কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৃত্যুর কোলে মেয়েটি

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ১১:৫৩ পিএম

জ্বর ছিল না। রক্তে প্লাটিলেটও ঠিক ছিল। শুধু রক্তচাপ কমছিল। শেষে এতই কমে যায় যে, ঠিকমতো স্যালাইনও নিতে পারে না শরীর। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসে শরীর। ফুসফুসে পানি জমে যায়। হাসপাতালের বিছানায় মেয়েকে জড়িয়ে রাতভর নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে বাবা-মা। এক সময় ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই নিভে যায় আরেক আলো শিশু রিফাহ’র জীবন প্রদীপ।

রিফাহ নানজীবা। রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ধানমন্ডি প্রভাতি শাখার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। থাকত মিরপুর-১ নম্বরে। দুই বোনের মধ্যে সেই বড়। ছোট বোন একই স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়েই শনাক্তের মাত্র চার দিনেই  ডেঙ্গুতে মারা যায় শিশু রিফাহ।

রিফাহর বাবা রায়হানুল হক। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের এটুআইয়ের একজন কনসালট্যান্ট। বাড়ি গাইবান্ধা। রিফাহকে গাইবান্ধায় দাফন করা হয়েছে।

রিফাহর বাবা জানান, এবারই প্রথম ডেঙ্গু হয়েছিল শিশুটির। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে একবার জ্বর হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষায় ডেঙ্গু নেগেটিভ আসে। এবার ঠিক কীভাবে আক্রান্ত হলো, তা বুঝতে পারছেন না তিনি।

রায়হানুল হক বলেন, ‘২২ নভেম্বর শুক্রবার সকালে রিফাহর জ্বর আসে। নাপা দিই জ্বর কমার জন্য। একবার কমে গেল। পরে আবার জ্বর এলো। পরদিন শনিবার ডাক্তার দেখাই ও ডেঙ্গু টেস্ট করি। সেদিন রাতে আবার জ্বর চলে যায়। পরদিন রবিবার। জ্বর নেই। কিন্তু শরীর খুব দুর্বল। বিছানা থেকে উঠতে পারে না। শুয়ে থাকে। আমি অফিসে না গিয়ে ওর সঙ্গে শুয়ে থাকলাম। পরে সন্ধ্যায় চিকিৎসকের কাছে যাই ও রিপোর্টে ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। কোনো উপসর্গ না থাকলেও মেয়েটার অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। চিকিৎসক বললেন যে, অবস্থা ভালো না, পালস কমে আসছে, রক্তচাপ কমে আসছে। ওকে হাসপাতালে ভর্তি করান।’

তিনি জানান, প্রথমে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় রিফাহকে। সেখানে স্যালাইন দেওয়া হয়। ওর রক্তচাপ পাওয়া যায়। কিন্তু পরদিন সোমবার আবার রক্তচাপ কমে যায়। তখন শিশু হাসপাতাল থেকে বলে সেখানে আইসিইউ আছে কিন্তু বেড ফাঁকা নেই। আইসিইউ লাগবে। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, তারা শিশুটির আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) চিকিৎসা শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু যেহেতু মনিটর নেই, তাই মনিটরিংটা করতে পারছেন না। আইসিইউতে নিয়ে যেতে হবে। সেদিনই ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় রিফাহকে। সেখানে আইসিইউ বেড পাওয়া যায় ও ওকে ভর্তি করানো হয়। সেখানে সেদিন বিকেল পর্যন্ত শরীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু রাতে আবার খারাপ হয়। তারপরের দিন মঙ্গলবার ভোর ৬টার দিকে মারা যায় শিশুটি।

বাবা রায়হানুল হক বলেন, ‘প্লাটিলেট নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না। যেদিন ডেঙ্গু হয়, সেদিন প্লাটিলেট ছিল ২ লাখ ৫ হাজার। তারপর শিশু হাসপাতালে কমে হয়েছিল ৮৫ হাজার। আবার আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার। ওর সমস্যা ছিল ওর রক্তচাপ কমে যাচ্ছিল। প্রেশার না থাকার কারণে ফুসফুসে পানি জমে যায়। সে কারণে স্যালাইন দিলেও তা পাস হচ্ছিল না।’

তিনি আরও বলেন, ‘মৃত্যুর আগের মধ্যরাতে হঠাৎ ওর পানি তেষ্টা পায়। আমরা দুজন (বাবা-মা) ওর দুপাশে। ডাক্তাররা পানি দিতে বারণ করেছেন। কিন্তু মেয়েটা পানির জন্য আবদার ধরে। শেষে ওকে পানি দেয় ওর মা। সেই ওর শেষ পানি।’

রিফাহকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে রায়হানুল বলেন, ‘মেয়েটা আমার খুবই শান্তশিষ্ট। লেখাপড়ায়ও ভালো ছিল। ছবি আঁকত। কত স্বপ্ন ছিল ওকে নিয়ে। সবকিছু মিথ্যা করে আমাদের একা করে চলে গেল মেয়েটা।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত