টানা শ্রম অসন্তোষের পরও গত নভেম্বর মাসে দেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য পোশাক খাতেও রপ্তানি আয় বেড়েছে সদ্য শেষ হওয়া মাসে। এ মাসে সার্বিক রপ্তানি আয় ১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার এ দাঁড়িয়েছে। গত বছরের নভেম্বর মাসে আয় হয়েছিল ৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে অর্থাৎ পাঁচ মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এ পাঁচ মাসে আয় হয়েছে ১৯ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছর ছিল ১৭ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) গতকাল বুধবার এ তথ্য প্রকাশ করেছে। ইপিবির তথ্যে দেখা গেছে, নভেম্বর মাসে পোশাক খাতে আয় বেড়েছে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং আয় হয়েছে ৩ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছর ছিল ২ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার।
চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর সময়ে) তৈরি পোশাক থেকে রপ্তানি আয় বেড়েছে ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং আয় হয়েছে ১৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার।
বিদেশিক মুদ্রা আয়ের তিনটি বড় উৎস হলো পণ্য রপ্তানি, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এবং বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণ। তার মধ্যে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়লে বিদেশি মুদ্রার সংকট কমে।
সার্বিক বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, কারখানায় গ্যাস, বিদ্যুতের সংকটের মধ্যেও শ্রমিক ও উদ্যোক্তাদের কঠোর পরিশ্রমে রপ্তানিতে ভালো খবর এসেছে। আগামীতে রপ্তানির এ গতি আরও বাড়বে বলেও প্রত্যাশা তার।
এক প্রশ্নের জবাবে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, জুলাই-আগস্টে শ্রমিক অসন্তোষের সময় ২৯৩টির মধ্যে মাত্র দুটি কারখানা বন্ধ ছিল। কারখানায় কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকলেও ওভারঅল সব কারখানার উৎপাদন ভালো করেছে, যার প্রভাব রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারায় এসেছে। এই ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। ইপিবির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
অন্য খাতগুলোতেও রপ্তানি আয় বাড়ছে। বিশেষ করে ধুঁকতে থাকা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে রপ্তানি আয় ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ বেড়ে ৪৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছর ছিল ৪৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
কৃষি পণ্যের রপ্তানিও বেড়েছে নভেম্বরে। এ মাসে কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৯৫ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি।
হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ এবং মাংস, মাছ, ডেইরি, ডিম ও মধুসহ প্রাথমিক পণ্যগুলো থেকে রপ্তানি আয় ১৬ দশমিক ৩২ শতাংশের ইতিবাচক বৃদ্ধি পেয়ে ১৫৬ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের নভেম্বরে ছিল ১৩৪ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ডলার।
জাহাজ, নৌকা এবং ভাসমান কাঠামো থেকে রপ্তানি আয় বেড়ে ২ দশমিক ১২ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের নভেম্বরে ছিল ২০ হাজার ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত জুলাইয়ে হঠাৎ করে প্রকৃত পণ্য রপ্তানির ভিত্তিতে লেনদেনের ভারসাম্যের তথ্য প্রকাশ করে। এর ফলে পণ্য রপ্তানির হিসাবে বড় ধরনের গরমিল প্রকাশ পায়। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ইপিবি দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানির হিসাব প্রকাশ করলেও সে অনুযায়ী দেশে আয় আসছিল না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, ততটা রপ্তানি হয়নি। তাই আয় বেশি আসার যৌক্তিকতা নেই।
মাস তিনেক বিরতির পর গত অক্টোবর থেকে ইপিবি রপ্তানির তথ্য প্রকাশ করতে শুরু করে। তারা ইপিজেডের কোম্পানিগুলোর প্রচ্ছন্ন ও নমুনা রপ্তানিসহ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। ফলে তাদের হিসাব এনবিআরের হিসাবের কাছাকাছিই থাকে।
খাতওয়ারি আয়ের বিষয়ে সংবাদ সম্মলনে জানানো হয়, বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে ২৭ ধরনের পণ্য রপ্তানি করেছে। এই ২৭ ধরনের পণ্যের মধ্যে বরাবরের মতোই পোশাক খাত রপ্তানি আয়ের শীর্ষে রয়েছে। এ খাত থেকে চলতি বছরের পাঁচ মাসে ১ হাজার ৬১১ কোটি ৭১ লাখ ডলার পণ্য রপ্তানির আয় এসেছে। এর মধ্যে নিটওয়্যার খাতে আয় হয়েছে ৮৯৪ কোটি ৫৫ লাখ ডলার এবং ওভেন পোশাকে পণ্যের আয় হয়েছে ৭১৭ কোটি ১৬ লাখ ডলার, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে।
এরপর যথাক্রমে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি পণ্য, হোম টেক্সটাইল, বস্ত্র ও পাটজাত, ফুটওয়্যার, প্রকৌশল, কেমিক্যাল এবং প্লাস্টিক খাত ছিল রপ্তানি আয়ের শীর্ষে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে রপ্তানি আয় ৪৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৯ কোটি ৫০ ডলার। হোমটেক্সটাইলে বেড়েছে প্রায় ২১ শতাংশ।
দেশওয়ারি পণ্য রপ্তানির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩৫৭ কোটি ২৫ লাখ ডলার, জার্মানিতে রপ্তানি হয়েছে ২১০ কোটি ৮৭ লাখ ডলার, যুক্তরাজ্যে রপ্তানি হয়েছে ১৯০ কোটি ২৭ লাখ ডলার, স্পেনে রপ্তানি হয়েছে ১৪৪ কোটি ডলার, নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি হয়েছে ৯৭ কোটি ৮৪ লাখ ডলার সমপরিমাণ পণ্য। এ ছাড়া ফ্রান্সে ১০১ কোটি ৬ লাখ ডলার, ভারতে ৮০ কোটি ৮০ লাখ ডলার, পোল্যান্ডে ৬৬ কোটি ১৬ লাখ ডলার, জাপানে ৫৯ কোটি ৫১ লাখ ডলার এবং ইতালির রপ্তানি আয় হয়েছে ৬৬ কোটি ৫ লাখ ডলার।
এ ছাড়া সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এবার যথারীতি দেশে মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলা অনুষ্ঠিত হবে। জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের ঘটনা মাথায় রেখে বাণিজ্য মেলায় এবার নতুন থিমে সাজানো হবে। থাকবে আবু সাঈদ ও মুগ্ধ কর্নার। মেলায় ই-টিকিট ব্যবস্থা থাকবে।
