সম্প্রীতির হাওয়া তোলা খুব দরকার

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:৪৩ এএম

গায়ক কবির সুমনকে নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু তার রাজনৈতিক, সামাজিক চিন্তা—নিয়ে কখনোসখনো বিতর্ক যে ওঠেনি তা নয়। তবে এখন এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পটভূমিতে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক যেভাবে বিষিয়ে গেছে, মিডিয়ার একাংশ ও একাধিক রাজনৈতিক দল যেভাবে অশান্তি— ছড়াচ্ছে, তার বিরুদ্ধে ভারতীয়দের মধ্যে কবির সুমনের ভূমিকা অত্যন্ত ইতিবাচক। মূলত তাকে সামনে রেখে কলকাতায় ইতিমধ্যেই গড়ে উঠেছে ‘শান্তি— সেতু’। বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবস সামনে রেখে এই সব কর্মকাণ্ড ও দুদেশের সম্পর্কসহ বহু বিষয় নিয়ে কবির সুমনের সঙ্গে দেশ রূপান্তরের হয়ে একান্তে কথা বলেছেন লেখক, গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার। একে খোলামেলা আলাপচারিতাও বলা যেতে পারে। তবে তাতে স্পষ্ট যে সুমন ঠিক কী বলতে চান দুদেশের মানুষের উদ্দেশে

সৌমিত্র দস্তিদার : কেমন আছেন?

কবির সুমন : চলে যাচ্ছে, ৭৬ বছর বয়েস হয়ে গেল আর কি!!

সৌমিত্র দস্তিদার : বাংলাদেশ নিয়ে আপনার ভূমিকা তো চমৎকার।

কবির সুমন : যা চলছে তাতে কিছু তো করতে হবেই।

সৌমিত্র দস্তিদার : এমন এক দিনে আমরা কথা বলছি, যেদিন বাংলাদেশের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানপন্থিরা খুন করেছিল। তখনো পূর্ব বাংলা স্বাধীন হয়নি। আজ (শনিবার) বাংলাদেশে সেই শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ঠিক তার দুদিন পরেই (সোমবার) পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারত ও মুক্তিবাহিনী যৌথ বাহিনীর হাতে সমর্পণ করল। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হলো।

কবির সুমন : সত্যিই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কথা ভাবলে এখনো রক্ত গরম হয়ে ওঠে। কী মর্মান্তিক ঘটনা। আজ এত বছর বাদেও, বারেবারে সে কথা বলতে হবে। মনে করিয়ে দিতে হবে দুদেশের সাধারণ মানুষকে। স্বাধীন বাংলাদেশ শুধু একটা ভূখণ্ড নয়। আমাদের আবেগ। আমার মনে আছে, অনেক বছর আগে আমি তখন এমন এক দেশে থাকতাম, তারা যুদ্ধবিদ্যায় ও মহাকাশ বিষয়ে ছিল দারুণ পারদর্শী। অনেকে অবশ্য মনে করেন দুটির সঙ্গে দুটির সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সে যাই হোক, তারা একবার সম্পূর্ণ নগ্ন দুজন কৃত্রিম নরনারী মহাকাশে পাঠালেন, অনেক ভাষায় তারা যাতে কথা বলতে পারেন এমন উদ্দেশ্যে। হতে পারে যে গুরুত্বপূর্ণ সব ভাষা ক্যাপসুলের সাহায্য পাঠিয়ে ইথার তরঙ্গে ছড়িয়ে পড়বে মহাকাশেও। সেখানে ছিল বাংলা ভাষাও। সে কথা, বাংলা ভাষার কথা বলতে গিয়ে এই এখনো ছিয়াত্তর বছর বয়সেও আমার চোখে জল আসছে। সেই বাংলা ভাষায় বাংলাদেশের মানুষ কথা বলে। পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ লোকে ও অন্যান্য জায়গার কত কত লোকজন কথা বলে।

সৌমিত্র দস্তিদার : শান্তি সেতু নির্মাণের কথা কখন ভাবলেন?

কবির সুমন : সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে যেরকম বৈরী সম্পর্ক তৈরি করা হচ্ছে, দুদেশের মধ্যে বৈরিতা, অবৈরিতা, প্রতি-বৈরিতা জন্ম নিচ্ছে, অথচ কোনো সংগত কারণ নেই। কিন্তু একটা ঠেলাঠেলি চলছে, ব্যবসা-বাণিজ্য কিন্তু দুদেশের বন্ধ হয়নি, তবুও বিশেষভাবে আমি বলব, পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মিডিয়া, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে রকম প্রোপাগান্ডা যুদ্ধ চালাচ্ছে, তখন মনে হলো, এই মুহূর্তে একটা সমিতি, বান্ধব সমিতি গড়ে তোলা একান্ত দরকার। মিডিয়ার উল্টোপাল্টা কা-ে পড়শি দেশের সঙ্গে সুপড়শিসুলভ আচরণ বা সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্ক চুলোয় গিয়ে জনগণের মধ্যে বৈরিতা বেড়ে যাওয়া তো কাম্য নয়। ফলে এই সমিতির উদ্যোগ নেওয়া।

সৌমিত্র দস্তিদার : সাড়া কেমন পাচ্ছেন?

কবির সুমন : অসম্ভব ভালো। আমি তো ভাবতেই পারিনি এত দ্রুত দুই পাড়ের জনগণ এভাবে পরস্পরের পাশে এসে দাঁড়াবেন।

সৌমিত্র দস্তিদার : শান্তি সেতুতে কি বাংলাদেশের কেউ আছেন!!

কবির সুমন : হ্যাঁ, অনেকে আছেন। কিন্তু মার্জনা করবেন, বয়সের কারণে কারো নাম ঠিক এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।

সৌমিত্র দস্তিদার : এটা ঠিক কেমন সংগঠন?

কবির সুমন : সংগঠন বলব না। সংগঠন বললেই অনেক প্রশ্ন চলে আসে। এটা বরং বান্ধব সমিতি বলতে পারেন। এখানে শারীরিকভাবে দেখা-সাক্ষাৎ, মেলামেশা নাও থাকতে পারে। আমি কলকাতায়, অপরজন হয়তো চট্টগ্রাম বা খুলনায়। কিংবা অন্য কোনো মহাদেশের ছোট্ট শহরে। কেউ হয়তো কোপাই নদীর ধারে। কিন্তু মনের সেতু দিয়ে ভালোবাসার আদান-প্রদান তো চলতেই পারে। আসল কথা কি জানেন ভালোবাসা দিয়ে সব হয়, সম্প্রীতির হাওয়া তোলা খুব দরকার এখন। এই সমিতিতে কোনো ধর্ম, রাজনীতি নিয়ে আকচা-আকচি নয়। মনে রাখতে হবে আমরা মানুষ। এখানে আমরা শুধু মানুষের কথা বলব। মানুষ হয়ে মানুষের হাত ধরব। আগেই বললাম যে মহাকাশে যখন ক্যাপসুল পাঠানো হয়েছিল তখন এটুকু আশা ছিল যে কেউ যদি শোনেন ভাষাগুলো, তখন জানতে পারবেন কত ভাষায় মানুষ কথা বলে, তারমধ্যে বাংলা অন্যতম। দিনের পর দিন ভারতের মিডিয়া, ওপারের কেউ কেউও বোকা বোকা কথা বলছেন তাতে অবস্থা জটিল হয়ে পড়ছে। আমাদের এই অবস্থায় হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে তো চলবে না। লিখতে হবে, বলতে হবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের সমিতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলো। আমার কিন্তু এই সমিতিতে কোনো পদ নেই। আমি আছি, আমার সঙ্গে অর্ক ভাদুড়ী, অর্ক দেব, জিম নওয়াজ, মনীষা দাশগুপ্ত, বিশ্বেন্দু নন্দ আরও অনেকেই আছেন এই বান্ধব সমিতিতে। এই যে বান্ধব সমিতি বলছি, এও আমার একান্ত বলা। আমার-সহ নাগরিকদের কারো সঙ্গে কথাও বলা হয়ে ওঠেনি।

সৌমিত্র দস্তিদার : ফান্ড পাচ্ছেন কোথা থেকে?

কবির সুমন : আমি জানতাম এই প্রশ্ন উঠবেই। দেখুন, সোজাসুজি বলি, এখনো পর্যন্ত কোথাও কোনো টাকা-পয়সা লেনদেনের কথাই ওঠেনি। যেটুকু যা হচ্ছে তা পুরোপুরি স্বতঃপ্রণোদিত, লিফলেট বা প্রেস কনফারেন্স করলেও নিজেরাই পকেট থেকে টাকা দিয়ে করব।

সৌমিত্র দস্তিদার : ভবিষ্যতে কি এ ধরনের বান্ধব সমিতি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে গড়ে তোলার ইচ্ছে আছে?

কবির সুমন : অবশ্যই পড়শি দেশের মানুষ পড়শি দেশের জনগণের হাত ধরবেন, সুখে-দুঃখে পাশে থাকবেন এটা তো হতেই হবে। পিপলস ইনিশিয়েটিভ খুব প্রয়োজন। তবে এই মুহূর্তে আমাদের সবটুকু চিন্তা, মনোযোগ বাংলাদেশের জনগণ ও ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের জনগণের মধ্যে শান্তি ফিরে আসা নিয়ে। আসলে আমরা কেউ কাউকে সেভাবে চিনি না। অন্য দেশের কথা বাদ দিন। এপারের মুসলমান জনগোষ্ঠীকে চিনি? আমার স্কুলে একজন সহপাঠীও মুসলিম ছিলেন না!

সৌমিত্র দস্তিদার : আমারও ছিল না

কবির সুমন : তবে বুঝুন অবস্থা, কলেজেও, আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, সেখানে একজনকে পেয়েছিলাম। ও ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র। নামটা এখনো মনে আছে আব্দুল হায়াৎ। আমি যখন সুমন চট্টোপাধ্যায় থেকে কবির সুমন হলাম। কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানাতে হয়েছিল আজ থেকে আমার নাম কবির, বাবার দেওয়া সুমন হলো পদবি। কবির সুমন। তখন একবার টিভিতে সঞ্চালক হিসেবে একটা টক শো করতাম। একবার দুর্গাপূজার আগে তিনজন থিম পূজার উদ্যোক্তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। বাংলাদেশে হয়তো অনেকে নাও বুঝতে পারেন থিম পূজার বিষয়। এটা কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে সামনে রেখে মন্ডপ তৈরি করা। ধরুন, সিপাহী বিদ্রোহ। যাই হোক কথা চলতে চলতে তিনজনের একজন হঠাৎই বলে বসলেন, সুমন দা আপনি যখন বাঙালি ছিলেন...। আমি হো হো করে হেসে উঠলাম, তিনি একটু অবাক হলেও বলতে লাগলেন, ‘যখন বাঙালি ছিলেন’। আমি আপনাকে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিমদের বাঙালি বলেই মানতে চান না। ফলে এই পরিস্থিতিতে দুই বাংলার গুজব যে মারাত্মক চেহারা নেবে তা তো বলাই বাহুল্য।

সৌমিত্র দস্তিদার : আপনাদের শান্তি সেতু প্রাথমিকভাবে কীভাবে এই একতরফা প্রোপাগান্ডার মোকাবিলা করবেন?

কবির সুমন : ভয়াবহ ডিস-ইনফরমেশন ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মিস ইনফরমেশন নয়। ভুল নয়, অপতথ্য। আমরা প্রত্যেকটা ধরে ধরে মিথ্যেটা ধরিয়ে দেব, যুক্তি তথ্য দিয়ে।

সৌমিত্র দস্তিদার : একটা অন্য কথা মনে পড়ল।

কবির সুমন : বলিয়ে জনাব...

সৌমিত্র দস্তিদার : শেষবার যখন আপনি বাংলাদেশ গেছিলেন, তখন আপনার নির্দিষ্ট ভেন্যু কোনো কারণ না দেখিয়েই আচমকা সরকার বাতিল করে দিয়েছিল। অনেকেই আজও তার মধ্যে রহস্য দেখেন। আপনার কী মনে হয়?

কবির সুমন : হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়ছে। সরকার সরকারি হল বাতিল করেছিল ঠিক কোন যুক্তিতে আজও জানি না। আমার অনুষ্ঠানের আয়োজকরা ছিলেন কয়েকজন তরুণ। তারা এ রকম হঠাৎ সিদ্ধান্তে বেশ মুশকিলে পড়ে গেছিলেন। পরে অনেক চেষ্টা চরিত্তির করে তারা হল জোগাড় করেন। এর আগেও কিন্তু একবার আমার অনুষ্ঠানের নির্ধারিত হল অজানা কারণে বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল। কী বলি বলুন তো! বোঝেন তো সবই।

সৌমিত্র দস্তিদার : অনেকক্ষণ আপনাকে বকাচ্ছি। এবার ছোট ছোট দুটো কথা বলব। একটা হচ্ছে, আপনি বাংলাদেশ নিয়ে সত্যিই বেশ চিন্তিত। আপনার কি মনে হয়; আগামী দিনে সমস্যা মিটবে?

কবির সুমন : আলবত একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে আমাদের সবাইকে চেষ্টা করে যেতে হবে। শুধু বাংলাদেশ নিয়ে নয়। মানুষে মানুষে, সম্প্রদায় সম্প্রদায়ে সম্পর্ক, ভাষা সবকিছু আমাকে ভাবায়। এই যে দেখুন জল পানি নিয়ে কত গোলমাল। অথচ সুদূর অতীতে ভারতচন্দ্র একাধিক লেখায় পানি লিখেছেন। আবার লালন বলেছেন জল। মনে করুন, লালনের সেই বিখ্যাত উক্তি ‘প্রেমের মরা জলে ডোবে না’।  কই তিনি তো বলেননি প্রেমের মরা পানিতে ডোবে না। ভালোবাসা থাকলে এসব তুচ্ছ। আমি এক এক সময় ইদানীং খুব ভাবি জানেন, ভাবি আমরা তো পরস্পরের ভাষা ভাই, ভাষা বোন হতে পারি। পরস্পরকে ডাকতে পারি ওই সম্বোধনে। সাঁওতাল, চাকমা তারাও তো আমাদের ভাষা ভাই বা ভাষা বোন।

সৌমিত্র দস্তিদার : আপাতত শেষ প্রশ্ন আপনার শান্তি সেতুতে ইতিমধ্যেই দেখছি বাম-ডান সব মতাদর্শের মিলন সেতু। কেউ কট্টর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থক, কেউ পুরোপুরি বিপরীতে। এই বিভিন্ন মতকে মেলালেন কোন মন্ত্রে?

কবির সুমন : হা হা হা হা। এক তো বাংলাদেশ প্রশ্নে। তবে আমি সবসময় এক্ষেত্রে মাও সে তুং অনুসারী। মনে আছে নিশ্চয়ই, মাও বলতেন, ‘শত ফুল বিকশিত হোক।’ আমিও মনে করি, সব ফুলগুলোকে ফুটতে দেওয়া হোক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত