মংডুর পতনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নতুন অঙ্ক

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:৪২ এএম

মিয়ানমার কি ভেঙে যাবে? প্রশ্নটি এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক; কারণ হলো মিয়ানমারের অন্যতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান সীমান্তরেখা এখন অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর কব্জায় চলে গিয়েছে। গত বছরের মাঝের কিছুটা আগে থেকে মিয়ানমারে সামরিক জান্তা বাহিনীর ক্রমান্বয়ে পরাজয়ের যে ধারাবাহিকতা দেখা গিয়েছিল, তারই সর্বশেষ নজির রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরের পতন। আরাকান আর্মি গত রবিবার (৯ ডিসেম্বর) মংডুর শেষ ঘাঁটিতে জান্তা বাহিনীকে পরাজিত করেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ২৭০ কিলোমিটারের বিস্তৃত সীমানা রেখার অদূরে মংডু শহরের অবস্থান। এবার সেখান থেকেই জান্তার অনুগত বাহিনী উচ্ছেদ হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগের জন্য মংডু বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আরাকান বিদ্রোহীদের এই সাফল্য তাদের যুদ্ধকৌশলের জন্য অভূতপূর্ব এক অর্জন। মিয়ানমারে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) সরকারকে উৎখাত করে সামরিক বাহিনী। তখন থেকে গণতন্ত্রপন্থিদের লড়াইয়ের সঙ্গে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মৈত্রী প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হতে থাকে। চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকে সেই সম্মিলিত লড়াই তীব্র আকার ধারণ করছিল। আরাকান যোদ্ধাদের সাফল্য তারই ধারাবাহিকতা।

সীমান্ত থেকে জান্তার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি উচ্ছেদ হওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে জটিল। কারণ, মংডু রোহিঙ্গা বসতির অন্যতম এক কেন্দ্র। সেখানে ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা। বাংলাদেশ প্রায় ১৫ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা সামরিক জান্তার আক্রমণে বিতাড়িত হয়ে এ দেশে আশ্রয়প্রাপ্ত। কক্সবাজার ও বান্দরবানের শরণার্থী শিবিরে ঠাঁই পাওয়া এসব রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ আজও দেখা যায়নি। নতুন এ বাস্তবতায়, রাখাইনের এসব বিতাড়িত মানুষজনের দেশে ফেরার জন্য যে সম্ভাব্য দেন-দরবার প্রয়োজন; তাতে প্রতিনিধিত্ব করবে কে? এ প্রশ্নের জবাব তো দূরে থাক, এ জিজ্ঞাসা আমলে নেওয়ার মতো কর্র্তৃপক্ষই এখন নেই। অথচ ঢাকার জন্য এই প্রশ্নের উত্তর জরুরি।

মিয়ানমারের জাতিগত সশস্ত্র বাহিনীগুলো দেশটির নানা প্রান্তে সশাসন কিংবা জাতীয় মুক্তির জন্য লড়াই করে আসছে যা দীর্ঘদিনের ইতিহাস। নেপিদো-কেন্দ্রিক বামার জনগোষ্ঠীর শাসনের বিরুদ্ধে দেশটির প্রান্তে প্রান্তে বসবাসরত জাতিগোষ্ঠীর ক্ষোভ আজকের নয়, বহু দিনের। এর অংশ হিসেবে আরাকান বিদ্রোহীরা নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণের কথা বলে লড়াই করে আসছে। তাদের নিয়মতান্ত্রিক ও সশস্ত্র ধারার রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস পুরনো। অনেক দিন জান্তার সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে থাকলেও আরাকানদের নব-উদ্দীপনার লড়াইয়ের শুরু হয় গত বছর। সে সময় আরও দুটি জাতিগত বিদ্রোহী সংগঠনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ গঠন করে আরাকানদের বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। গত বছর থেকে আরাকান বিদ্রোহীদের পাশাপাশি এই জোটভুক্ত বাকি দুই সংগঠন তায়াং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) ও মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) ব্যাপক সাফল্য পেয়ে আসছিল। চীন সীমান্তবর্তী রাজ্যের এই দুটি সংগঠন জান্তা বাহিনীকে বিতাড়িত করে বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করে। সেই সময় অনেক বিশ্লেষকই বলেছিলেন, ঢাকার উচিত নেপিদোর পাশাপাশি রাখাইনের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করা। বিশ্লেষকদের এই যুক্তি ফেলে দেওয়ার ছিল না। কারণ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নেপিদোর আগ্রহ, উদ্যোগ ও আন্তরিকতার কিছুই দেখা যায়নি। আর এখন রাখাইনের শাসক হিসেবে জান্তা বাহিনীর কর্র্তৃত্বও আর নেই। সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর রাস্তা খুঁজতে হলে জেনারেল তাওয়ান ম্রাত নাইংয়ের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে।

২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আরাকান আর্মি নিজেদের শক্তিতে যেহেতু সফল অভিযান পরিচালনা করে আসছে; সেহেতু বিদ্রোহীদের বাদ দিয়ে শান্তি, প্রত্যাবাসন বা আন্তঃসীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি সম্ভব নয়। ২৫ জন তরুণের বাহিনী এখন হাজার হাজার সেনার যোদ্ধা দল। মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের স্বাভাবিক নজরদারি চালাতেও নতুন কৌশল অপরিহার্য। পৃথিবীর অনেক অরাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে বোঝাপড়া করতে দেখা গেছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সরকারকে। তাই আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ জরুরি। এখন আরাকান বিদ্রোহীদের সঙ্গে সেই যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া উপায় নেই। ঢাকা যদি রোহিঙ্গাদের নিয়ে নিজের প্রত্যাশামাফিক ফলাফল চায়, তাহলে প্রথাগত কূটনীতির চাদরে তা সম্ভব হবে না। প্রত্যাবাসনের জন্য ঢাকা-নেপিদোর বাইরের পন্থাগুলোকেও বিবেচনায় আনতে হবে। 

আরাকান আর্মি মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াইরত সব জাতিগত অস্ত্রধারী বাহিনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা বলে থাকেন, আরাকানদের জাতীয় মুক্তির লড়াই ইতিহাসের সবচেয়ে সাফল্যজনক অধ্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। কারণ হলোÑ চীন ও ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের গতিপ্রকৃতি (ডায়নামিকস) এখানে জটিল এবং আরাকান যোদ্ধাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে; যার ফলে দুই পরাশক্তির নিজ নিজ স্বার্থ আরাকান বাহিনীর জন্য ক্ষতির কারণ হচ্ছে না। যেমন থ্রি ব্রাদারহুড-ভুক্ত বাকি দুই সংগঠন চীন সীমান্তবর্তী হওয়ায় কারণে তাদের বেইজিংয়ের আলোচনার টেবিলে যেতে হয়েছে। এক্ষেত্রে আরাকান আর্মির ভাষ্য, চীন ও আরাকান ভূমির জাতীয় স্বার্থ আলাদা, যার কারণে বেইজিং আরাকানদের লড়াইয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। সত্যিকার অর্থে, আরাকানদের দাবিটি ভিত্তিহীন নয়। চীন সুদূর থেকে আরাকানের মাটিতে শুধু তার বিনিয়োগের নিরাপত্তা চায়। আরাকানের বিদ্রোহী নেতাদের কথাবার্তায় এটুকু পরিষ্কার, চীনের সঙ্গে পথ চলতে তাদের সমস্যা হবে না।

আরাকানদের সঙ্গে ভারতকেও বোঝাপড়ার পথেই হাঁটতে হচ্ছে। এখন নয়াদিল্লির মূল চাওয়া হচ্ছে, ‘কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্পটি যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। এটি ভারতের সাত বোন রাজ্যের (সেভেন সিস্টার্স) সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোর সংযোগ তৈরি করবে, যা থাইল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পথটি যাবে রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তে শহর হয়ে। এ কারণে ভারতের দিক থেকেও আরাকানদের সঙ্গে যোগাযোগ অনিবার্য ছিল। ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অনুমান, দিল্লির সঙ্গে আরাকান বিদ্রোহীদের যোগাযোগ বিকশিত হয়েছে; যদিও তা সামনাসামনি ততটা দৃশ্যমান নয়। আবার ভারতের দিক থেকে আরাকান-প্রশ্নটি ছাড় দেওয়ার সুযোগও নেই; কারণ, চীন কিয়াকফাউয়ের গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প নিয়ে আগ্রহী হলেও ভারতের কাছে তা নিরাপত্তা ঝুঁকি।

ভারত ও চীনের নিজ নিজ স্বার্থ সুরক্ষার প্রয়োজনে তারা কেউই আরাকান যোদ্ধাদের হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে না। তা ছাড়া দুই শক্তিই বুঝতে শুরু করেছে, আরাকানদের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর চেষ্টা সম্ভবত বৃথা। দুই পরাশক্তি নিজ নিজ স্বার্থে তাদের সঙ্গে ছায়া-কূটনীতি শুরু করেছে বহু আগেই। বাংলাদেশের জন্য আরাকান অধ্যায়কে নতুন করে পর্যালোচনা করাটা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। দুই পরাশক্তির বিষয়টি স্বার্থতাড়িত, আর বাংলাদেশের কাঁধে তা বোঝার মতো একটি সমস্যা। এ কথা অনস্বীকার্য, আগামী দিনে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আলোচনায় আরাকানরাই প্রতিনিধি। এদিকে ঢাকার জন্য রোহিঙ্গা সমস্যা এরই মধ্যে জটিল আকার ধারণ করেছে। যেহেতু রোহিঙ্গাদের অনেকে সামরিক জান্তা বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে যুদ্ধ করছিল, তাই আরাকানরা বৃহত্তর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে এখন কী মনোভাব দেখায়, তা বিবেচনার বিষয়। মংডু দখলের দিনে আরাকান যোদ্ধারা বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, তারা অনেক মুসলিম যোদ্ধাকে গ্রেপ্তার করেছে। রাখাইনের একটি স্থানীয় ইংরেজি সংবাদমাধ্যম আরাকানদের উদ্ধৃতি দিয়ে সর্বশেষে অগ্রযাত্রার খবর দিয়েছে এভাবেÑ ‘(মিয়ানমারের) ১৫তম মিনিয়ারি অপারেশনস কমান্ডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থুরেইন তুন আরাকান আর্মির হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর পাশাপাশি ৮০ জনেরও বেশি মুসলিম যোদ্ধা ও সামরিক কর্মকর্তা আটক হয়েছেন, যখন তারা মংডুর নাখাখা-৫ বর্ডার গার্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন চৌকি ছেড়ে পালাচ্ছিলেন।’

আরাকান আর্মি মংডু দখলের আগে ও পরে নানা সময়ে অভিযোগ করে আসছিল, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা), আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ) এবং রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) সামরিক জান্তার হয়ে এই লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছে। রোহিঙ্গাদের প্রধান তিন সংগঠনের বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ বেশ হতাশাজনক, অন্তত বাংলাদেশের স্বার্থের প্রশ্নে। কারণ, রোহিঙ্গা অস্ত্রধারীদের এ ধরনের আচরণ আগামী দিনের সম্ভাব্য আলোচনার পথে বড় সংকট তৈরি করতে পারে। আরাকান আর্মি বলে আসছে, রোহিঙ্গা সংগঠনগুলোর এসব কর্মকাণ্ডের অনেক কিছুই নাকি উখিয়া-টেকনাফের শরণার্থী শিবির থেকে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ রোহিঙ্গা-সমস্যাকে নিয়ে কাজ করার প্রেক্ষাপটটি ঢাকার জন্য আরও জটিল হয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে নির্বাচিত সরকার নেই। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা অস্পষ্ট।

এ পর্যন্ত আরাকান যোদ্ধারা মংডু ও বুথিডং ছাড়াও পাশের চিন রাজ্যের পালেতওয়া বন্দর দখল করে নিয়ে নিয়েছে। এসব অঞ্চলে এখন আরাকান নিয়ন্ত্রণাধীন শাসন চলছে। আরাকান আর্মির এখনকার লক্ষ্যÑ গোয়া, তাউংগুপ ও অ্যান শহরের দখল নেওয়া। আরাকান আর্মি আক্রমণের গতি ধরে রাখতে পারলে, সেই অর্জন হতে বেশি সময় লাগবে না। মোটামুটিভাবে, সামরিক জান্তার নেপিদোকেন্দ্রিক শাসনের বৃত্ত ভেঙে আরাকান জনগোষ্ঠী জাতীয় মুক্তির দিকে এগোলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যদি তাই হয়, দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র এক নতুন অধ্যায়ে পা রাখবে। নতুন এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর, ভারতের সাত বোন অঞ্চল, বিশেষত ভারত মহাসাগর ছাড়িয়ে সুদূর পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেবে। একইভাবে সামরিক জান্তার শাসনের বাইরে সম্পূর্ণ অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের প্রতিশ্রুতির ওপর ভর করে পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব তৈরি হবে আরাকানের মাটিতে। বাংলাদেশ ও তার সামুদ্রিক তটরেখার বিরাজমান বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকাকে নতুন অঙ্ক কষতে হবে। আগামীর নির্বাচিত সরকার যেন এই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত থাকে।

লেখক: অনুবাদক ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত