দুই পা হারানো সনিয়ার হাতে জয়িতা পুরস্কার

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৪:০৮ এএম

দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় হারিয়েছেন দুই পা। মাত্র সাত-আট বছর বয়সে পায়ের রক্তনালি ব্লক হয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অনেক হাসপাতাল ঘুরেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে কেটে ফেলতে হয় দুই পা। তখন থেকেই শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আটকে রাখতে পারেনি তাকে। শত বাধা পেরিয়ে তিনি এগিয়েই চলেছেন বিজয়ীর বেশে। তিনি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থী সনিয়া আক্তার (১৯)। এবার রোকেয়া দিবসে শিক্ষা ও চাকরি ক্যাটাগরিতে বিশেষ বিবেচনায় সেরা জয়িতার সম্মাননা পান তিনি।

সনিয়ার বাড়ি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার রাজিবপুর ইউনিয়নের উজান-চরনওপাড়া গ্রামে। কৃষক বাবা রইছ উদ্দিনের অভাব-অনটনের ঘরে জন্ম তার। দুই ভাই আর চার বোনের মধ্যে সনিয়া তৃতীয়। হামাগুড়ি ও মায়ের কোলে চড়েই এগিয়ে চলেছে তার শিক্ষাজীবন। কৃতিত্বের সঙ্গে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে এখন তিনি অনার্সে অধ্যায়নরত।

গতকাল বুধবার মোবাইল ফোনে সনিয়ার মা শিউলি বেগম বলেন, ‘সনিয়াকে লইয়্যা (নিয়ে) আমি অনেক কষ্ট করছি জীবনে। পড়ালেখার প্রতি মেয়ের আগ্রহ দেখে আমি কোলে করে ক্লাসে নিয়ে যাই। এবার আমার মেয়ে সেরা জয়িতা নির্বাচিত হওয়ায় মনে হচ্ছে, আমার পরিশ্রম বৃথা যায়নি। সবাই আমার মেয়ের জন্য দোয়া করবেন।’

গত সোমবার রোকেয়া দিবস উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসন ও নারীবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের আয়োজনে সনিয়ার হাতে শিক্ষা ও চাকরি ক্যাটাগরিতে সেরা জয়িতার সম্মাননা পুরস্কার এবং সনদ তুলে দেন ইউএনও সারমিনা সাত্তার ও নারীবিষয়ক কর্মকর্তা ফাতেমাতুজ্জহুরা।

সনিয়া বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার মা-বাবা কষ্ট করে আমাকে বড় করেছেন। আমি যখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি, তখন পায়ের রক্তনালিতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে ইনফেকশন হয়। তখন আমার দুটি পা কেটে ফেলা হয়। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি, পড়াশোনা শেষ করে একটি চাকরি নিয়ে মা-বাবার দুঃখ লাঘব করে তাদের মুখ উজ্জ্বল করতে চাই। এই সম্মান আমাকে স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যেতে প্রেরণা জোগাবে।’

ঈশ্বরগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘সনিয়ার অদম্য আগ্রহ দেখে আমরা অভিভূত। রোকেয়া দিবসে সে সেরা জয়িতা নির্বাচিত হওয়ায় শিক্ষক হিসেবে তাকে নিয়ে গর্ববোধ করছি। আমরা সনিয়ার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।’

উপজেলা নারীবিষয়ক কর্মকর্তা ফাতেমাতুজ্জহুরা বলেন, ‘শিক্ষার প্রতি অদম্য চেষ্টা ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে লেখাপড়া চালিয়ে নিতে জীবনে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে সনিয়াকে। তাই তাকে উৎসাহ দিতে শিক্ষা ও চাকরি ক্যাটাগরিতে সেরা জয়িতা মনোনীত করে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।’

ইউএনও সারমিনা সাত্তার বলেন, ‘প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ওঠে আসা সনিয়া এখন অন্য শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা। সে হতে পারে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের পরবর্তী দৃষ্টান্ত। তাকে সেরা জয়িতা নির্বাচিত করতে পেরে উপজেলা প্রশাসন এবং আমি নিজেও গর্ববোধ করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত