বিদ্যুৎ খাতে চুক্তি বাতিলের কথা বলাটা সহজ হলেও তা থেকে বের হয়ে আসাটা অনেক ব্যয়বহুল বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, চুক্তি বাতিল অতটা সহজ নয়। নাইকো চুক্তি বাতিল করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেতে হয়েছে। তবুও অন্তর্বর্তী সরকার চ্যালেঞ্জটা নিয়েছে। এখন চুক্তিগুলো পর্যালোচনার মধ্যে আছে। গতকাল বুধবার ‘বাংলাদেশ জ্বালানি সমৃদ্ধি-২০৫০’ নিয়ে দ্বিতীয় জ¦ালানি সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে তিন দিনের এই সম্মেলনের আয়োজক কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সমন্বিত জোট বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিডব্লিউজিইডি)।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, অনেকের বক্তব্যে আগের সরকারের কিছু চুক্তি বা প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে, যেগুলো প্রথম থেকেই বিরোধিতার মুখে ছিল। যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়ে গেছে, সেগুলোর ঋণের বোঝাও টানতে হচ্ছে। বসিয়ে বসিয়ে টাকা দিতে হচ্ছে। আবার একই সময়ে জ্বালানি রূপান্তরেরও একটা চাপ আছে। যে ধরনের অসম চুক্তি হয়েছে, অস্বাভাবিক খরচে করা হয়েছে, তার দায় বহন করতে হচ্ছে। ‘ড্যা মেজ কন্ট্রোল’ (ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ) করতেই সরকারের অনেকটা সময় লেগে যাচ্ছে।
সম্মেলনে বক্তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে রিজওয়ানা হাসান বলেন, ঢাকায় আবাসিক ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল আছে। এটা কাজ করে কি না, তার তদারকি নেই। বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জমিটা মূল মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ আইনে নেই। তবে অধিগ্রহণ করা অব্যবহৃত জমি নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন অথবা বনায়ন করে কাজে লাগানো যেতে পারে।
সম্মেলনে জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা কারও বক্তব্যে শোনা যায়নি বলে মন্তব্য করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘টেকসই উন্নয়নের পথে না হেঁটে উল্টো বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে দুর্নীতির সুযোগ করে দেওয়াই গত সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল বলে মনে হচ্ছে। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতির সুযোগ করে দেওয়া ওইসব পদ্ধতি বন্ধ করে দিয়ে টেকসই বিদ্যুৎ নীতিমালা ও পদ্ধতি অর্জনের পথে অগ্রসর হচ্ছে। বিদ্যুতের ট্যারিফ ঠিক করতে জ্বালানি নিয়ন্ত্রক কমিশনকে (বিইআরসি) পুনর্গঠন করেছি আমরা।’ তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৪০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। শুরুতে ১০টির জন্য দরপত্র ডাকা হচ্ছে। ধাপে ধাপে বাকিগুলোর দরপত্র আহ্বান করা হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমন্বিত মহাপরিকল্পনা নতুন করে তৈরি হবে। এ ছাড়া দেশে সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতে করা চুক্তি বাতিলের বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ম তামিম। তিনি বলেন, একটি প্রকল্প বন্ধ করতে গেলে ৮ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার জরিমানা দিতে হবে, এটাই চুক্তি। অনেক চুক্তি দীর্ঘমেয়াদি। মেয়াদের আগে বাদ দিতে গেলেই আইনগত ঝামেলা আছে। আর্থিক জরিমানা তো আছেই
তারা ক্লাইমেট ফাউন্ডেশনের ডেপুটি রিজিওনাল প্রোগ্রাম ডিরেক্টর সাইনান হাউটন বলেন, ‘বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্ভাবনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি নবায়নযোগ্য শক্তির রূপান্তরকে এগিয়ে নিতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ভিয়েতনাম, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান ও চীনের মতো দেশগুলো বিদ্যুৎজ্বালানি খাতে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে, এমনকি চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতেও; আর রূপান্তরগুলো বাস্তবায়নে বছর নয়, মাত্র কয়েক মাস লেগেছে।
সম্মেলনের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন বিডব্লিউজিইডির সদস্য সচিব হাসান মেহেদী। সঞ্চালনা করেন কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের ক্যাপাসিটি বিল্ডিং উপদেষ্টা বেনজীর আহমেদ ও ইডেন মহিলা কলেজের অধ্যাপক ফাহমিদা হক।
