আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের অন্তত দুই শতাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা আত্মগোপনে থাকলেও তাদের আস্থাভাজনরা (সিন্ডিকেট) আছেন বহাল তবিয়তে। তারা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। সেখান থেকে কৌশলে বাহিনীর গোপন তথ্য পলাতক কর্তাদের কাছে পাচারও করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, পুলিশের মধ্যে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট কাজ করবে না। যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের বিষয়ে তদন্ত শেষে নেওয়া হবে ব্যবস্থা। নিরপরাধ পুলিশের কোনো সদস্যকে হয়রানি করা হবে না।
এদিকে, আত্মগোপনে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। চলতি মাস থেকেই তা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তাছাড়া তাদের বিষয়ে পুলিশের সর্বোচ্চ সংস্থা ইন্টারপোলের দ্বারস্থ হচ্ছে পুলিশ। ইতিমধ্যে তাদের প্রোফাইল সংগ্রহ করেছে পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল বিভাগ। নির্দেশনা আসার পরপরই ইন্টারপোলের সদর দপ্তরে পাঠানো হবে তালিকাটি।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, আত্মগোপনে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হওয়ার পরও তাদের আস্থাভাজনরা আছেন বহাল তবিয়তে। আবার কিছু সৎ ও নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মকর্তাদের আসামি করায় কিছুটা সমালোচনা হলেও যারা জুলাই-আগস্টের হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকায় মামলা হয়েছে, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই আসামি রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের আদৌ আইনের আওতায় আনা যাবে কি না, তাও নিয়ে দেখা দিয়েছে সন্দেহ।
জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট থাকবে না। কেউ সিন্ডিকেট করার চেষ্টা করলে তাদের আইনের আওতায় এনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গণঅভ্যুত্থানে অতি বল প্রয়োগ করা পলাতক পুলিশ সদস্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। যারা দেশে আছেন, তাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হবে। যারা দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন, তাদের আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা হবে। পুলিশের কিছু সদস্য বাড়াবাড়ি করেছেন তা সত্য। পুলিশকে আরও জনবান্ধব করার চেষ্টা চলছে।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তকে জানায়, কোটা সংস্কার নিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দমনপীড়ন চালায়। গুলিতে শিক্ষার্থী ও নিরীহ লোকজন, পুলিশ, আনসারসহ দেড় হাজারের মতো প্রাণ হারিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা এই প্রথম। এ নিয়ে দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় বইছে এখনো। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। একপর্যায়ে তিনি গোপনে পালিয়ে যান ভারতে। আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গ সংগঠনের বড় বড় নেতা চলে যান আত্মগোপনে। তাদের মতোই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষকর্তা থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত থাকেন আত্মগোপনে। পুলিশের খাতায় ১৮৭ জন পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে আছেন অনুপস্থিত। তাছাড়া প্রায় ২৫ জনের মতো হয়েছেন গ্রেপ্তার। তাদের রিমান্ডে নিয়ে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় পুলিশ বেপরোয়া বলপ্রয়োগ করার কথা স্বীকার করেছেন তিনি।
পুলিশ সূত্র জানায়, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক সিআইডি প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া এবং এসবির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলামের আস্থাভাজনরা এখনো বিভিন্ন দপ্তরে বহাল তবিয়তে। তার মধ্যে শেখ সুরাইয়া ঊর্মি, এসি (প্রকিউরমেন্ট) লজিস্টিকস বিভাগ নিয়োগ দেন হাবিবুর রহমান। তাদের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ। তার বিরুদ্ধে ভুয়া বিল ও টেন্ডারের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া ঊর্মির সঙ্গে সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়ার অশ্লীল ফোনালাপ ভাইরাল হয়েছিল। পুলিশ পরিদর্শক নাজমা আক্তার ওসি রেশন স্টোর হিসেবে প্রায় চার বছরের অধিক সময় কর্মরত আছেন। হাবিবুর রহমানের আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবেই পরিচিত আসমা আক্তার সোনিয়া এসি সিআরও হিসেবে কর্মরত আছেন। সোনিয়া নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। টাকা সংগ্রহের দায়িত্বে ছিল কেন্দ্রীয় রিজার্ভ অফিসে কর্মরত এসআই খবিরুল ও এসআই মাহফুজা। