৩-৪ মাসের মধ্যে সংস্কার শেষে নির্বাচন চায় বিএনপি

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:৩৮ এএম

প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ করে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা। এ ছাড়া ভোটার তালিকা হালনাগাদে বাড়ি বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্তেরও বিরোধিতা করা হয়েছে দলটির পক্ষ থেকে। ‘বড় ধরনের সংস্কার করে নির্বাচন’ আইএমএফের এক উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এমন বার্তা দেওয়ার পরদিন গতকাল সোমবার বিএনপির পক্ষ থেকে ভোটার তালিকা ও নির্বাচন নিয়ে এ মন্তব্য করা হয়। গতকাল বিকেলে রাজধানীর গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারে গঠন করা কমিশনে বিএনপির জমা দেওয়া প্রস্তাব তুলে ধরতে ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও সালাহউদ্দিন আহমেদ।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সঠিক ভোটার তালিকা প্রণয়নে ‘বাড়ি বাড়ি যাওয়া নয়, ‘আপগ্রেড (হালনাগাদ)’ চায় বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে এও বলা হয়েছে, বিএনপি সংবিধান সংস্কার কমিশনে যে প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে আগামী নির্বাচন করতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন নেই। বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বলেছে। এ ছাড়া সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির নির্বাচন সংস্কারবিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে সঠিক ভোটার তালিকা আমরা করতে চাইলে বাড়ি বাড়ি যাওয়া নয়, এআইর মাধ্যমে আজকে প্রযুক্তিতে কম্পিউটারকে বলে দিলে, সে নিজেই করে দিতে পারে। সেটা অ্যাাবসুলেটলি সঠিক হবে। কোন দিন কে ১৮ বছর হয়ে যাবে সেটাও কম্পিউটার করে দিতে পারে। সেটার জন্য বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাড়ি বাড়ি যাওয়া এটা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ, অপ্রয়োজনীয় এবং এটাতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। যিনি মারা গেছেন তার নামটা অটোমেটিক্যালি বাদ চলে যাবে। এই বিষয় (ভোটার তালিকা) আমরা সংস্কার প্রস্তাবে স্পষ্ট করেছি। এটা আপগ্রেড হবে।’

বিগত সরকারের আমলে আরপিওর সংশোধনে যে সম্পূরক আদেশ এনেছিল তা বাতিল, নির্বাচনী পরিচালনায় কিছু বিধিমালা সংশোধন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য আচরণবিধিমালা ও রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের নীতিমালা সংশোধন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালা আপগ্রেড করা, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গণমাধ্যমের নির্বাচনী আচরণ বিধিমালাসহ ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন ড. মঈন খান। তিনি জানান, এ সংস্কার প্রস্তাবগুলো তারা সরকারের গঠিত নির্বাচন সংস্কার কমিশনে জমা দিয়েছেন।

ড. মঈন বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য যাতে সত্যিকারভাবে মানুষ নিজের ভোট নিজে দিতে পারে এবং জনগণের সত্যিকার প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারে, ডামি, ভুয়া প্রতিনিধি নয়, সেজন্য আমাদের এ সংস্কার প্রস্তাব। প্রশাসনের মাধ্যমে নির্বাচনকে কুক্ষিগত করতে বিগত সরকার অনেক কিছু করেছে। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তারা যাতে রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করতে না পারে, তারা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে, সেজন্য আমরা ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রণীত বিধিমালার সংশোধন চেয়েছি।’

দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা যেসব প্রস্তাব করেছি এগুলো দিয়ে দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব। এখানে এমন কোনো প্রস্তাব করা হয়নি, যেটা নতুন করে কোনো কিছু করতে হবে। আমরা নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করার কথা বলেছি, নির্বাচনের সচিবালয় করা এবং তাদের কিছু ক্ষমতা দেওয়া, প্রচলিত আইনগুলোর সংশোধন করতে বলেছি। এগুলোর জন্য অধিক সময়ের প্রয়োজন হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটা নির্বাচনের বেসিক কাজ ভোটার তালিকা প্রণয়ন। সেই ভোটার তালিকা প্রণয়নে বাড়ি বাড়ি যাওয়া। আমরা এটা বুঝিনি কী এক্সারসাইজ হবে। ব্যাপারটা হচ্ছে, তালিকা ঘোষণার সময়ে এটাও ঘোষণা করা হয় যে, কারও নাম যুক্ত না হলে তাহলে তারা স্থানীয় নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে গিয়ে নাম অন্তর্ভুক্ত করবেন। কারও অভিযোগ থাকে, বেঁচে নেই, বিভিন্ন কারণে ভোটার হওয়া যায় না এরকম কারও নাম তালিকায় থাকলে তা কার্যালয়ে গিয়ে জানালেই তো ভোটার তালিকা হয়ে গেল। এরপর নির্বাচনী প্রস্তুতি শিডিউল ঘোষণা করা, রুল অনুযায়ী প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করবে। এসব কিছু করতে এত বেশি সময় লাগার কথা নয়। আমরা যেসব প্রস্তাব দিয়েছি সেগুলো মেনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে খুব বেশি বিলম্ব হওয়ার প্রয়োজন হয় না।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা যেসব সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছি, সেটি দলের পক্ষ থেকে সুচিন্তিতভাবে, অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটির সঙ্গে বসে, কথা বলে দিয়েছি। এসবের অধিকাংশ আইনি সংস্কারের বিষয়, কাগজের বিষয়। প্র্যাকটিকালি যে কাজগুলোর জন্য নির্বাচন কমিশন সময় নেয়, যেমন ভোটার তালিকা প্রণয়ন, নতুন ভোটার সংযোজন, কী কী ভুলভ্রান্তি আছে, ভুয়া ভোটার স্ক্রুটিনি করা, পরে নির্বাচনী অফিসার নিয়োগ, ডিলিমিটেশন ইত্যাদি সব কাজ গোছাতে প্র্যাকটিকালি দুই-তিন মাসের বেশি সময় লাগার কথা নয়।’

এ বিএনপি নেতা আরও বলেন, ‘সরকারের আরও প্রশাসনিক সংস্কার, জুডিশিয়াল সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংস্কার আছে। এগুলো সব সম্পন্ন করে নির্বাচন উপহার দিতে আমাদের মনে হয় না খুব বেশি হলে তিন-চার মাসের বেশি সময় লাগবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ফ্রি ফেয়ার ইলেকশন না হওয়াটাই ছিল বড় বাধা। ডিলিমিটেশন (সীমাবদ্ধতা), অপকর্মে জড়িতদের নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে বাদ রাখা এসব হচ্ছে উপসর্গ। আসল রোগ হচ্ছে, কেয়ারটেকার সরকার না থাকাটা। কেয়ারটেকার সরকার পুনর্বহাল হলে এসব উপসর্গ আর থাকবে না। কেয়ারটেকার সরকার হলে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে বাধ্য।’

স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা প্রস্তাব করেছি যাদের নেতৃত্বে অপকর্ম হয়েছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তারা বিতাড়িত হয়েছে, পলায়ন করেছে; যাদের মাধ্যমে অপকর্ম করা হয়েছে তাদের ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছি। যাতে তারা আগামীতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় না থাকে। আমরা বিশ্বাস করি, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকছে তারা নির্বাচনে নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে।’

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল জবিহউল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত