কোটার ‘কাঁটা’

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:২৮ এএম

পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মেধাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এখানে পারিবারিক সুবিধাপ্রাপ্তির কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টা এ রকম না যে স্বর্ণকারের ছেলে স্বর্ণকার, চর্মকারের ছেলে চর্মকার, নাপিতের ছেলে নাপিত বা হরিজনের ছেলে হরিজন হবে। যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং মেধার প্রতিযোগিতা সেখানে ‘কোটা’ ব্যবস্থা কতটুকু প্রয়োজন, তা ভাবা দরকার।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং চাকরির ক্ষেত্রে যারা কোটা সুবিধা ভোগ করেন, বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তারাও মেধাবী কিন্তু চূড়ান্ত যোগ্যতার ভিত্তিতে নন। তবে এমন কথার অর্থ এই নয় যে, ভর্তি এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটার দরকার নেই। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছিল। বিশেষভাবে মুক্তিযোদ্ধা ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য এটি চালু করা হয়। সংবিধানের ২৯ (১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগের সমতা থাকবে।’ কিন্তু কোটাধারীরাই ভর্তি এবং নিয়োগ লাভের ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা ভোগ করছে। এর মধ্যে পোষ্য কোটা চালু থাকার কারণে সরকারি চাকরিজীবী যারা, তাদের সন্তানরা পোষ্য কোটার মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। ফলে যোগ্য ও মেধাবী চাকরিপ্রার্থীদের পদবঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা কয়েকগুণ বেশি। প্রসঙ্গত, পোষ্য  কোটাধারীরা যে একেবারেই যোগ্য-মেধাবী নয়, তা বলা সম্পূর্ণ ঠিক না। 

দীর্ঘদিন সরকারি চাকরি কোটা সিস্টেমের মাধ্যমে আটকে ছিল। সেখানে ৫৬ শতাংশ আসন কোটায় নিয়োগ হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা ৩০, জেলা ১০, নারী ১০, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ এবং প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ বরাদ্দ ছিল। একটি দেশের সরকারি চাকরির মোট আসনের ৫৬ ভাগ যখন কোটা দ্বারা পূরণ হয়, তখন ওই দেশের মেধাবীদের অবস্থা কী তা বোঝার জন্য অতিমেধাবী হওয়ার দরকার নেই। যদিও কোটা সুবিধাপ্রাপ্তরা মেধার সমস্ত স্তর পার হয়ে কেবল মৌখিক পরীক্ষার সময়ই এই সুবিধা পেয়েছেন। এবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৯৩ শতাংশ শিক্ষকই মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগে পোষ্য কোটা থাকছে না বলেও তিনি জানিয়েছেন। কোটার নতুন বিন্যাস ঠিক করে দেওয়া হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী সব গ্রেডের নিয়োগে ৭ শতাংশ কোটা রেখে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ১ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা।

অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় পোষ্য কোটা বাতিল দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। তারা পোষ্য কোটা বাতিলের জন্য  জোরালো দাবি তুলেছেন। তবে এখনো এটি বহাল রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এমন পরিস্থিতিতে পোষ্য কোটা বাতিল বা বহালের সিদ্ধান্ত নিয়ে উভয়সংকটে পড়েছেন তারা। রাবিতে গত বছরের ভর্তি পরীক্ষায় ৪ শতাংশ পোষ্য কোটা সুবিধা পেয়েছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সন্তানরা। তার আগের ভর্তি পরীক্ষাগুলোয় যা ৫ শতাংশ ছিল। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা একটি চমৎকার উদ্যোগ নিয়েছেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে শিক্ষকদের পোষ্য কোটার যৌক্তিকতা নিয়ে উন্মুক্ত বিতর্কের আহ্বান জানিয়েছেন। বিতর্কে শিক্ষকরা যদি পোষ্য কোটার যৌক্তিকতা দেখাতে পারেন, তাহলে বহাল থাকবে। শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই কমবেশি এই কোটা রয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কোটাব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সেখানে দলিত, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে তাদের মূল জনগোষ্ঠীর স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনতে কোটাব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। ভারতে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটাব্যবস্থার যে সুবিধা রাখা হয়েছে তার পরিমাণ খুবই সীমিত। পরবর্তী সময়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অবস্থার উন্নতি ঘটলে কোটাব্যবস্থার সংস্কার করা হয়। পাকিস্তান এবং ভারতের ক্ষেত্রে সংস্কার হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং চাকরির ক্ষেত্রে কোটার প্রয়োজনীয়তা ঠিক কতটুকু, তা বিশ্লেষণ করা দরকার। আদৌ কি মেধা এবং যোগ্যতা নির্ধারণে কোটা দরকার, নাকি এটি মেধা বিশ্লেষণে কাঁটার আঘাত!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত