নীতিটি পুনঃস্থাপন করতে হবে, যা সেখানে উৎপাদিত পণ্য এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রে উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে পার্থক্য করে। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিকভাবে এক চমকপ্রদ বার্তা পাঠাবে, যে আমেরিকা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রতি তার দায়বদ্ধতা অব্যাহত রেখেছে।

এবং অবশ্যই বাইডেন প্রশাসনকে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য মানবিক সহায়তা ও শিক্ষা প্রদানকারী সংস্থা টঘজডঅ (ইউনাইটেড নেশনস রিলিফ অ্যান্ড ওয়ার্কস এজেন্সি ফর প্যালেস্টিনিয়ান রিফিউজি)-কে সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে, বিশেষ করে যখন ইসরায়েলের নেসেট সম্প্রতি এই সংস্থাটিকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে ভোট দিয়েছে। সংস্থাটির সহায়তা ফিলিস্তিনিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাইডেনের সরকার যদি টঘজডঅ-এর সমর্থন অব্যাহত রাখে, তাহলে এটি বিশ্বে এক শক্তিশালী বার্তা যাবে যে, যুক্তরাষ্ট্র মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাইডেন প্রশাসনকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে হবে, অবশ্যই এমন কিছু শর্তে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারণ করবে। এই শর্তগুলোর মধ্যে অবশ্যই থাকবে ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষের (পিএ) ‘কারাবন্দি পেমেন্ট’ ব্যবস্থা বন্ধ করা। এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে, যা দুই রাষ্ট্রের সমাধানের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। এই পদক্ষেপটি দ্রুত বাস্তবায়িত হতে পারে, কারণ ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে এমন একটি আইন খসড়া করেছে, যা মার্কিন আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেখানে ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষকে কারাবন্দি পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু রাখলে কোনো ধরনের সরাসরি সহায়তা প্রদান নিষিদ্ধ করা হবে। এটি শুধু ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা নয় বরং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করার জন্য একটি সঠিক পদক্ষেপ হবে।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের মূল্যবোধ ও স্বার্থকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রাধান্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। কিন্তু যদি তিনি এখনই পদক্ষেপ না নেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে এই সংঘাতে অনন্তকাল ধরে আটকে থাকতে হবে। আমি প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ জানাই, এই পদক্ষেপগুলো এখনই গ্রহণ করুন, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পথ তৈরি হতে পারে এবং বিশ্ব তার নেতৃত্বকে ইতিহাসে স্মরণীয় হিসেবে চিহ্নিত করবে।

ওয়াশিংটন পোস্ট অনলাইন থেকে ভাষান্তর : মনযূরুল হক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত