চোরাচালানের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরেই চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অফিস সহায়ক ওসমান সিকদার (৪০) খুন হয়েছেন বলে ধারণা করছে সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে বিমানবন্দরসংলগ্ন পতেঙ্গা চরপাড়া লিংক রোডের পাশ থেকে ওসমান সিকদারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত ওসমান হাটহাজারী উপজেলার মেখল ইউনিয়নের রুহুল্লাহ গ্রামের মো. শাহ আলম সিকদারের ছেলে। থাকতেন বিমানবন্দরসংলগ্ন সরকারি আবাসিকের বাসায় (৬/চৈতালি)। এ ঘটনায় সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে জানা গেছে।
বিমানবন্দর সূত্র জানাচ্ছে, বুধবার রাত সোয়া ১টার দিকে একটি প্রাইভেট কার নিয়ে আসে দুর্বৃত্তরা। এ সময় বিমানবন্দর কর্মচারীদের সরকারি কোয়ার্টারে ঢোকার প্রধান ফটকে (জাপানি গেট) ওই প্রাইভেট কারটি আটকান কর্তব্যরত এক আনসার সদস্য। ওই সময় জাপানি গেট থেকে আনুমানিক ৩০০ গজ অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন সিভিল অ্যাভিয়েশনের কর্মচারী (ইলেকট্রিশিয়ান) ইব্রাহিম খলিল। তিনি দূর থেকে গেটে দায়িত্বরত আনসার সদস্যকে দুর্বৃত্তদের বহন করা কারটি কোয়ার্টারে ঢুকতে দেওয়ার জন্য হাতের ইশারা দেন। গাড়িটি কোয়ার্টারে ঢোকার ১৫ থেকে ১৭ মিনিটের মধ্যে জাপানি গেট ত্যাগ করে। এ সময় ইব্রাহিম খলিল নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করলেও ধরা পড়ে যান সিসিটিভি ক্যামেরায়। ইব্রাহিম খলিলকে পুলিশ আটক করে পতেঙ্গা থানায় নিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তা জানান, নিহত ওসমান সিকদার বিমানবন্দরকেন্দ্রিক চোরাচালান চক্রে জড়িত ছিলেন। তাদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট আছে। চোরাচালানে জড়িত থাকার আলামত পেয়ে ওসমানসহ আরও কয়েকজনকে শাহ আমানত থেকে সরিয়ে নিতে সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কাছে গত দুই মাসে একাধিক চিঠি দেয় শাহ আমানত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বরাবরই ঊর্ধ্বতনদের ম্যানেজ করে তারা থেকে যান বহাল তবিয়তে। সম্প্রতি ওসমানকে শাহ আমানত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ভবনে বদলি করা হলেও তিনি অকারণে ঘোরাফেরা করতে থাকেন টার্মিনাল ভবনে। যদিও সেখানে তার কোনো দায়িত্ব ছিল না। মাস দুয়েক আগে চোরাচালান বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা ওসমানের হাতে আসে। সেই টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বটা শুরু। মূলত টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরেই ওসমান খুন হতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, গতকাল সকাল ৬টার দিকে বিমানবন্দর আবাসিক এলাকার ‘জাপানি গেট’ এলাকায় রক্তাক্ত অবস্থায় মো. আরিফ নামে এক যুবককে আটক করেন এক আনসার সদস্য। তার গ্রামের বাড়িও ভিকটিম ওসমানের এলাকা হাটহাজারীর মেখল ইউনিয়নের কাছিয়া বটতল এলাকায়। তার বাবার নাম মোহাম্মদ জুনু। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদে আরিফ আনসার সদস্যদের জানান, বুধবার রাত সোয়া ১টার দিকে ওসমানকে তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ পতেঙ্গা থানায় বিষয়টি অবহিত করলে সকাল ৮টার দিকে লিংক রোডের পাশ থেকে ওসমানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
সুরতহাল প্রতিবেদন সূত্রের বরাত দিয়ে পতেঙ্গা থানার ওসি মাহফুজুর রহমান বলেন, নিহত ওসমানের কপালের ওপর মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে ওসমান খুনের ঘটনায় সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্মচারী ইব্রাহিম খলিলকে আটকের কথা অস্বীকার করেন ওসি।
এদিকে নিহত ওসমান সিকদারের বড় ভাই হাটহাজারী উপজেলা হেফাজতে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক এমরান সিকদার বলেন, ‘আমার ভাই বিমানবন্দরসংলগ্ন সরকারি কোয়ার্টারের বাসায় থাকত। বুধবার গভীর রাতে সাত-আট দুর্বৃত্ত আমার ভাইকে বাসা থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে লিংক রোডে লাশ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেন স্থানীয় লোকজন।’
চট্টগ্রাম নগরের উপ-পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) রইছ উদ্দিন বলেন, ওসমানকে খুন করা হয়েছে এমনটি ধরে নিয়ে হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন।
জানা গেছে, ওসমান মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে হাটহাজারীর মেখল নিজ বাড়ি থেকে কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হন। তার পরিবার গ্রামের বাড়িতে থাকে। সুমাইয়া (১০), সামিয়া (৭) ও আলামিন (২) নামে তার তিন সন্তান রয়েছে।