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. মহিউদ্দিন ও টিআই মানব শাহজাদা, ওসি-রেশন ইন্সপেক্টর মো. বদিউজ্জামান, ওসি-এমটি এসআই ফারুক, আরওআই আসমাউল হোসনা, আরও-১ এসআই জিয়াউর রহমান, আরও (ফোর্স) এসআই ফুয়াদ বিন রশিদ কর্মস্থলে থেকে এখনো সক্রিয় আছে নানা অপরাধে। তারা সাবেক সিআইডির প্রধান মোহাম্মদ আলীর আস্থাভাজন। তাদের বিরুদ্ধে রেশনসহ নানা কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ আছে। তাদের মধ্যে কেউ বদলিবাণিজ্যতেও লিপ্ত আছে। গত ৬ আগস্ট রাত ৮টায় সিআইডি অফিসের লাইট বন্ধ করে আন্ডারগ্রাউন্ডের লিফট ব্যবহার করে গ্যারেজে দুটি মাইক্রোবাসে করে ৩২ বস্তায় টাকা ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে গেছে। এসবির মেস ম্যানেজার এসআই মিলন মিয়া ও আরও-১ মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধেও আছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। তারা দীর্ঘদিন ধরে একই স্থলে কর্মরত আছেন। তার মধ্যে মিলন মিয়া সারা দেশের রেশন বিক্রি করার সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের আস্থাভাজনরা এখনো সক্রিয়। তারা নানা কায়দায় তথ্য পাচার করছেন বলে অভিযোগ আছে। তাদের মধ্যে অনেকেই ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগবিরোধী হওয়ার চেষ্টা করছেন। এই চেষ্টা করে কেউ সফল হয়েছেন। আবার কেউ ব্যর্থ হচ্ছেন। এমনকি অর্থ খরচ করে ভালো স্থানে পোস্টিং নিয়েছেন। যেসব কর্মকর্তা পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন তারা কিন্তু গত ১৬ বছর সব ধরনের সুযোগ নিয়েছেন। তারা ওই সময়ে চাকরিচ্যুত হননি। অথচ এখন তারা বিশাল আওয়ামী লীগবিরোধী হয়ে আছেন। তিনি আরও বলেন, মামলা হওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে কিছু কর্মকর্তা পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তার নাম আছে। গত সরকারের আমলে তারা ভালো অবস্থানে থাকলেও কখনো অন্যায়কে প্রশয় দেননি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনবিরোধী ছিলেন না। পুলিশের কতিপয় কর্মকর্তার যোগাসজশে তাদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে। এমনও পুলিশ সদস্য আছেন তারা সিনিয়র কর্মকর্তাদের গায়ে পর্যন্ত হাত তুলেছেন। তাদের মামলা থেকে নাম দ্রুত বাদ দিলে পুলিশের জন্যই মঙ্গল। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পলাতক পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের বিষয়ে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। সরকারের নির্দেশেই পলাতকদের বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আত্মগোপনে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের আস্থাভাজনরা এখনো ভালো স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটিতে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের তথ্য তাদের কাছে ফাঁস করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি সরকারের হাইকমান্ডকে অবহিত করা হয়েছে।
জানা গেছে, ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও গুলি করে আহত করার সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ ছাত্র-জনতাকে খুনের বা গুলি করার অভিযোগ এনে এরই মধ্যে ২৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা-সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন নিহত-আহতের পরিবারের সদস্যরা। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর আন্দোলনকারীদের প্রথম দাবি ছিল ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা, যা এখন শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য আর স্লোগানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হত্যা মামলার আসামি পুলিশ কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধা নিয়েছেন। এমনকি তারা নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তার মধ্যে সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারের বিরুদ্ধে একটি, সাবেক আইজিপি শহীদুল হকের বিরুদ্ধে ১০টি হত্যাসহ ১৪টি, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে চারটি, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে ১০৫টি, সাবেক ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক, ডিএমপির সাবেক পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়ার বিরুদ্ধে চারটি, এসবির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২৩টি হত্যাসহ ২৫টি, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ৮৭টি হত্যাসহ ৮৯টি, সাবেক সিআইডি প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচটি, সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে ২৩টি, পিবিআইয়ের সাবেক প্রধান বনজ কুমার মজুমদারের বিরুদ্ধে হত্যাসহ দুটি, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি কৃষ্ণপদ রায়ের বিরুদ্ধে পাঁচটি হত্যাসহ সাতটি, র্যাবের সাবেক ডিজি মোখলেছুর রহমানের বিরুদ্ধে দুটি, অতিরিক্ত আইজিপি সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে একটি, র্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশিদ হোসেনের বিরুদ্ধে চারটি, ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার হাফিজ আক্তারের বিরুদ্ধে ৫০টি, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে পাঁচটি, সিটিটিসির সাবেক ডিআইজি আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৯টি হত্যাসহ ১৪টি মামলাসহ অন্য কর্মকতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
